নতুন যুদ্ধের ছায়া

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর কোয়ান্টাম প্রযুক্তির যুগে পারমাণবিক বিপদ

পারমাণবিক অস্ত্র আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে, আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে প্রযুক্তিকে মানবিক বিবেচনার অধীন রাখা। না হলে, আগামী যুদ্ধের গল্পটা হয়তো আমরা পড়ার সুযোগই পাব না।

একটা ভুল বোতাম চাপলেই গোটা পৃথিবী পুড়ে ছারখার হয়ে যেতে পারে—এই ভয় আমরা বহুদিন ধরেই করে এসেছি। তবে ২০২৫ সালের দুনিয়ায় সেই বোতাম আর মানুষের হাতে নেই শুধু। সেই সিদ্ধান্তে ঢুকে পড়েছে এক নতুন ‘মস্তিষ্ক।’ এআই, অর্থাৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।

স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট বা সিপরি-এর সদ্যপ্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার আর কমছে না। বরং দ্রুত বাড়ছে চীনের মতো দেশের ভাণ্ডার, আর সেইসাথে বেড়ে চলেছে যুদ্ধের ঝুঁকি। শুধু অস্ত্র নয়, এখন এই যুদ্ধের কৌশল নির্ধারণে ব্যবহৃত হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর কোয়ান্টাম প্রযুক্তি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দু’ প্রযুক্তি পারমাণবিক যুদ্ধকে করে তুলছে আরো অনিশ্চিত, দ্রুতগামী ও বিপজ্জনক।

সিপরির পরিচালক ড্যান স্মিথ এই নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতাকে আগের চেয়ে অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এবং অনিশ্চিত বলে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, এবারকার প্রতিযোগিতার অন্যতম উপাদান হলো আক্রমণ এবং প্রতিরক্ষার দু’ ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা যায় এমন এআই প্রযুক্তিতে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা।

‘নতুন নতুন প্রযুক্তি সিদ্ধান্ত নেয়ার গতি বাড়িয়ে দিচ্ছে। পাশাপাশি বাড়াচ্ছে ভুল বোঝাবুঝির ঝুঁকি বা মিসকমিউনিকেশন। কিংবা টেকনিক্যাল বা প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণেও যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কা বাড়ছে’ বলেন স্মিথ। এআই আমাদেরকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করলেও, সেই সিদ্ধান্তগুলো সবসময় বিবেচনাসাপেক্ষ হয় না। ঠিক যেমন ১৯৮৩ সালে সোভিয়েত সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল স্তানিস্লাভ পেত্রভ একটি ভুল কম্পিউটার সংকেত উপেক্ষা করে হয়তো গোটা দুনিয়াকে পারমাণবিক যুদ্ধ থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন। তখন তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে কোনো মিসাইল আসছে না, এটা কম্পিউটারের ভুল। কিন্তু যদি সেই সিদ্ধান্তটা এআই-এর ওপর নির্ভর করতো তা হলে ফলাফল কী দাঁড়াত?

পেত্রভের কাহিনির দিকে এ ফাঁকে নজর বুলাই। ১৯৮৩ সালের ২৬শে সেপ্টেম্বর। সোভিয়েত ইউনিয়নের একটি গোপন সামরিক ঘাঁটি—সেরপুখভ-১৫। ভোর রাত। বাইরে অন্ধকার।ভেতরে কড়া নজরদারির ঘর। কম্পিউটার মনিটরগুলো নীরব। হঠাৎই কেঁপে ওঠে একটা স্ক্রিন। সাথে সাথেই বাজে বিপদ ঘণ্টা। কম্পিউটার বলছে, মার্কিকন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ছোঁড়া হয়েছে একটি পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র, সোজা রাশিয়ার দিকে ছুটে আসছে। তার কিছুক্ষণ পর, আরো একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করে সোভিয়েত স্যাটেলাইট-নিয়ন্ত্রিত সতর্কতা ব্যবস্থা। এই সংকেতের অর্থ একটাই—পারমাণবিক যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।

