ডক্টর দিপু সিদ্দিকী
বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা অসুস্থ। ফুটপাথ থেকে রাজপথ, বাসস্ট্যান্ড থেকে সচিবালয়- সর্বত্রই বিশৃঙ্খলা। এখানে অধিকার লুণ্ঠনের এক উৎসব চলছে। চিন্তক মহিউদ্দিন মোহাম্মদের ‘বানরের আয়না’ গ্রন্থে বর্ণিত সেই ‘চৌর্যপরজীবী’ বা ক্লিপ্টোপ্যারাসাইটিক মানসিকতা এখন কেবল উচ্চপদস্থ আমলাতন্ত্রের ড্রয়িংরুমে সীমাবদ্ধ নেই; তা বিষবৃক্ষের মতো ছড়িয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের স্নায়ুতন্ত্রে। আমাদের এই প্রাত্যহিক অনাচার, সামাজিক অসমতা এবং নৈতিকতাহীন শিক্ষাব্যবস্থা কীভাবে একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে খাদের কিনারে ঠেলে দেয় এবং ‘ডিপ স্টেট’-এর পথ প্রশস্ত করে, তার একটি নির্মোহ বিশ্লেষণ এখন সময়ের দাবি।
নাগরিক মনস্তত্ত্বের গভীর বিকার
রাস্তায় হাঁটার সময় যখন একজন তার সামনের মানুষটিকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয় কিংবা বাসে উঠার জন্য মরণপণ লড়াইয়ে লিপ্ত হয়, তখন সেটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ট্রাফিক জ্যাম বা ভিড়ের দৃশ্য নয়। এটি মূলত একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিকারের বহিঃপ্রকাশ। এই আচরণের মূলে কাজ করে ‘কাক্সিক্ষত গন্তব্যে’ যেকোনো মূল্যে পৌঁছানোর এক উন্মাদনা, যেখানে পাশের মানুষটি আর সহযাত্রী থাকে না হয়ে ওঠে চরম প্রতিপক্ষ।
রিকশাচালক থেকে শুরু করে বিলাসবহুল প্রাইভেটকারের মালিক পর্যন্ত সবাই যখন ট্রাফিক আইন ভেঙে আগে যেতে চান, তখন বুঝতে হবে আমাদের ভেতরকার ‘সামাজিক চুক্তি’ (Social Contract) পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। যখন কোনো সমাজে নিয়ম মেনে চলাকে ‘বোকামি’ এবং আইন ভাঙাকে ‘স্মার্টনেস’ বা আভিজাত্য হিসেবে দেখা হয়, তখন সেই সমাজের নাগরিকরা আর একটি সংহতিবদ্ধ জাতি হিসেবে অবশিষ্ট থাকে না। তারা পরিণত হয় কতগুলো বিচ্ছিন্ন, স্বার্থপর ও আক্রমণাত্মক ইউনিটে। এই যে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের অভাব, এটিই একটি রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে ফোকলা করে দেয়ার প্রথম ধাপ। নাগরিক সংহতিহীন ভূ-খণ্ডের সার্বভৌমত্ব কেবল একটি বিমূর্ত ধারণা হয়ে টিকে থাকে।
মেধাবী ‘শিকারি’ তৈরির কারখানা
আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা এখন জিপিএ ৫ কিংবা বিসিএস ক্যাডার হওয়ার এক যান্ত্রিক ও প্রাণহীন কারখানায় পরিণত হয়েছে। পাঠ্যপুস্তকে নৈতিকতা, সহমর্মিতা ও মানবিকতার স্থান এখন অতি নগণ্য। ফলে একজন শিক্ষার্থী যখন ১৬-১৭ বছরের শিক্ষা জীবন শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করে, তখন তার কাছে সাফল্যের একমাত্র সংজ্ঞা দাঁড়ায় ‘ বৈভব নিজ আয়ত্তে আনা’।
শিক্ষা যখন কেবল আর্থিক অভিলাষ পূরণ ও ক্ষমতার সিঁড়ি হয়, তখন ছাত্ররা শেখে কীভাবে অন্যকে ‘ল্যাং’ মেরে উপরে উঠতে হয়। এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা সমাজের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের মধ্যে এক বিশাল মানসিক পরিখা তৈরি করেছে। দরিদ্র পরিবার থেকে আসা মেধাবী তরুণটি যখন দেখে, তার মেধার চেয়ে ‘সিস্টেম’ বা ‘কানেকশন’ বেশি শক্তিশালী, তখন সে টিকে থাকার তাড়নায় আপন নীতি বিসর্জন দেয়। এই নৈতিক স্খলনই এক সময় মহিউদ্দিন মোহাম্মদের বর্ণিত ‘বেনজির সিনড্রোম’ বা প্রাতিষ্ঠানিক লুণ্ঠনের পথ তৈরি করে। শিক্ষা এখানে বিবেক জাগ্রত করার বদলে এক প্রকার ‘শিকারি মানসিকতা’ তৈরি করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য আত্মঘাতী।
