টিনের ঘর দালান করার স্বপ্নগুলো

ভূমধ্যসাগরের উত্তাল ঢেউয়ে কাঠের নৌকাটা যখন ডুবে যাচ্ছিল, তখন সেই ‘তার’ চোখে কোনো রাজনৈতিক ভাষণ ভেসে ওঠেনি। হয়তো ভেসে উঠেছিল মায়ের শেষ বিদায়ের ছলছল চোখ। মনে এসেছিল স্ত্রীর মুখ, যিনি ইতালির ইউরো হাতে পেয়ে টিনের ঘরটা দালান করতে চেয়েছিলেন।

ভূমধ্যসাগরের নোনা পানিতে ফুসফুস যখন ভরে গিয়েছিল, তখন কোন ছবিটা ভেসে উঠেছিল তার সামনে? মায়ের হাসিমাখা মুখ? নাকি লিবিয়ার কোনো বন্দিশালায় কাটানো বিভীষিকা? ১২ থেকে ১৫ মিটার লম্বা কাঠের নৌকায় করে লিবিয়া উপকূল ছেড়ে তিনি রওনা দিয়েছিলেন ইতালির উদ্দেশে, ওই নৌকায় ছিলেন ১১০ জন। তাদের মধ্যে তিনিসহ আরো বাংলাদেশী ছিলেন। সেই তিনিটা কে?

তার বা তাদের পরিচয় হয়তো জানা যাবে, হয়তো না। এপ্রিলের চার তারিখ ভূমধ্যসাগরে সলিল সমাধি হয়েছে তাদের। ৮০ জনের খোঁজ পাওয়া যায়নি। বেঁচে ফিরেছেন ৩২ জন। ফিরে আসা লোকগুলো ‘বেঁচে ফেরা’র কাহিনী শুনাবেন। কাহিনীগুলো সেই একইরকম হবে- বিভীষিকার, এর আগে অনেকবার শোনা হয়েছে। তারপরও আবার শুনতে হবে। উন্নত জীবন নিয়ে বাঁচতে চেয়েছিলেন তারা, আশা নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন ইতালি; কিন্তু সব আশা আর বেঁচে থাকার কাহিনীগুলোর সমাধি হয়ে গেছে ভূমধ্যসাগরে। ওই সাগরের তলায় একের পর এক সমাধির খবর নিয়মিত আসে। আর খবরগুলো আমাদের কাছে কেবল সংখ্যা বলে মনে হয়। অথচ একেকটা সংখ্যার পেছনে আছে একেকটা পরিবারের ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন, মায়ের কান্না, স্ত্রীর আহাজারি।

আমাদের সক্ষম তরুণদের কেন এভাবে লাশ হয়ে ফিরতে হবে? কারণ নিজের মাটিতে খাবার জোগানোর নিশ্চয়তা নেই তাদের। চাকরি নেই, শ্রমের মূল্য নেই। বাধ্য হয়ে দালালদের হাতে সর্বস্ব তুলে দিচ্ছেন তারা। পা বাড়াচ্ছেন মৃত্যুর সাগরে।

দেশের বয়স তো পঞ্চাশের বেশি হয়ে গেছে। একটি দেশ গড়ে তুলতে এই সময় খুব কি কম? কিন্তু আমরা দেশ গড়ার নাম করে কী গড়ে তুলেছি? ধরা যাক ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পনেরো বছরের কথা। ওই সময়টা ছিল দুঃস্বপ্নের। এক ভয়াবহ লুটতরাজের ইতিহাস হয়ে থাকবে শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসন। তখন ভেঙে দেয়া হয়েছে শিল্প খাতের মেরুদণ্ড। রাজনৈতিক গ্যাঁড়াকলে পড়ে অনেক শিল্পোদ্যোক্তা হারিয়েছেন সারা জীবনের সঞ্চয় ও পুঁজি। আবার অনেকে গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়। সিন্ডিকেট আর অনিয়মে কোণঠাসা ছিলেন প্রকৃত ব্যবসায়ীরা। ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থাসহ বাংলাদেশের শুরুর সময় থেকে লুণ্ঠন ও অব্যবস্থাপনার ফল ভোগ করছেন আজকের তরুণরা। এই লুট হওয়া টাকাগুলো যদি দেশে বিনিয়োগ হতো, যদি শত শত কল-কারখানা গড়ে উঠত, তাহলে আজ আমাদের শিক্ষিত সন্তানদের লিবিয়ার জঙ্গলে মরতে হতো না। তারা সম্মানের সাথে কাজ করতে পারতেন দেশে।

