সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্যভাবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর পুনরায় বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীকে নিয়ে কল্পকাহিনী রটানোর মাত্রা বেড়েছে। নানা ছুতায় গুজবে-বিতর্কে সশস্ত্র বাহিনীকে ঘায়েল করার অপতৎপরতা আবারো দৃশ্যমান হয়েছে। সশস্ত্র বাহিনীর সর্বোচ্চ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে বাদ যাচ্ছেন না কেউই। সম্প্রতি ভারতের অখ্যাত এক গণমাধ্যমে তথ্য-প্রমাণহীন পূর্ণ মিথ্যাচারে বিষোদগার করা হয়েছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল এম নাজমুল হাসানকে। অসত্য, ভিত্তিহীন ও বানোয়াট প্রতিবেদনে বিভ্রান্তির স্রোতে তীরহারাদের ভাড়াটে প্রোপাগাণ্ডা স্কোয়াডের এ যেন ঘৃণ্য এক উল্লাস। কথিত নিরপেক্ষতার ভান করে একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য নিয়ে নানা চটুল শব্দে গভীর ষড়যন্ত্রের ব্লু-প্রিন্ট নিয়ে কার্যত এই পক্ষটি মাঠে নেমেছে।
বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী নিয়ে বরাবরই বিভ্রান্তি ছড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে সোশ্যাল মিডিয়া গরম করতে ভাড়াটে লেখকদের ব্যবহার করছেন। তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পরিষ্কার—‘ঠাকুরমার ঝুলির’ বানানো গল্প রচনা করে দেশপ্রেমিক বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীকে নিয়ে ‘অপপ্রচার’ করা। ত্রয়োদশ নির্বাচনের আগেও দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করতে মরণকামড় বসিয়েছিল। সশস্ত্র বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার সেই মিশন মুখ থুবড়ে পড়লেও পুনরায় গুজবে বিতর্কে ঘায়েল করতে হন্তদন্ত হয়ে ছুটোছুটি করছে। সামরিক বাহিনীর সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন উপহারের পর দেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা তাদের কাছে যারপরনাই অসহ্য। এজন্যই গাঁজাখুরি মিথ্যা গল্প সাজিয়ে জাতির ঐক্য ও সংহতির প্রতীক সশস্ত্র বাহিনীকে ইচ্ছাকৃত বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণার মাধ্যমে নিজেদের বিকৃত রুচি ও মনস্তাত্ত্বিক দীনতার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন নতুন করে।
দুনিয়া কাঁপানো চব্বিশের অবিস্মরণীয় গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীকে নিয়ে অবলীলায় স্বরচিত মিথ্যা ছড়িয়েছে ভারতীয় গণমাধ্যম। সঙ্ঘবদ্ধ মতলববাজদের অসত্য তথ্যে চলে গুজবের মহামারি। সবচেয়ে বেশি অপতথ্যের শিকার হন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। ৫ আগস্টের আগে তৎকালীন সরকারের সহিংস ভূমিকায় লাশ আর বারুদের গন্ধ আর রক্তবন্যা ঠেকাতে ছাত্র-জনতার গৌরবজনক লড়াইয়ের সামষ্টিক চেতনাকে হৃদয়ঙ্গম করে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল এম নাজমুল হাসান ও বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন। নানা উসকানি ও বাড়বাড়ন্ত গুজবের মধ্যেও নিজ নিজ বাহিনীর উঁচু মনোবল অটুট রাখেন। পরতে পরতে ধৈর্য্য, সংযম ও মানবিকতার পরিচয় দেন।
দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখার পাশাপাশি জননিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলা রক্ষার সমান্তরালে অনাকাঙ্ক্ষিত সব নৈরাজ্য-সহিংসতা প্রতিরোধ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের অশুভ তৎপরতা তারা রুখে দিয়েছিলেন সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয়েই। মূলত দেশপ্রেমিক সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী প্রধানের চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার মুখোমুখি নয় পাশে দাঁড়িয়ে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও সামাজিক স্থিতিশীলতায় ঐতিহাসিক সাহসী ভূমিকা পালন কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি গুজব শিরোমনি ভারতীয় তথাকথিত গণমাধ্যম। জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক এবং রক্তস্নাত গণঅভ্যুত্থানকে অস্বীকার করে একটি ‘সামরিক ষড়যন্ত্র’ বা ‘ক্যু’ হিসেবে প্রমাণের জন্য কাল্পনিক বয়ান তৈরির মতো স্পর্ধা দেখিয়ে রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছেন।
