ভোর হওয়ার আগে নরম আলো আসে। সে আলো ঠিক অন্ধকার নয়, আবার ভোরও নয়। এমন পরিস্থিতিতে ছিল বাংলাদেশ। মানুষ অপেক্ষায় ছিল শুভ দিনের। সেই দিন তারা পেয়েছে। তেরোতম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে। বাংলাদেশ এখন আলোকিত হয়েছে ভোরের আলোয়। এই ভোর ডাকা হয়েছিল ২০২৪ সালে। জুলাই-সময়ে রাজপথে রক্ত ঢেলে ভোর আনতে হয়েছে। যারা রক্ত দিয়েছেন, তাদের প্রত্যাশায় কি কেবল একটা নির্বাচন ছিল? মূলত ইতিবাচক পরিবর্তন চেয়েছিলেন জুলাইযোদ্ধারা। চেয়েছিলেন বৈষম্যের অবসান। সংস্কারের মাধ্যমে তাড়াতে চেয়েছিলেন অন্ধকার। সেই ‘অন্ধকার’ তাড়ানোর একটি মাধ্যম নির্বাচন।
কাক্সিক্ষত সেই নির্বাচন হয়ে গেল। সাথে হলো গণভোট। ভোটের দিন অতীতের মতো সহিংসতা দেখা যায়নি। একটি লাশও পড়েনি। তবে নির্বাচনের পর বিভিন্ন জেলায় সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। নির্বাচনের আগে জামায়াতের এক প্রার্থীর স্বাভাবিক মৃত্যু হওয়ায় একটি সংসদীয় আসন বাদ রেখে ২৯৯ আসনে ভোট হয়েছে। ভোট পড়েছে ৫৯.৪৪ শতাংশ। আশা ছিল আরো বেশি, তবে যা পড়েছে তা মোটেও কম নয়। ভোটকেন্দ্রে দীর্ঘ লাইন ছিল নারী-পুরুষের। তাদের চোখে ছিল নীরব প্রত্যাশা। সেই প্রত্যাশার কতটুকু পূরণ হলো তার মূল্যায়ন হবে।
নির্বাচনে জয় পেয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন জোট। প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে থাকা জোট। ফলাফল অনুযায়ী, জামায়াত এখন প্রধান বিরোধী দলের অবস্থানে রয়েছে। এটা জামায়াতের জন্য ঐতিহাসিক প্রাপ্তি। ভোটের আগে জামায়াত জোট ঘিরে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়। তারা যতগুলো আসন পেয়েছে, ভোটের মাঠে আলোচনায় ছিল তার চেয়ে বেশি। সমানে সমান লড়াই হবে বলেও ধারণা করেছিলেন অনেকে; কিন্তু আসনের হিসাবে জামায়াত জোট বিএনপি জোটের কাছাকাছি যেতে পারেনি। আবার ভোটের হিসাবে খুব একটা ব্যবধানও নেই। এর মানে ভোটাররা দুই পক্ষকেই ভোট দিয়েছেন এবং এই হিসাবটা কাছাকাছি। এতে সংসদে অনেকটা ভারসাম্য থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে।
ভারসাম্য কে কতটা বজায় রাখবে, তা নির্ভর করছে দলগুলোর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও দায়িত্ববোধের ওপর। তাদের মনে রাখা দরকার, ইতিহাস কিছুই ভোলে না। আজ হয়তো জবাব এড়িয়ে যাওয়া যায়; কিন্তু একদিন না একদিন জবাবদিহির মুখোমুখি হতেই হয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এর বড় উদাহরণ শেখ হাসিনা। তার বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় নিলে এবং ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিলে রাজনৈতিক দলগুলোর মঙ্গল হবে। এ কথাও মনে রাখতে হবে, বারো তারিখ কেবল সংসদ নির্বাচনই হয়নি, হয়েছে গণভোটও। ব্যালটে কেবল প্রার্থীর নাম ছিল না, ছিল একটি সংস্কারের প্রত্যাশা ও পরিবর্তনের ধারণা। জনগণ যে বার্তা দিয়েছে, তা সংস্কারের পক্ষে। এই গণরায়ের প্রতি সম্মান জানানো রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব। এটা অবহেলার কোনো সুযোগ নেই। বিশেষ করে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছে বিএনপি ও জামায়াত– এই অঙ্গীকারের ভিত্তিতেই অনেক ভোটার তাদের সমর্থন দিয়েছেন। তাই জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন হবে তাদের প্রতি আস্থার প্রতিদান।