আমরা অবশ্যই প্রবাসে যাওয়ার বিরোধী নই। প্রবাসী আয় আমাদের অর্থনীতির বড় চালিকাশক্তি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই প্রবাস যাত্রা কেমন হবে? আমরা কি আমাদের মানুষদের আধুনিক দাস হিসেবে পাঠাব, নাকি সম্মানের সাথে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে? আজ যখন বিদেশের বিমানবন্দরগুলোতে বাংলাদেশীদের সন্দেহের চোখে দেখা হয়, তখন জাতীয় মর্যাদা কোথায় থাকে? অবৈধ উপায়ে বিদেশে যাওয়ায় আমাদের শ্রমের মর্যাদা কমে যাচ্ছে। মানুষ যখন জান-মাল বাজি রেখে সাগর পাড়ি দেয়, তখন তারা আর মানুষ থাকে না, পরিণত হয় ‘অনুপ্রবেশকারী’তে। এতে বৈধভাবে যারা মেধা আর দক্ষতা নিয়ে কাজ করতে যান, তারাও বাঁকা চোখের শিকার হন। এটা আমাদের জন্য লজ্জার।

এ জাতীয় লজ্জার সবটা পূর্ণ করে দিয়েছে প্রভাবশালী ১৩ দেশের দেয়া এক যৌথ বিবৃতি। ওই বিবৃতিতে ভিসার অনিয়ম রোধে আমাদের সাবধান করে দেয়া হয়েছে। ব্রিটেন, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ফ্রান্স, ইতালির মতো দেশগুলো নসিহত করেছে- ভিসা পেতে জাল নথি ব্যবহার করবেন না, দালাল ধরবেন না। এই নসিহতকে অনেকে খুব স্বাভাবিক বিবেচনায় নিতে পারেন, তারা যুক্তি দেখাতে পারেন- দেশগুলো কেবল নির্দোষ নসিহত করেছে, তিরস্কার করেনি! তারা হয়তো এটা বুঝতে পারছেন না- কূটনীতিকরা সবসময় মার্জিত ভাষায় কথা বলেন। সেই ভাষার আড়ালে কখনো লুকিয়ে থাকে কঠোরতা। তারা যখন বলেন, ‘নিরাপদ ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া অনুসরণ করুন’, এ কথার অর্থ- আমরা জালিয়াতি আর অসততায় ডুবে আছি, এখন আমাদের আন্তর্জাতিকভাবে সতর্ক করা হচ্ছে। ভাবুন তো একবার, মানুষ কতটা নিচে নামলে এবং জালিয়াতি কোন পর্যায়ে পৌঁছালে একযোগে ১৩ দেশ এভাবে বিবৃতি দিতে বাধ্য হয়!

বিষয়টা কেবল সতর্কবার্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বাংলাদেশের পাসপোর্টের মর্যাদার ওপরও আঘাত। তারা আসলে আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন, আমরা সভ্য পৃথিবীর নিয়মনীতির তোয়াক্কা করছি না। আমরা আমাদের মাঝে গড়ে তুলেছি অনিয়মের সংস্কৃতি।

আসল কথা হলো- এ অনিয়মের সংস্কৃতির মূলে আছে বেকারত্ব এবং অনিশ্চয়তা। আর এ দুই কারণে দেশ ছাড়তে মরিয়া হয়ে ওঠে মানুষ। দেশের ভেতর কাজ করার জায়গা নেই। এখানে মানুষ বাড়ছে; কিন্তু কাজের বাজার দিন দিন ছোট হয়ে আসছে। হাতে সার্টিফিকেট নিয়ে দরজায় দরজায় ঘুরতে হচ্ছে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের। প্রতি বছর ২০-২২ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন; কিন্তু তাদের বড় একটি অংশ বেকার থেকে যাচ্ছেন।

