বিজয় দিবসে কিছু কথা কিছু ভাবনা

এবারের মহান বিজয় দিবস এমন এক সময় এসেছে যখন দেশে কাক্সিক্ষত জাতীয় নির্বাচনের ডামাডোল শুরু হয়ে গেছে। ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে। এখন অপেক্ষা একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের। ডিসেম্বর আমাদের বিজয়ের মাস। আজ থেকে ৫৪ বছর আগে এ মাসেই আমরা হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বিজয় অর্জন করি।

১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই হঠাৎ শুরু হয়নি। এটি ছিল আমাদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আন্দোলন ও স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের চ‚ড়ান্ত পরিণতি। জাতির প্রেরণার উৎস গৌরবময় এ বিজয় দিবস বর্তমানে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের আর্থসামাজিক, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে এবং বাঙালির জীবনচেতনায় গভীরভাবে সম্পৃক্ত। এ বিজয়ের অনুপ্রেরণা থেকে বাঙালির আজকের দীর্ঘ পথচলা, যাবতীয় অর্জন ও সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় চেতনা।

১৬ ডিসেম্বর তথা মহান বিজয় দিবস বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জন। আর এ অর্জনের পেছনে ছিল জাতির অপরিসীম ত্যাগ-তিতিক্ষা, নিরলস সাধনা। যুগ যুগ ধরে বাঙালি স্বপ্ন দেখেছে নিজেদের একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র কায়েমের। ১৬ ডিসেম্বরের বিজয় আমাদের এনে দিয়েছে সেই স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ। এ বিজয়, আমাদের জাতীয় আত্মপরিচয়ের বিজয়। আমাদের প্রেরণার উৎস।

১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে স্বাধীনতার যে সূর্য অস্তমিত হয়েছিল সেটির পুনরোদয় ঘটে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। এই দিনেই স্বাধীন জাতি হিসেবে আমাদের জয়যাত্রা শুরু। তাই আমাদের জাতীয় জীবনে ১৬ ডিসেম্বর গভীর তাৎপর্য বহন করে।

এই বিজয়ের লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতা অর্জনের পাশাপাশি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা; যেখানে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিক সমান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অধিকার ভোগ করবে। যেখানে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। সব আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগযোগ্য হবে। কিন্তু স্বাধীনতার যে মূল প্রত্যয়, সেই গণতন্ত্র আমরা সংহত করতে পারিনি। নাগরিক স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সূচকগুলো এখনো নি¤œমুখী। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিও এমন স্তরে নিয়ে যেতে পারেনি, যেখানে সংসদই রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হবে এবং আলোচনার মাধ্যমে সব রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান করা যাবে। বিশেষ করে গত প্রায় ষোলো বছর জাতির কাঁধে চেপে বসেছিল ইতিহাসের জঘন্যতম স্বৈরাচারী ফ্যাসিস্ট শাসক, যাকে আধুনিক বিশ্বের ফ্যাসিবাদের জননী হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। বিগত তিনটি প্রহসনের জাতীয় নির্বাচন এবং জোরপূর্বক রাষ্ট্রক্ষমতা কুক্ষিগত করে স্বাধীনতার মূল চেতনা, গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, বৈষম্যমুক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থা, অর্থনৈতিক মুক্তি ও সুশাসনকে নির্বাসিত করে জালিম শেখ হাসিনার সরকার।

সেই সাথে দেশ থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের নাম-নিশানা মুছে দেয়। কার্যত একদলীয় সরকারব্যবস্থা কায়েম করা হয়। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের লেবাসে কুচক্রী হাসিনা জাতিকে বিভক্ত করে রাখে। দেশের সর্বস্তরে সৃষ্টি হয় বৈষম্য। রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষের বাকস্বাধীনতা কেড়ে নেয়া হয়। দেশের সম্পদ লুট করে বিদেশে পাচার করে ফ্যাসিবাদ সরকারের ঘনিষ্ঠরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পেটোয়া বাহিনীতে পরিণত করে। মিথ্যা মামলা, হয়রানি, গায়েবি মামলা, গুম, খুন করে জনগণকে ভীতসন্ত্রস্ত করে রাখে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ছিল নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়। বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের রাজনৈতিক বিরোধিতাকে জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদ বলে আখ্যা দিয়ে দমন নিপীড়ন চালানো ছিল হাসিনাগংয়ের নিয়মিত কর্র্মসূচি। তার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সারা দেশে ‘আয়নাঘর’-এর মতো নিষ্ঠুরতম অমানবিক নির্যাতনের কুঠুরি তৈরি করা হয়। একটি ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের সব উপাদান নিশ্চিত করে দুর্বৃত্ত হাসিনার সরকার; শুধুমাত্র একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সেবাদাসী হিসেবে নিজেকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে। দীর্ঘ প্রায় ষোলো বছর পর অবশেষে ছাত্র-তরুণ-জনতার অসমসাহসী আন্দোলন ও রক্তদানের মধ্য দিয়ে জাতির সেই কাক্সিক্ষত মুক্তি আসে গত ৫ আগস্ট। ওই দিন স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশে থেকে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়। জাতি মুক্তি পায় ঘাড়ে চেপে বসা জগদ্দল পাথরসম ফ্যাসিবাদী শাসকগোষ্ঠীর হাত থেকে। নতুনরূপে আমরা বাংলাদেশকে ফিরে পাই। অধিকাংশ দেশবাসী জুলাই গণবিপ্লবের মাধ্যমে অর্জিত এই বিজয়কে দেশের ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ হিসেবেও অভিহিত করে থাকেন।