সামাজিক বৈষম্য ও জিঘাংসার সংস্কৃতি
সমাজে যখন সম্পদের সুষম বণ্টন থাকে না এবং ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান আকাশচুম্বী হয়, তখন সেখানে স্বাভাবিকভাবেই জিঘাংসা জন্ম নেয়। একটি বিলাসবহুল গাড়ি যখন সিগন্যাল ভেঙে চলে যায় আর একজন অভুক্ত পথচারী তা অপলক চেয়ে দেখে, তখন সেই পথচারীর মনে কোনো আনুগত্য নয়; বরং এক প্রকার তীব্র হিংসা ও ক্ষোভের উদ্রেক হয়। এই অর্থনৈতিক অবিচার মানুষকে ‘প্রতিশোধবাদী ক্ষমতালিপ্সু’ করে তোলে।
যারা আজ বঞ্চনার শিকার, তারা সুযোগ পেলেই সেই ক্ষোভ উগরে দেয় রাষ্ট্রের ওপর কিংবা নিজের চেয়ে দুর্বল কোনো নাগরিকের ওপর। এই প্রতিশোধমূলক মানসিকতা যখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বা প্রশাসনে আসীন হয়, তখন তারা রাষ্ট্রকে নিজের জমিদারি মনে করতে শুরু করে। তারা তখন আর সেবক থাকে না, হয়ে ওঠে শোষক। ফলে দুর্নীতি তখন আর ব্যক্তিগত বিচ্যুতি থাকে না, তা হয়ে ওঠে একটি সুশৃঙ্খল প্রাতিষ্ঠানিক আচার। যখন দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পদকে সমাজ বাহবা দেয়, তখন সেই রাষ্ট্রের পতন কেবল সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।
‘ডিপ স্টেট’ ও সার্বভৌমত্বের অন্তিম সঙ্কট
অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন, রাস্তার সাধারণ ধাক্কাধাক্কি বা ব্যক্তি পর্যায়ের দুর্নীতি কীভাবে একটি রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে হুমকির মুখে ফেলে? এর উত্তর নিহিত রয়েছে ‘ডিপ স্টেট’ বা ছায়া-রাষ্ট্রের ভয়াবহ ধারণার মধ্যে।
ক. প্রশাসনিক মেরুদণ্ডহীনতা ও ছায়া-রাষ্ট্র : যখন কোনো দেশের সিভিল সার্ভিস এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি বড় অংশ ‘মানসিকভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত’ হয়ে পড়ে, তখন রাষ্ট্র তার নিজস্ব স্বকীয়তা হারায়। এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহল পর্দার আড়াল থেকে কলকাঠি নাড়তে শুরু করে। একজন পদস্থ কর্মকর্তা যখন নিজের পদের অমর্যাদা করে অবৈধ সম্পদ অর্জনে মগ্ন থাকেন, তখন তিনি আর রাষ্ট্রের অনুগত থাকেন না; তিনি হয়ে পড়েন সেই অশুভ শক্তির দাসে, যারা তার অপরাধের ফাইলগুলো হাতে নিয়ে তাকে ব্ল্যাকমেইল করে। এভাবেই সার্বভৌমত্বের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় বিদেশের ল্যাবরেটরিতে বা স্বার্থান্বেষী মহলের গোপন ডেরায়।
খ. জাতীয় চরিত্রের অবক্ষয় : সার্বভৌমত্ব কেবল মানচিত্রের চার সীমানা রক্ষা নয়, এটি মূলত জনগণের ঐক্যবদ্ধ ইচ্ছার একটি ইস্পাতকঠিন প্রতিফলন। যখন নাগরিক প্রতি পদে পদে রাষ্ট্রের কাছে বিচারহীনতার শিকার হয়, যখন অনৈতিকতাই স্বাভাবিক রীতি হয়ে দাঁড়ায়, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে রাষ্ট্রের প্রতি কোনো মমত্ববোধ কাজ করে না। একটি আদর্শহীন ও নৈতিকতাহীন জাতিকে বহিঃশত্রু খুব সহজেই মনস্তাত্ত্বিকভাবে পরাস্ত করতে পারে। জাতীয় চরিত্রের এই বিলুপ্তি ভৌগোলিক সার্বভৌমত্বকে তাসের ঘরের মতো ভঙ্গুর করে দেয়।
