আহসান হাবিব
রমজান আসার আগেই বাংলাদেশের বাজারে এক ধরনের অদৃশ্য উত্তাপ তৈরি হয়। চাঁদ দেখা যাওয়ার আগেই চাল, ডাল, তেল, চিনি, খেজুর, ছোলা, গরু-ছাগলের গোশত—নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে শুরু করে। ঈদ পর্যন্ত সেই ঊর্ধ্বগতি বহাল থাকে। ঈদের পর আবার কিছুটা স্বস্তি আসে, যেন মূল্যবৃদ্ধির এই ঝড় ছিল সাময়িক, উৎসবকেন্দ্রিক এবং পরিকল্পিত। প্রশ্ন হলো—কেন প্রতি বছর একই দৃশ্যপট? কেন রমজান, যা আত্মসংযম ও সংহতির মাস, সেটিই হয়ে ওঠে অতিরিক্ত মুনাফার মৌসুম?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ‘বাজার সিন্ডিকেট’ নামক একটি বহুল আলোচিত কিন্তু অদৃশ্য শক্তির দিকে তাকাতে হয়। দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে, কিছু আমদানিকারক, পাইকার ও বড় আড়তদার মিলিতভাবে সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে দাম বাড়ান। চাহিদা বাড়ার আগেই কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করা হয়, মজুদদারি বাড়ানো হয়, গুজব ছড়ানো হয়—ফলে বাজারে আতঙ্ক তৈরি হয় এবং খুচরা পর্যায়ে দাম দ্রুত বাড়ে।
রমজান মুসলমানদের জন্য আত্মশুদ্ধি, সহমর্মিতা ও ত্যাগের মাস। পবিত্র কোরআনে দয়া, ন্যায় এবং পরিমিতির ওপর জোর দেয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, রমজান এলেই বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি শুরু হয়। অথচ বিশ্বের বহু মুসলিমপ্রধান দেশে—যেমন সৌদি আরব আরব আমিরাত এবং তুরস্কে-রমজান উপলক্ষে বড় বড় সুপারশপ ও ব্যবসায়ীরা ছাড় ঘোষণা করেন। সরকারও মূল্যনিয়ন্ত্রণে কঠোর নজরদারি চালায়। কারণ তারা বোঝে—এই মাসে মানুষের ব্যয় বাড়ে। তাই তারা সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে মূল্য ছাড় দেয়।
বাংলাদেশে ঠিক উল্টো চিত্র। এখানে রমজান মানেই ‘চাহিদা বাড়বে’- এই যুক্তিতে আগাম দাম বাড়ানো রুটিনে পরিণত হয়েছে। অথচ অর্থনীতির মৌলিক নিয়ম বলছে, যদি সরবরাহ ঠিক থাকে এবং বাজারে প্রতিযোগিতা বজায় থাকে, তাহলে চাহিদা বাড়লেও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ কমে যায়। তাহলে কেন বাংলাদেশে নিয়মিতভাবে মূল্যবৃদ্ধি ঘটে?
বাংলাদেশের বাজার কাঠামোতে অনেক পণ্যের আমদানি ও পাইকারি বণ্টন কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত। যখন কয়েকজন মিলে সরবরাহ কমিয়ে দেন বা বাজারে সঙ্কটের বার্তা ছড়ান, তখন খুচরা বিক্রেতারা আতঙ্কে বেশি দামে পণ্য কিনতে বাধ্য হন। সেই বাড়তি দাম শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ঘাড়ে চাপানো হয়।
খেজুরের বাজার একটি পরিচিত উদাহরণ। রমজানের আগে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম স্থিতিশীল থাকলেও দেশীয় বাজারে আমদানি পর্যায়ে দাম বাড়ে, তারপর পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে আরো বাড়ে। একই চিত্র ভোজ্যতেল, চিনি ও ডালের ক্ষেত্রেও দেখা যায়। বাজারে যখন গুজব ছড়ায়—‘পণ্য কম আসবে’, ‘ডলার সঙ্কট’, ‘বন্দরে জট’-তখনই দাম বাড়তে শুরু করে।
রমজান মাসে অন্যের কষ্টকে পুঁজি করে মুনাফা করা শুধু অর্থনৈতিক অন্যায় নয় বরং এটি নৈতিক অবক্ষয়ও বটে। ইসলামী শিক্ষায় মজুতদারি ও কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করে মূল্যবৃদ্ধিকে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। রাসূল সা: বলেছেন, যে ব্যক্তি খাদ্য মজুদ করে মানুষের কষ্ট বাড়ায়, সে গুনাহগার। অর্থাৎ রমজানে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা ধর্মীয়ভাবেও গুরুতর অপরাধ।
এখানে একটি সামাজিক বৈপরীত্য কাজ করে। রমজানে আমরা ইফতার মাহফিল করি, দান-সদকা বাড়াই, গরিবদের সাহায্য করি। কিন্তু একই সময়ে যদি বাজারে কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়ানো হয়, তবে সেই দান-সদকার নৈতিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
