মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন
আজ ৩০ মে, ২০২৫ স্বাধীনতার মহান ঘোষক জিয়াউর রহমানের ৪৪তম শাহাদতবার্ষিকী। এই শোকাবহ দিনে তার রূহের মাগফিরাত কামনা করি, গভীর শ্রদ্ধার সাথে তাকে স্মরণ করি।
আজ থেকে ১১ বছর আগে বাংলাদেশের মানুষের হারানো গণতন্ত্র ফিরে পাওয়ার অভিপ্রায়ে এই লেখার অবতারণা করি। প্রায় এক যুগ পর আজ আবার দেশে বিরাজমান রাজনৈতিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় লেখাটি আবারো পাঠক সমীপে উপস্থাপন করছি।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান পঁচাত্তর-পূর্ব রাজনীতিশূন্য বাংলাদেশে, মূলত বাকশালের শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা থেকে বন্দী বা বিলুপ্ত গণতন্ত্রকে অবারিত করার সাহসী পদক্ষেপ নিয়ে জাতিকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার দায়িত্ব রাজনীতিকদের হাতে অর্পণ করেন। তিনি রাজনীতিতে জনগণের সম্পৃক্ততা, একে জনগণের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া এবং রাজনীতিবিদদেরকে নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে রাজনীতিকে ব্যবহার না করে জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করার দীক্ষা দেন। সেই মহৎ গণমুখী লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্যই তিনি ঘোষণা দেন, ÔI will make politics difficult for the politicians’ এই ঐতিহাসিক রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনার মধ্য দিয়ে তিনি রাজধানীভিত্তিক রাজনীতির কেন্দ্রের পরিবর্তে বাংলার গ্রামেগঞ্জে ছড়িয়ে দিয়ে রাজনীতিবিদদেরকে গ্রামের মানুষের কাছে গিয়ে জনগণের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনিই জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রথম রাষ্ট্রপতি যিনি বিরামহীন গ্রামের পর গ্রাম ঘুরে, পায়ে হেঁটে সাধারণ মানুষের কাছে যান। তাদের সমস্যা চিহ্নিত করে তার সমাধানে ত্বরিত পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। আর এই বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে শহীদ জিয়া জনগণের হৃদয়ে স্থান করে নেন।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যেখানে জনগণের কাছে গিয়ে তাদের পাশে দাঁড়ানোর রাজনীতির সূচনা করেন, সেখানে আজকের বাংলাদেশে গণ-অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট হাসিনার পলায়ন-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথে না গিয়ে এক অভিনব পদ্ধতিতে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা চালু করে রাখতে চাইছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, দেশের রাজনীতিতে অবস্থান করে অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের সমাহার ঘটিয়ে তথাকথিক গণতন্ত্রের লেবাসে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করা কিংবা নির্বাচনহীন ব্যবস্থা চালিয়ে যাওয়ার মহড়া চলছে, যেখানে দেশ পরিচালনা করতে নির্বাচনের জন্য জনগণের কাছে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। সেখানে এমপি হওয়ার জন্য গ্রামগঞ্জে ঘুরে ভোট চাইতে হবে না, শুধু ঢাকায় বসেই দেশের মালিক হওয়া যাবে। ফলে মনে হচ্ছে, দেশে আবারো গণতন্ত্র ও রাজনীতিহীন একটি অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে, যার মধ্য দিয়ে পঁচাত্তর-পূর্ববর্তী পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।