ঘরের মধ্যে তখন একজন মানুষ, লেফটেন্যান্ট কর্নেল স্তানিস্লাভ পেত্রভ। দায়িত্ব তার ঘাড়েই। এখন যদি তিনি কম্পিউটারের সতর্ক সংকেত অনুযায়ী মস্কোতে প্রতিবেদন পাঠান, তাহলে তাৎক্ষণিক পাল্টা আঘাত হানবে সোভিয়েত ইউনিয়ন। পৃথিবী তাতে পরিণত হতে পারে জ্বলন্ত ছাইয়ের স্তূপে।

কিন্তু পেত্রভ থামলেন।

তিনি কম্পিউটার স্ক্রিনের দিকে তাকালেন, নিজের প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা আর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে ভাবতে শুরু করলেন, আসলেই কি যুক্তরাষ্ট্র এমনভাবে আক্রমণ করবে? মাত্র পাঁচটি ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে? এত ছোট মাত্রায়

তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, এই সঙ্কেত ভুল। তিনি তাৎক্ষণিক প্রতিবেদন পাঠানো বন্ধ রাখলেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানালেন এটা প্রযুক্তিগত বিভ্রান্তি হতে পারে। কয়েক মিনিট পেরিয়ে গেল। মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র সোভিয়েতের কোথাও আঘাত করেনি। পেত্রভ ঠিকই ছিলেন। পরে জানা গেল, সোভিয়েত সতর্কতা ব্যবস্থাটি বৈশ্বিক কক্ষপথে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে আসা মেঘপুঞ্জকে ক্ষেপণাস্ত্র মনে করেছিল।

তাহলে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে পাল্টা পারমাণবিক আক্রমণ হতো যুক্তরাষ্ট্রে। যুক্তরাষ্ট্রও পাল্টা আঘাত হানত। মুহূর্তেই শুরু হতো তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ। বেঁধে যেত একটা সম্পূর্ণ পারমাণবিক ধ্বংসযুদ্ধ।

এই ঘটনা বহু বছর গোপন রাখা হয়েছিল। পেত্রভকে কোনো জাতীয় পুরস্কার দেয়া হয়নি তখন। তার কৃতিত্বের কথা দুনিয়া জানে বহু পরে। তবে আজ অনেকেই তাকে বলেন, যে মানুষটা পৃথিবীকে বাঁচিয়ে ছিলেন। কিন্তু পেত্রভ নিজে বলেছিলেন, আমি নায়ক নই। আমি শুধু আমার দায়িত্ব পালন করেছি। আমি সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছি, কপাল ভালো ছিল, তাতেই রক্ষা। একটা মানুষ, একটি সিদ্ধান্ত, আর একটা গোটা পৃথিবী রক্ষা—এই হলো স্তানিস্লাভ পেত্রভের গল্প। প্রযুক্তি যতই শক্তিশালী হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত মানবিক বিবেচনার দরজাটুকু খোলা থাকাটাই আমাদের একমাত্র আশ্রয়।

২০২৪ সালেই চীন তার পারমাণবিক ওয়ারহেড বা বোমার সংখ্যা ৫০০ থেকে বাড়িয়ে ৬০০-তে নিয়ে গেছে। শুধু তা-ই নয়, রিপোর্ট অনুযায়ী ৩৫০টি আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক মিসাইল সাইলো (মাটির নিচের ক্ষেপণাস্ত্র গুদাম) এরইমধ্যে নির্মাণ করা হয়েছে বা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। প্রেসিডেন্ট শি চিনফিং এর অধীনে চীনের সামরিক আধুনিকীকরণের এই প্রয়াস পারমাণবিক সক্ষমতাকে দ্রুত আরো তীব্রতর করে তুলছে।

চীনের এই বাড়বাড়ন্তের পেছনে আছে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যকার অস্ত্রনিয়ন্ত্রণ চুক্তিগুলোর ভাঙন দশা। ২০১০ সালে ওবামা ও পুতিনের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘নিউ স্টার্ট’ নামের চুক্তি আগামী ফেব্রুয়ারিতে শেষ হয়ে যাবে। এই চুক্তি নবায়নের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