এবার তাদের চক্ষুশূল বাংলাদেশ নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল এম নাজমুল হাসান। তাকে ‘দুর্নীতিবাজ’ প্রমাণে আদাজল খেয়ে নেমেছে এসব প্রোপাগাণ্ডা মেশিন। সাংবাদিকতায় নীতি-আদর্শের পাশাপাশি রুচি, শালীনতা বা সৌজন্যবোধকেও ধুলায় মিশিয়েছেন। কারো রাজনৈতিক ফন্দি হাসিলে কিংবা কারো চামচায়ে উজির নাজির হতে মুসাবিদা করে দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করে অস্থিরতা তৈরিতে সর্বগ্রাসী চেহারায় হাজির হয়েছেন।
তথ্য আর অপতথ্যের ফারাকও ঠাহর করতে পারছেন না আবার নেটিজেনদের অনেকেই। অথচ ফ্যাসিস্ট শাসনের অবসানের পর এরাই বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন ও জঙ্গি উত্থানের মিথ্যা ও অতিরঞ্জিত খবর প্রচার করে একইভাবে অস্থিরতা তৈরির সব বন্দোবস্ত করেছিল। কিন্তু তিন বাহিনী প্রধানের দৃঢ় ও কুশলী নেতৃত্বে ওই সময় বাংলাদেশ পথ হারায়নি। ভারতীয় কতিপয় গণমাধ্যমের এমন কারবার অসত্য ও বিভ্রান্তিকর বলে একাধিকবার প্রতিবেদন প্রকাশ করে ‘রিউমার স্ক্যানার’।
কয়েকটি বিষয়ে চোখ রাখলে স্পষ্ট– তারা সামরিক বাহিনীকে নিয়ে এমনকি নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল এম নাজমুল হাসানকে নিয়ে নির্দ্বিধায় মিথ্যা বলছেন, এটিই প্রতীয়মান হয়েছে। তাদের শিরোনাম চটকদার হলেও তথ্যের ভিত্তি বা উৎস একেবারেই নাজুক। প্রতিবেদনটিতে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে অ্যাডমিরাল এম নাজমুল হাসানকে দুর্নীতির সুবিধাভোগী হিসেবে সাব্যস্ত করার ব্যর্থ কসরত করা হয়েছে। প্রতিবেদনের কোথাও দুর্নীতির কোনো অফিসিয়াল রেফারেন্স নেই। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা সম্মানিত ব্যক্তিত্বের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রকাশের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা বা তথ্য যাচাইয়ের একটি ন্যূনতম মানদণ্ড অনুসরণ করার কথা। কিন্তু সেটিও উপেক্ষিত থেকেছে। নিজের ইচ্ছামাফিক বয়ান তৈরি করা হয়েছে।
ভারতীয় কতিপয় গণমাধ্যমের এসব নির্লজ্জ মিথ্যাচারের বিষয়ে বিশ্লেষকদের মন্তব্য হচ্ছে–হিটলারের জামানায় গুজবের উদ্ভাবক তার গুণধর তথ্যমন্ত্রী জোসেফ গোয়েবলস নিজেও এখন বেঁচে থাকলে ভারতীয় কতিপয় গণমাধ্যমের আনাড়ি-অথর্ব মার্কা গুজবের এসব প্রবণতায় রীতিমতো লজ্জা পেতেন! এ চক্রটির বিকৃত, ভণ্ডামি, কপটতা ধরা পড়েছে দেশের মানুষের সামনে। দেশের গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা ভারতীয় গণমাধ্যমের এমন ভূমিকাকে ভন্ডামি ও কূপমণ্ডুক হিসেবেই দেখছেন।
তারা বলছেন, ‘প্রকৃত অর্থেই সাংবাদিকতা কেবল তথ্য-উপাত্ত ও ঘটনার বিবরণ সংগ্রহের পেশা নয়; এটির ভিত্তি হচ্ছে তথ্য যাচাই করাও। ইংরেজিতে যাকে বলে ভেরিফিকেশন, একে আমরা সত্য প্রতিপাদন বলে বর্ণনা করতে পারি। এটাই সাংবাদিকতাকে প্রোপাগাণ্ডা থেকে আলাদা করে বলে আমেরিকান প্রেস ইনস্টিটিউট মত দিলেও ভারতীয় কতিপয় গণমাধ্যম পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী ও শীর্ষস্থানীয় সামরিক কর্মকর্তাদের নিয়ে কুৎসা রটিয়ে কর্তৃত্ববাদীদের একটা বড় হাতিয়ার হিসেবে নিজেদের তুলে ধরেছে। তাদের এমন অপতথ্যের তাণ্ডব কোনোমতেই দেশপ্রেমিক সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিটি সদস্যের মধ্যকার দৃঢ় বন্ধন আলগা করতে পারবে না।
নিজ বাহিনীর ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখতে নিরলস পরিশ্রম এবং ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত প্রতিটি সেনা সদস্য। একাত্তরে তারা প্রমাণ দিয়েছেন। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ছাত্র-জনতার সাথে কাঁধে কাঁধ, বুকে বুক মিলিয়ে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। গণতন্ত্রের সহায়ক শক্তি হিসেবে নিজেদের নিয়েছেন অনন্য উচ্চতায়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীর সকল সদস্য সংবিধান, সরকার, কমান্ড শৃঙ্খল এবং দেশের জনগণের প্রতি তাদের আনুগত্যের প্রতি অটল। এই সামরিক বাহিনীর ভাবমূর্তি নষ্ট করার কোনো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ন্যারেটিভ হালে পানি পাবে না বলেই মনে করেন বিশ্লেষকরা।
লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]