৫ আগস্ট দেশ স্বৈরাচারমুক্ত হলেও এখনো ফ্যাসিবাদের দোসররা আসন্ন নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করে পরিবর্তিত বাংলাদেশকে একটি অকার্যকর রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য দেশে-বিদেশে ষড়যন্ত্র অব্যাহত রেখেছে।

২৪-এর জুলাই বিপ্লবের মতো ১৯৭১ সালেও দল-মত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের আপামর জনতা স্বাধীনতাযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। ঐতিহাসিক এই সংগ্রামের বিজয় ছিল পুরো জাতির ঐক্যবদ্ধ ত্যাগ ও তিতিক্ষার ফল। কিন্তু স্বাধীনতার স্বাদ পাওয়ার আগেই আওয়ামী লীগ সেই বিজয় ছিনতাই করে একে ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত করেছিল। গণতান্ত্রিক চেতনার বিপরীতে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল।

এ বছর স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর বাংলাদেশের নবযাত্রায় জাতি বাধাহীনভাবে নতুন উদ্যম ও উদ্দীপনা নিয়ে বিজয়ের দিনটি পালন করছে। স্বৈরশাসককে ক্ষমতাচ্যুত করতে গিয়ে প্রায় পনেরো শত ছাত্র-জনতা শাহাদত বরণ করেছে, সাত শতাধিক মানুষ চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছে, অনেকে তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ খুইয়েছে, কমপক্ষে ২৪ হাজার মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়েছে, বিপুলসংখ্যক মানুষকে জোরপূর্বক গুমের শিকার হতে হয়েছে, অনেক আহত মানুষ এখনো হাসপাতালের বিছানায় যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী হঠাতে এবং এরপর এ বছর শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনের কবল থেকে প্রিয় মাতৃভ‚মিকে মুক্ত করতে যেসব শহীদ সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাদের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিতে নতুন করে শপথ গ্রহণ করার দিন এখন।

বিজয় দিবসের প্রকৃত অর্থ শুধু শত্রুর পরাজয় নয়, বরং দেশের মানুষের আত্মমর্যাদা, স্বাধীনতার শপথ এবং সাম্প্রতিক সময়ে দেশে যে চ্যালেঞ্জগুলো সামনে আসছে, তার মোকাবেলার অঙ্গীকার। এটি অত্যাচারী শাসকের হাত থেকে মুক্তির প্রতীক, যা আজ ২০২৫ সালে দাঁড়িয়ে এই চেতনা একটি ভিন্ন মাত্রা ধারণ করে।

এবারের বিজয়ের দিবস একেবারে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে আমাদের দ্বারে উপনীত। জুলাই আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মানুষের মনে নতুন বাংলাদেশ দেখার যে আকাক্সক্ষার জন্ম হয়েছে তা এবারের বিজয়েরক্ষণে ভিন্ন মাত্রা পাবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে মানুষের আশা আকাক্সক্ষা এক মোহনায় এসে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবে। এটাই এবারের বিজয় দিবসের প্রত্যাশা।

বিজয় দিবসের চেতনা আমাদেরকে শুধু অতীতের সংগ্রামের কথা মনে করিয়ে দেয় না, বরং আমাদের সামনে একটি নতুন দিনের সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচন করে দেয়। যে অসমসাহসী আত্মত্যাগের বিনিময়ে আজকের এই বিজয় অর্জন সম্ভব হয়েছে, সেই বীরদের আত্মার কাছে আমাদের প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়া উচিত যে আমরা সব প্রতিক‚লতা মাড়িয়ে জাতিকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাবো। দেশের প্রতিটি নাগরিকের অধিকার রক্ষা, সাম্যের ভিত্তিতে সমাজ নির্মাণ এবং সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার অঙ্গীকার পালনে আমরা পিছপা হবো না।

বিগত দিনের ফ্যাসিস্ট স্বৈরশাসক নিজ স্বার্থ চরিতার্থ করতে রাষ্ট্রযন্ত্রের সব বিভাগকে অকার্যকর করে ফেলেছিল; যা সংস্কার করা জরুরি হয়ে পড়ায় বর্তমান সরকার সে সংস্কারকাজ যথাসম্ভব দ্রæত সময়ে শেষ করতে সর্বশক্তি প্রয়োগ করেছে। জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের গতি ধারণ করে অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কার কমিশন গঠন করে প্রয়োজনীয় সংস্কারের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। এখন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্পন্ন করে নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর হবে। আমরা চাই, দেশে গণতন্ত্রের সুবাতাস বয়ে চলুক প্রবল গতিতে। স্বৈরতন্ত্রের কালো থাবার কবলে এতদিন যে গণতন্ত্র কুক্ষিগত ছিল তা উদ্ধার হোক বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের হাত ধরে। সরকারের কাছে প্রত্যাশা, তারা একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন দিয়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে দেশকে গণতন্ত্রের মহাসড়কে উঠিয়ে দেবে, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো ফ্যাসিবাদের আবির্ভাব হতে না পারে।

এই বিজয়ের দিনে আসুন আমরা সবাই মিলে ২০২৪ এর জুলাই বিপ্লবের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে একটি দুর্নীতিমুক্ত, শোষণহীন ও বৈষম্যহীন দেশ গড়তে এবং ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় নিজ নিজ অবস্থান থেকে আরো বেশি অবদান রাখি। সৎ ও যোগ্য মানুষের নেতৃত্বে দেশ ও জাতিকে উন্নয়ন, অগ্রগতি ও আধুনিকতার পথে শীর্ষচূড়ায় এগিয়ে নিয়ে যাই। গড়ে তুলি মানবিক, উন্নত ও সমৃদ্ধশালী এক নতুন বাংলাদেশ।

লেখক : কবি, শিক্ষাবিদ ও প্রাবন্ধিক