গ. অর্থনৈতিক দাসত্ব : ব্যাপক দুর্নীতি ও লুণ্ঠনের ফলে দেশ থেকে বিপুল অর্থ পাচার হয়। এই অর্থনৈতিক রক্তক্ষরণ রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিকভাবে ঋণী ও অন্যের মুখাপেক্ষী করে তোলে। যখন একটি রাষ্ট্র আর্থিকভাবে পরাধীন হয়, তখন তার অভ্যন্তরীণ বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও গোপন চুক্তির মাধ্যমে অন্যের হাতে চলে যায়। তখন সার্বভৌমত্ব কেবল কাগজের মানচিত্র আর জাতীয় পতাকায় সীমাবদ্ধ থাকে, যার প্রাণভোমরা থাকে অন্য দেশের হাতে।
উত্তরণের পথ : একটি সর্বাত্মক মনস্তাত্ত্বিক বিপ্লব
এই ভয়াবহ গন্তব্য থেকে জাতিকে ফেরাতে হলে আমাদের একদম শেকড় থেকে কাজ শুরু করতে হবে। এটি কোনো একক নেতার কাজ নয়; বরং একটি সমন্বিত সামাজিক আন্দোলন।
পারিবারিক মূল্যবোধের পুনঃপ্রতিষ্ঠা : নৈতিকতার প্রথম পাঠশালা হতে হবে পরিবার। একজন সন্তান যেন শৈশব থেকেই শেখে যে অন্যের লাইন ভেঙে আগে যাওয়া বা অন্যের অধিকার হরণ করে বড় হওয়া গৌরবের নয়; বরং চরম লজ্জার।
শিক্ষাক্রমের আমূল সংস্কার : শিক্ষাকে কেবল চাকরির বাজারমুখী না করে মানবিক ও মূল্যবোধ নির্ভর করতে হবে। পাঠ্যপুস্তকের তত্ত্বের চেয়ে একজন শিক্ষার্থীর আচরণগত উৎকর্ষকে গ্রেডিংয়ের আওতায় আনতে হবে।
বৈষম্যহীন রাষ্ট্র কাঠামো : রাষ্ট্রকে সম্পদের সুষম বণ্টন এবং মৌলিক নাগরিক সুযোগ-সুবিধার (যেমন- উন্নত গণপরিবহন ও সুলভ চিকিৎসা) সমতা নিশ্চিত করতে হবে। যখন নাগরিকরা দেখবে যে নিয়ম মেনে চললেও জীবন সহজ হয়, তখন তাদের ভেতরকার ‘হায়েনা মানসিকতা’ হ্রাস পাবে।
নির্ভীক নেতৃত্ব ও জবাবদিহিতা : প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে ভয়হীন পরিবেশ তৈরি করতে হবে। যারা সৎ ও নির্ভীক, তাদের জন্য সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অভয়াশ্রম গড়ে তুলতে হবে। বেনজির হওয়ার লালসা ত্যাগ করে ‘মানুষ’ হওয়ার আদর্শকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারে ভূষিত করতে হবে।
আমরা যদি আজ রাস্তার এই ছোটখাটো অমানবিক আচরণ বা দুর্নীতির মহোৎসবকে তুচ্ছ ভেবে এড়িয়ে যাই, তবে আমরা মূলত আমাদের নিজেদের পরাজয়ের দলিল নিজেরাই লিখছি। মহিউদ্দিন মোহাম্মদের বিশ্লেষণ আমাদের সেই কঠোর সত্যটাই মনে করিয়ে দেয়- যদি আমরা আমাদের মনস্তত্ত্ব থেকে এই অনৈতিকতা এবং পরশ্রীকাতরতা দূর করতে না পারি, তবে সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য কোনো বহিঃশত্রুর আক্রমণের প্রয়োজন হবে না; আমরা নিজেরাই নিজেদের রাষ্ট্রকে ধ্বংসের অতল গহ্বরে ঠেলে দেবো।
‘ডিপ স্টেট’ কোনো অলৌকিক দুর্যোগ নয়, এটি আমাদের দীর্ঘদিনের নৈতিক দেউলিয়াপনার ফসল। আপনি যখন অন্যের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিজের গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য মরিয়া হন, তখন জেনে রাখবেন, আপনি নিজের অজান্তেই আপনার সন্তানের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে কোনো অশুভ শক্তির হাতে নিলামে তুলে দিচ্ছেন। পরাধীন হওয়ার জন্য কামানের গোলার প্রয়োজন নেই, একটি নৈতিকতাহীন হীনম্মন্য সমাজই যথেষ্ট। তাই রাষ্ট্র বাঁচাতে হলে আগে নিজের ভেতরের ‘মানুষ’টিকে জাগ্রত করুন। অন্যথায়, মানচিত্র থাকবে, সীমানা থাকবে; কিন্তু আমরা থাকব এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক কারান্তরালে, যেখানে আমাদের কোনো স্বাধীন কণ্ঠস্বর থাকবে না।
লেখক : অধ্যাপক ও ডিন, কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, রয়েল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা।