তা ছাড়া ভোটারদের কাছে যেসব অঙ্গীকার করা হয়েছিল, সেগুলো যেন নিছক প্রতিশ্রুতি হয়ে না থাকে। সেগুলো এক-এক করে বাস্তবায়নে মন দিতে হবে বিএনপি জোটকে। এর জন্য স্পষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা করা জরুরি। এই ম্যাপে বাস্তবায়নের সময় থাকবে। থাকতে পারে প্রথম ১০০ দিন, প্রথম ছয় মাস, প্রথম এক বছর– প্রতিটি ধাপে কী করা হবে, তার একটি স্পষ্ট রূপরেখা। অঙ্গীকারগুলোকে কাগজ থেকে নীতিতে এনে প্রয়োগ করতে হবে। সেই সাথে অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, দ্রব্যমূল্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জ্বালানি, স্থানীয় সরকার, প্রতিটি খাতে বাস্তবসম্মত অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে। মানুষ যে আস্থা নিয়ে ভোট দিয়েছে, সেই আস্থাকে দৃশ্যমান ফলাফলে নিয়ে আসতে না পারলে প্রত্যাশার মৃত্যু হবে। জন্ম নেবে হতাশা। আর হতাশা গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শত্রু।
ক্ষমতা কেবল প্রশাসনিক কর্তৃত্ব নয়; এটি নৈতিক দায়িত্ব। নির্বাচনের সময় যে ভাষা ব্যবহার হয়েছে, যে বিভাজন তৈরি হয়েছে, সেগুলো ধীরে ধীরে মুছে ফেলতে হবে। প্রতিহিংসার রাজনীতি সাময়িক তৃপ্তি দিতে পারে; কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে রাষ্ট্র এবং দলকে দুর্বল করে। ক্ষমাশীলতা, সংলাপ এবং আইনের শাসনের প্রতি অঙ্গীকার থাকলে নতুন অধ্যায় সত্যিই নতুন হয়ে ওঠে।
জামায়াতসহ বিরোধী জোটের ভূমিকা এখন গুরুত্বপূর্ণ। কিছু আসনে ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দাবি করেছে দলগুলো। দাবিগুলোর পক্ষে কিছু প্রমাণও দাখিল করেছেন তারা। গণনার সময় প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং রাতের গভীরে ফল প্রকাশ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জামায়াত সমর্থকদের মধ্য থেকে অভিযোগ আসছে, কিছু ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’য়ের মাধ্যমে সম্ভাব্য জয়কে পরাজয়ে রূপান্তর করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন, এ ধরনের হস্তক্ষেপের উদ্দেশ্য ছিল ‘ক্লোজ কনটেস্ট’ আসনগুলোতে ফলাফলের দিক পাল্টে দেয়া।
অভিযোগ খতিয়ে দেখতে হবে নির্বাচন কমিশনকে। স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে নির্বাচন নিয়ে মানুষের আশা এবং আস্থা ‘চিরতরে’ হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। বারবার মানুষ প্রতারিত হতে চায় না। আমরা দেখেছি, অতীতে প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন কিভাবে দীর্ঘ রাজনৈতিক অন্ধকার ডেকে এনেছে। অনেকের মধ্যে ২০০৮ সালের নির্বাচনকে প্রশ্নের বাইরে রাখার প্রবণতা রয়েছে; কিন্তু ওই নির্বাচনে সূক্ষ্ম ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমেই বাংলাদেশের ঘাড়ে চেপে বসতে পেরেছে ফ্যাসিবাদ। ২০০৮ সালেই এর ক্ষেত্র তৈরি করা হয়েছে। ওই নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল ব্যাপক। ভোট পড়েছিল ৮৭ শতাংশ। এই বিষয়টি অনেকের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ। এর মাধ্যমে নির্বাচনের হিসাব-নিকাশ বদলে দেয়া হয়। বহু আসনে দীর্ঘ দিনের পরিচিত ভোটব্যাংক ভেঙে যায়। বদলে যাওয়া এই হিসাব চলে যায় আওয়ামী শিবিরের পক্ষে। এতে বিএনপি ও জামায়াতের অনেক জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ নেতা পরাজিত হন। এবারের নির্বাচনের আগেও বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক ওঠে; কিন্তু আসনের বিন্যাস প্রায় আগের মতোই থেকে গেছে।
নির্বাচন কমিশনের উচিত এখন সবধরনের সন্দেহের জায়গাগুলো পরিষ্কার করা। তাদের মনে রাখতে হবে, ছাত্র-জনতার রক্তে নতুন বাংলাদেশ এসেছে। বিপ্লব-পরবর্তী এই নির্বাচনে দাগ রেখে দেয়ার অর্থ শহীদদের রক্তকে অসম্মান, মানুষের সাথে প্রতারণা। প্রতারণার ফল কী হয়, উদাহরণ আমাদের সামনে জীবন্ত।
ফলাফল নিয়ে অভিযোগ থাকলেও সংযম দেখিয়েছে জামায়াত জোট। তাৎক্ষণিক কোনো কর্মসূচি দেননি তারা। বেশকিছু আসন নিয়ে তুমুল বিতর্ক থাকলেও বিশৃঙ্খলা তৈরি করেননি; বরং বিজয়ীদের অভিনন্দন জানিয়েছেন পরাজিত অনেক জামায়াত প্রার্থী। হেরে গিয়েও দেখা করতে গেছেন জিতে যাওয়া প্রার্থীদের বাড়িতে। দেশের ইতিহাসে নতুন। এটা গণতন্ত্রের সৌন্দর্য, সুস্থ রাজনীতির অংশ।