একটি দেশ তখনই সমৃদ্ধ হয়; যখন সেখানে কল-কারখানা গড়ে ওঠে, উৎপাদন বাড়ে; কিন্তু আমাদের দেশে হয়েছে তার উল্টো। তথাকথিত উন্নয়নের আড়ালে গত ১৫ বছরে লুণ্ঠন হয়েছে। বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। ব্যাংক খাতকে একপ্রকার দেউলিয়া করে দেয়া হয়েছে। ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া হয়েছে; কিন্তু ফেরত আসেনি। এ ঋণখেলাপিরা মানুষের আমানত নিয়ে এখনো খেলছে। এতে বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রে পুঁজিসঙ্কট দেখা দিয়েছে। উদ্যোক্তারা সাহস হারিয়েছেন। পুঁজি পাচার হয়ে যাওয়ায় দেশের টাকা জমা হয়েছে উন্নত বিশ্বের রিয়েল এস্টেট বা অন্য কোনো খাতে।

আমাদের কি সম্ভাবনা ছিল না? আমরা যদি শিল্প, বাণিজ্য আর চাকরির ক্ষেত্রগুলো ঠিকঠাকভাবে সাজাতে পারতাম, চিত্রটা অন্যরকম হতো। একটি দেশের প্রকৃত শক্তি হলো মেধা; কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বাংলাদেশের মেধাবীরা দেশে উপযুক্ত পরিবেশ না পেয়ে দলে দলে দেশ ছাড়ছেন। একে বলা হয় ‘ব্রেইন ড্রেইন’। কিন্তু এ মেধা যখন দেশে থাকে না, তখন দেশ চলে যায় মেধাহীনদের এবং দুর্বৃত্তদের কব্জায়। আর তারা একটা রাষ্ট্রকে ধ্বংস উপহার দেয়। দেশকে ধ্বংসের দিক থেকে ফেরাতে হলে ‘রি-মাইগ্রেশন’-এর কথা গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। ‘ব্রেইন ড্রেইন’ হওয়া মেধাগুলো ফিরিয়ে আনতে হবে। তবে এখানে একটি বিপত্তি আছে। তাদের ফিরে আসতে বলা হবে, অমনি তারা ফিরতে শুরু করবেন, বিষয়টা কি এমন?

তারা কেন ফিরবেন? তারা কি ‘বিষাক্ত’ ঢাকায় ফিরতে চাইবেন, যেই শহরে জ্যামে বসে নষ্ট হয়ে যায় মানুষের অর্ধেক সময়? দেখা গেছে, ইউরোপ বা উন্নত দেশে বড় হওয়া প্রবাসী বাংলাদেশীদের সন্তান যখন দেশে আসে, তারা এখানকার পরিবেশ ও আবহাওয়ার সাথে খাপ খাওয়াতে পারে না। দূষণে অসুস্থ হয়ে পড়ে। এমনকি বাংলাদেশের পানিও সরাসরি খেতে পারে না। এমনও দেখা গেছে, প্রবাস থেকে আসার সময় বাবা-মায়েরা সন্তানের জন্য গুঁড়ো দুধ বা খাবার নিয়ে আসছেন। কারণ আমাদের এখানকার খাবারে থাকে ভেজাল। এই যে আস্থাহীনতা, স্বাস্থ্যঝুঁকি- এগুলো দূর না করলে ‘রি-মাইগ্রেশন’ সম্ভব নয়।