এখানে আরেকটি লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, শুধু সিন্ডিকেটকে দোষ দিলেই পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। আমাদের ভোক্তা আচরণও কখনো কখনো মূল্যবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে। গুজব শুনলেই আমরা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কিনে মজুদ করি। ফলে চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায় এবং বাজারে সাময়িক ঘাটতি তৈরি হয়। এই সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ান।
তাই সমাধান কেবল প্রশাসনিক নয়, সামাজিকভাবেও আমাদের দায়িত্বশীল হতে হবে। সচেতন ভোক্তা, স্বচ্ছ বাজারব্যবস্থা এবং শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ—এই তিনটির সমন্বয় প্রয়োজন।
মঙ্গলবার নতুন সরকার শপথ নিতে যাচ্ছে। একটি গণতান্ত্রিক সরকারের প্রথম দায়িত্ব জনগণের মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করা। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও বাজার সিন্ডিকেট ভাঙাটা এ মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি কাজ হওয়া উচিত।
সরকারকে কয়েকটি তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিতে হবে— মজুতদারি ও কৃত্রিম সঙ্কট প্রমাণিত হলে দ্রুত জরিমানা ও লাইসেন্স বাতিল। আমদানি ও সরবরাহে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ভেঙে নতুন ব্যবসায়ীদের সুযোগ দেয়া। ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রি করে বাজারে প্রতিযোগিতামূলক চাপ সৃষ্টি করা। আমদানি থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত সরবরাহ শৃঙ্খল মনিটরিং। এবং দ্রুত তথ্যপ্রকাশ ও বাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে স্বচ্ছ যোগাযোগ।
বিশ্বের অনেক দেশ রমজান উপলক্ষে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করে। বাংলাদেশেও একটি স্থায়ী ‘রমজান মার্কেট মনিটরিং সেল’ গঠন করা যেতে পারে, যা সারা বছর কাজ করবে কিন্তু রমজানের আগে বিশেষ সক্রিয় থাকবে।
স্বল্পমেয়াদি অভিযান দিয়ে সাময়িক স্বস্তি মিলতে পারে, কিন্তু স্থায়ী সমাধানের জন্য বাজার কাঠামোতে সংস্কার দরকার। কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সরবরাহ শৃঙ্খল ছোট করা, মধ্যস্বত্বভোগী কমানো, আধুনিক গুদাম ও কোল্ড স্টোরেজ বাড়ানো—এসব পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিযোগিতা কমিশনকে কার্যকর করতে হবে, যাতে কার্টেল বা সিন্ডিকেট গঠনের প্রমাণ পেলেই দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া যায়।
বাংলাদেশ একটি উদীয়মান অর্থনীতি। বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে আমাদের ভাবমূর্তি কেবল জিডিপি প্রবৃদ্ধির ওপর নয়, বরং বাজারের স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতার ওপরও নির্ভর করে। যদি প্রতি বছর রমজান এলেই মূল্যবৃদ্ধির খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আসে, তবে তা দেশের সুশাসনের প্রশ্ন তোলে। রমজান সংহতির মাস। এই মাসে যদি রাষ্ট্র ও ব্যবসায়ী সমাজ একসাথে মূল্যছাড়ের ঘোষণা দেয়, তবে তা শুধু অর্থনৈতিক স্বস্তি দেবে না, আন্তর্জাতিক পরিসরেও ইতিবাচক বার্তা দেবে।
পবিত্র রমজান ও ঈদ আমাদের জন্য কেবল ধর্মীয় উৎসব নয়; বরং এটি সামাজিক সংহতিরও পরীক্ষা। এই সময়ে বাজার সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য অব্যাহত থাকলে তা রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থানকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
সুতরাং নতুন সরকারের প্রতি আহ্বান—শপথের পর প্রথম কাজ হোক দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান পদক্ষেপ। বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে দিন। জনগণের স্বার্থ রক্ষা করুন। রমজানকে মুনাফার মৌসুম নয়, সংযম ও সহমর্মিতার মাস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করুন।
কারণ একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের পরিচয় কেবল তার নির্বাচনে নয়, বরং তার বাজারের ন্যায্যতায়ও নিহিত। রমজান আমাদের আত্মশুদ্ধির আহ্বান জানায়; সুতরাং রাষ্ট্র ও বাজার ব্যবস্থার আত্মশুদ্ধির এখনই সময়।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।