এই সংযম ও রাজনৈতিক পরিপক্বতা কেবল নির্বাচন-পরবর্তী কয়েক দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সংসদ গঠনের পরও থাকবে, সেটিই প্রত্যাশা। গণতন্ত্রে রাজপথে প্রতিবাদ জানানো নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার। তবে সংসদ কার্যকর থাকলে মতভেদ ও অভিযোগগুলো আগে সংসদের ভেতরেই তোলার সুযোগ থাকে। সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা সুস্থ রাজনীতির ধারাবাহিকতা। রাজপথ হবে শেষ অবলম্বন, প্রথম প্রতিক্রিয়া নয়Ñ এই সংস্কৃতি গড়ে উঠলেই গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে।
অতীতে আমরা দেখেছি, সংসদীয় কাঠামোকে অকার্যকর করে তোলা হয়েছিল। সাজানো বিরোধী দলকে সাথে নিয়ে সংসদকে বানানো হয়েছিল বিনোদনকেন্দ্র। ভুয়া নির্বাচনের মাধ্যমে এই ‘বিনোদনকেন্দ্রে’ নিয়ে আসা হয়েছিল নায়িকা, গায়িকা আর খেলোয়াড়দের। অথচ জাতীয় সংসদের অধিবেশন চালাতে প্রতি মিনিটে খরচ হয় প্রায় তিন লাখ টাকা। এই টাকাগুলো খরচ করা হয় দেশের আইন প্রণয়নের জন্য। আইন প্রণয়নে সরকারি দলের যেমন ভূমিকা থাকবে, তেমনি বিরোধী দলের ভূমিকাও থাকতে হবে; কিন্তু আমরা এর আগে বিরোধী দলকে সংসদে নয়, অধিকাংশ সময় রাজপথে দেখেছি। অনেক ক্ষেত্রে সরকারি দলের বেপরোয়া আচরণের কারণেই এমনটা হয়েছে। জাতীয় সংসদে বিরোধী দল যদি গঠনমূলক চাপ সৃষ্টি করতে পারে, তাহলে সরকারও জবাবদিহির মধ্যে থাকে। এই ভারসাম্যে গণতন্ত্রে প্রাণ আসে। এর জন্য সরকারি দল ও বিরোধী দলকে হতে হয় ‘রেসপন্সিবল’ এবং ধৈর্যশীল। এই ধারণা এখন বাস্তবে দেখানোর সময় এসেছে।
জনগণ এবার ভোট দিয়েছে পরিবর্তনের জন্য, অচলাবস্থার জন্য নয়। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হলো বিতর্ক। সেই বিতর্কের জায়গা সংসদ। জাতীয় নিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতি, বড় অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত, এসব প্রশ্নে সংসদে ন্যূনতম ঐকমত্য থাকা জরুরি। তা ছাড়া ভূ-রাজনীতির জটিল সময়ে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিতে হবে। কোনো আধিপত্যবাদী বলয়ের কাছে মাথা বিক্রি না করে জাতীয় স্বার্থ দেখা জরুরি।
রাষ্ট্র গঠনে বড় দায়িত্ব নাগরিকদেরও। আমরা সাধারণত ভোট দেয়ার পর দায়িত্ব শেষ হয়ে গেছে বলে মনে করি; কিন্তু গণতন্ত্রে ভোট শেষ কথা নয়; বরং শুরু। যাকে ভোট দেয়া হয়েছে কিংবা দেয়া হয়নি– জনপ্রতিনিধি সবার। তার কাছে জবাব চাওয়ার অধিকারও সবার। এবার জনগণ যে প্রত্যাশা নিয়ে ভোট দিয়েছে, সেই প্রত্যাশার বাস্তব অগ্রগতি দেখতে চাইবে তারা। প্রতিশ্রুত ফ্যামিলি কার্ডসহ নানা কার্ডের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করবে। সংস্কার কতদূর এগোলো, জানতে চাইবে সেটিও। মানুষ জানতে চাইবে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কী ভূমিকা নেয়া হলো। সেই সাথে অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তপনা বন্ধে কী করা হচ্ছে, কর্মসংস্থান ও দ্রব্যমূল্য নিয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন এলো কি না। এই প্রশ্নগুলো তুলতে হবে নাগরিকদেরই। জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে রাজনীতির অভ্যাস বদলায় না, ক্ষমতার চরিত্রও বদলায় না।
আমরা দীর্ঘ অন্ধকার দেখেছি। একটা নির্বাচনের মাধ্যমে এবার সত্যিই ভোরের আলো এসেছে; কিন্তু ভোর মানেই দিন নয়। দিন শুরু হয় কাজ দিয়ে, দায়িত্ব দিয়ে, প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন দিয়ে।
লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত
[email protected]