বর্তমানে বিশ্বের নয়টি দেশের হাতে রয়েছে পারমাণবিক অস্ত্র। এর মধ্যে পাঁচটি—যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স—জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য এবং পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ চুক্তির (এনপিটি) সইকারী। ভারত ও পাকিস্তান নিজেরা নিজেদের পারমাণবিক শক্তি ঘোষণা করলেও চুক্তিতে সই করেনি। উত্তর কোরিয়া সই করেও পরে সরে আসে। আর ইসরাইল তো চুক্তি তো দূরে থাক, নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্র থাকার কথাই স্বীকার করেনি। যদিও ধারণা, ইহুদিবাদী তেলআবিবের হাতে আছে প্রায় ৯০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড বা বোমা।

বিশ্বে ২০২৫ সালে মোট অনুমানিক পারমাণবিক ওয়ারহেডের সংখ্যার দিকে এগিয়ে রয়েছে রাশিয়া। দেশটির রয়েছে ৪,৩০৯ বোমা। আমেরিকার রয়েছে ৩,৭০০, চীন ৬০০, ফ্রান্স ২৯০,যুক্তরাজ্য ২২৫, ভারত ১৮০, পাকিস্তান ১৭০, ইসরাইল ৯০ এবং উত্তর কোরিয়া ৫০।

সিপরির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং কোয়ান্টাম প্রযুক্তি একদিকে যেমন পারমাণবিক চুক্তিগুলোর বাস্তবায়ন তদারকি সহজ করতে পারে, অন্যদিকে এটি অনিচ্ছাকৃত যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কাও বাড়িয়ে দিতে পারে। কারণ, এসব প্রযুক্তি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে অনেক সময় মানবিক অনুধাবন বা রাজনৈতিক প্রসঙ্গকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে পারে না। ভার্জিনিয়ার উইলিয়াম অ্যান্ড মেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের পারমাণবিক নিরাপত্তা গবেষক জেফ্রি ক্যাপলো মনে করেন, সঠিকভাবে প্রোগ্রাম করা হলে এআই সঙ্কটজনক পরিস্থিতিতে মানুষের চেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তবে ‘মানবিক বিচারবোধ আর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বোঝার ক্ষমতা’ প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতার মধ্যেই পড়ে।

সিপরি সতর্ক করছে, বিশ্ব আবার নতুন একটি অস্ত্র প্রতিযোগিতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই প্রতিযোগিতা আগের চেয়ে বেশি বৈচিত্র্যময়, বহুমুখী, জটিল এবং ভয়াবহ হতে পারে। কারণ, এবার প্রতিযোগীরা শুধু পারমাণবিক অস্ত্রে নয়, বরং তথ্য প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়েও লড়াইয়ে নামছে। কোনো যুদ্ধ ঘোষণার মধ্য দিয়ে এই যুদ্ধ হয়তো শুরু হবে না। হতে পারে সেটা শুরু হবে একটি ভুল সঙ্কেত, একটি অ্যালগোরিদমের ভুল সিদ্ধান্ত, অথবা কোনো কম্পিউটার ভাইরাসের মাধ্যমে। তার ফলাফল? হতে পারে পৃথিবীর জন্য চূড়ান্ত ধ্বংস। সেই যুদ্ধ আরো বেশি ভয়ানক যে লড়াইয়ে মানুষের হাতে থাকবে না ট্রিগার। পারমাণবিক অস্ত্র আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে, আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে প্রযুক্তিকে মানবিক বিবেচনার অধীন রাখা। পেত্রভের কাহিনির শেষ কথা, প্রযুক্তি যতই শক্তিশালী হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত মানবিক বিবেচনার দরজাটুকু খোলা থাকাটাই আমাদের একমাত্র আশ্রয়। না হলে, আগামী যুদ্ধের গল্পটা হয়তো আমরা পড়ার সুযোগই পাব না।