শহীদ জিয়া বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার পর দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার দায়িত্ব বর্তায় রাজনীতিবিদদের ওপর। সেই ঐতিহাসিক রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনার মধ্য দিয়ে শহীদ জিয়া রাজনীতির কেন্দ্রস্থল রাজধানীর পরিবর্তে গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে দেন। রাজনীতিবিদদেরকে নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার জনগণের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান, যা মানুষের প্রতি তার গভীর মমত্ববোধ আর অপরিসীম দেশপ্রেমের পরিচায়ক। দেশের উন্নয়নের জন্য তিনি গ্রহণ করেন স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। একজন দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক নেতা হিসেবে রাষ্ট্রপতি জিয়া মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন, জনগণই সব ক্ষমতার উৎস। তার বিপরীতে বিগত ২০১৪ জানুয়ারি ২০১৮ সালের ২৮ অক্টোবর ও ২০২৫ সালের ৭ জানুয়ারির আমি ডামি তথা ভোটারবিহীন ও নির্বাচনী প্রচারণাবিহীন নির্বাচন, সরকার গঠন, বিরোধীদলীয় নেতার মনোনয়ন দান (সরকার প্রধান কর্তৃক), একই সাথে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করা, জনগণের কাছে না গিয়েই সরকারদলীয় রাজনীতিবিদরা বংশপরম্পরায় ক্ষমতায় থাকার যে সাংবিধানিক ব্যবস্থা করেন, তাতে জনগণের রাজনীতি ও কষ্টার্জিত গণতন্ত্র ক্ষমতালিপ্সুদের হাতে বন্দী হয়ে পড়ে। যার পরিণামে ক্ষমতালিপ্সু হাসিনাকে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়।
আজ দেশ ও জনগণের স্বার্থে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শহীদ জিয়ার সেই ঐতিহাসিক রাজনৈতিক দর্শন প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, জনগণের রায়েই সরকার পরিবর্তনের মাধ্যম এবং সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করে বিচার বিভাগকে স্বাধীনভাবে কাজ করার ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণসহ বিএনপির ৩১ দফা বাস্তবায়ন আজ সময়ের দাবি।
নতুন করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চালু করে শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যবস্থা করেছিলেন বলেই শহীদ জিয়া দেশের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছিলেন। তার সততা ছিল কিংবদন্তির পর্যায়ে। তার প্রতিপক্ষও স্বীকার করবেন, দুর্নীতি ও অসততা থেকে বহু যোজন দূরে ছিল তার অবস্থান। তার কাছে দেশপ্রেম ছিল সব কিছুর ঊর্ধ্বে। মহান মুক্তিযুদ্ধে পরিবারের সদস্যদের জীবনের ঝুঁকির মধ্যে ফেলেও তিনি দেশের ডাকে সাড়া দেন।
দেশ ও দেশের মানুষকে ভালোবাসতেন বলেই তিনি গণমুখী রাজনৈতিক ধারার প্রবর্তন করেন। তিনি বলতেন, আমি রাজনীতিকদের জন্য রাজনীতি কঠিন করে দেবো। দলের নেতাদের বলতেন, ঢাকায় বসে আয়েশিভাবে রাজনীতি করা যাবে না। গ্রামে গ্রামে ঘুরে জনগণকে জাগাতে হবে। তাদের বলতে হবে অপার সম্ভাবনার কথা, বলতে হবে সমাজ ও দেশ গড়ার কথা। শহীদ জিয়ার স্মৃতিচারণ করে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ সংসদে বলেছিলেন, ‘রাষ্ট্রপতি জিয়ার সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব তিনি জনগণের হৃদয়রাজ্যের রাজা হতে পেরেছিলেন। ইতিহাসের বরপুত্র ছিলেন তিনি।’
স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে, একদলীয় স্বৈরশাসন থেকে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠাকারী হিসেবে এবং ইতিহাসের সবচেয়ে সফল শাসক হিসেবে রাষ্ট্রপতি জিয়া অমর হয়ে থাকবেন। জনগণের হৃদয়ে তিনি যে ঠাঁই করে নিয়েছেন, তা ইতিহাস বিকৃত করে মুছে ফেলা যাবে না। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিজের যোগ্যতায়ই ইতিহাসে মহীরুহ হয়ে অবস্থান করবেন। স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে স্বাধীন বাংলাদেশের মতোই ইতিহাসে বিরাজ করবে তার নাম।
লেখক : ভাইস চেয়ারম্যান, বিএনপি



