মো. শাহানুর ইসলাম
আজ মানিকগঞ্জবাসী বেদনাবিধুর হৃদয়ে একজনকে স্মরণ করছেন। তিনি সাবেক মন্ত্রী, রাজনীতিবিদ ও শিল্পোদ্যোক্তা হারুনার রশীদ খান মুন্নু। আজ তার নবম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১৭ সালের পয়লা আগস্ট নিজ হাতে গড়া মুন্নু মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। হারুনার রশীদ খান মুন্নুর জন্ম ১৯৩৩ সালের ১৭ আগস্ট। জেলার মানুষের কাছে তিনি পরিচিত মুন্নু মিয়া নামে।
মানিকগঞ্জ জেলার এমন কোনো শিক্ষা, ধর্মীয়, সামাজিক প্রতিষ্ঠান খুঁজে পাওয়া যাবে না, যেখানে তার সহযোগিতার ছোঁয়া লাগেনি। তিনি একাধারে সফল শিল্পপতি, অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ এবং নিবেদিতপ্রাণ সমাজসেবক। দেশে সিরামিক শিল্পে বিপ্লব ঘটানো থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের জনসেবা, সবখানে রেখেছেন মেধার স্বাক্ষর।
এই মানুষটি প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘মুন্নু গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ’। বিশেষ করে তার প্রতিষ্ঠিত মুন্নু সিরামিকস দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করেছে। তার হাত ধরে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে এবং দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বকে আরো শক্তিশালী করতে বিএনপিতে যোগ দেন তিনি।
ছোটবেলা থেকে তিনি ছিলেন মেধাবী। মাত্র দেড় বছর বয়সে বাবাকে হারান। এরপর গ্রামের ঈশ্বরচন্দ্র উচ্চবিদ্যালয় থেকে ১৯৫২ সালে মেট্রিক পাস করেন। চলে যান ঢাকায়। ভর্তি হন তৎকালীন জগন্নাথ কলেজে। ১৯৫৪ সালে এইচএসসি পাস করেন। লেখাপড়ার পাশাপাশি ডিপিআই অফিসে হিসাব শাখায় ৯০ টাকা বেতনের একটি চাকরিও করতেন। ১৯৫৫ সালের ৩ আগস্ট মায়ের পছন্দের পাত্রীর (হুরুন নাহার) সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ২৩ বছর। ১৯৫৬ সালে বিকম পাস করেন। এরপর চার্টার্ড অ্যাকাউন্টস কোর্স সম্পন্ন করেন। আদমজীতে অডিটর হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৫৭ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত সেখানে অডিট করতেন। পরে শুরু করেন প্রেস ব্যবসা।
তিনি গড়ে তুলেন মুন্নু আর্ট প্রেস অ্যান্ড প্যাকেজিং, মুন্নু জুটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, মুন্নু স্টাফলার্স লিমিটেড, মুন্নু সিরামিক্স, মুন্নু ট্রেনিং কমপ্লেক্স, মুন্নু ফ্যাব্রিকস, মুন্নু স্পিনিং মিল, মুন্নু অ্যাটোয়ার (গার্মেন্টস), মুন্নু মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, মুন্নু নার্সিং ইনস্টিটিউট, মুন্নু ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মুন্নু রিসোর্ট অ্যান্ড চাইনিজ রেস্টুুরেন্ট, মুন্নু ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনসহ বহু প্রতিষ্ঠান।
স্বনামধন্য ব্যবসায়ী হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পান তিনি।
রাজনীতিতে হারুনার রশিদ খান মুন্নুর ইমেজ ছিল ক্লিন। ১৯৯১ সাল থেকে ২০০১ সালের প্রত্যেকটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন। শুধু তাই নয়, ২০০১ সালে মানিকগঞ্জে সাবেক ২ ও ৩ আসন থেকে একই সাথে নির্বাচন করে দু’টি আসনে জয়লাভ করেন। মন্ত্রিত্বও পান।
ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি হারুনার রশীদ খান মুন্নু রাজনীতিতেও ছিলেন প্রভাবশালী। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
হারুনার রশীদ খান মুন্নু এবং হুরুন নাহার রশিদ দম্পতির দুই মেয়ে- আফরোজা খান রিতা ও ফিরোজা মাহমুদ। বাবার উত্তরসূরি হিসেবে আফরোজা খান রিতা বর্তমানে রাজনীতি ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় আছেন। আফরোজা খান রিতা মানিকগঞ্জ সদর আসন (মানিকগঞ্জ-৩) থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পর দ্বিতীয় নারী হিসেবে সর্বোচ্চ রেকর্ড ভোটে বিজয়ী হন। বর্তমান সরকারের বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
আফরোজা খান রিতা জেলা বিএনপির কয়েক বারের সভাপতি। বর্তমানে জেলা বিএনপির আহবায়ক হিসাবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। আওয়ামী রেজিমে নির্যাতনের শিকার অনেকের পাশে থেকেছেন তিনি। আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ও ধ্বংসের চক্রান্ত করা হয়েছিল। কারখানার গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়েছিল।
হারুনার রশীদ খান মুন্নুর ছোট মেয়ে ফিরোজা মাহমুদ একজন সফল নারী। তার স্বামী আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান।
নিজের সন্তানদের সৎ মানুষ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন হারুনার রশীদ খান মুন্নু। জেলার মানুষের স্বাস্থ্য-র্শিক্ষাসহ সুযোগ-সুবিধা প্রতিষ্ঠায় আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন এই মহৎপ্রাণ মানুষটি।
লেখক : মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি, নয়া দিগন্ত