স্বপ্ন দেখতে হবে একটি দূষণমুক্ত ও বাসযোগ্য বাংলাদেশের। যেখানে যাতায়াত ব্যবস্থা হবে সহজ ও আধুনিক। যানজটে প্রতিদিন যে লাখ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, তার আর্থিক মূল্য কয়েক বিলিয়ন ডলার। এ অপচয় বন্ধ করতে হবে। তবে এসব সমস্যার সমাধান এক দিনে হবে না; কিন্তু সৎ ইচ্ছা থাকলে ভালোর শুরুটা এখনি করা সম্ভব। একটা কথা প্রচলিত আছে- অ্যা গুড বিগিনিং ইজ হাফ ডান। মানে কাজের শুরুটা যদি সঠিক এবং গোছানো হয়, তবে অর্ধেক কাজ সেখানে সম্পন্ন হয়ে যায়। গুছিয়ে কাজ শুরু করতে দরকার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। রাজনীতি যখন অস্থির থাকে, তখন পুরো রাষ্ট্র কাঁপতে থাকে। আমাদের এমন এক রাজনীতি চাই, যা হবে জনবান্ধব, সহনশীল এবং মার্জিত। যেখানে ফ্যাসিবাদী ছায়া থাকবে না, থাকবে জবাবদিহি। প্রতিটি কাজের জন্য জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকবে সরকার। পাশাপাশি আমাদের বিচারব্যবস্থাকে আমূল সংস্কার করতে হবে। যে দেশে বিচার পাওয়া যায় না, আইনের শাসন নেই, সেই দেশে মানুষের আস্থাহীনতা চরম পর্যায়ে পৌঁছায়। আর এ আস্থাহীনতা থেকে জন্ম নেয় গভীর হতাশা। একজন যুবক যখন দেখেন তার চোখের সামনে অপরাধীরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, আর তিনি নিরপরাধ হয়েও বিচার পাচ্ছেন না, তখন রাষ্ট্রের তৃতীয় স্তম্ভ নিয়ে সংশয় দানা বাঁধে। ভীতি কাজ করে। এই হতাশা, সংশয় আর ভীতি থেকে অপরাধ বাড়ে। মানুষ হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে অবৈধ পথে পা বাড়ায়। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পার হয়ে গেছে। জাতি হিসেবে আমাদের আত্মোপলব্ধির সময় অনেক আগেই এসেছে। আমরা দেশ গড়ার নামে ব্যক্তিপুঁজি আর নিজেদের উদরপূর্তিতে ব্যস্ত থেকেছি; কিন্তু দেশ গড়া মানে কেবল বড় বড় ফ্লাইওভার তৈরি করা নয়, প্রতিটি নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা ও মর্যাদার নিশ্চয়তা দেয়া। আমরা যদি আজ থেকে আমাদের কৃষি আধুনিকায়ন করতে পারি, শিল্পের চাকা ঠিকভাবে ঘুরাতে পারি, তাহলে পরনির্ভরশীলতা কমবে। জাপানের দিকে তাকিয়ে দেখুন, দক্ষিণ কোরিয়া এবং সিঙ্গাপুরের দিকে তাকান। দেশগুলোর মাটির নিচে তেল নেই; কিন্তু তারা তেল রফতানি করে। অপরিশোধিত তেল আমদানি করে পরিশোধন করে। পরে বিশ্ববাজারে বিক্রি করে। আমাদের দেশে সম্পদ আছে; কিন্তু অভাব হলো সঠিক ব্যবস্থাপনার। আমাদের ব্যবস্থাপনা যদি সৎ ও দক্ষ হতো, তবে বেকারত্ব এ পর্যায়ে পৌঁছাত না। আমরাও এতটা আমদানীনির্ভর হয়ে পড়তাম না। দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতি না থাকলে কর্মসংস্থান তৈরি করা মোটেই কঠিন কিছু নয়; কিন্তু সেই সদিচ্ছা কি আমাদের আছে? নাকি আমরা কেবল লাশের মিছিল গুনতে থাকব?

ভূমধ্যসাগরের উত্তাল ঢেউয়ে কাঠের নৌকাটা যখন ডুবে যাচ্ছিল, তখন সেই ‘তার’ চোখে কোনো রাজনৈতিক ভাষণ ভেসে ওঠেনি। হয়তো ভেসে উঠেছিল মায়ের শেষ বিদায়ের ছলছল চোখ। মনে এসেছিল স্ত্রীর মুখ, যিনি ইতালির ইউরো হাতে পেয়ে টিনের ঘরটা দালান করতে চেয়েছিলেন।

লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত
[email protected]