পুলিশি নির্যাতন : মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত সঙ্কট

আমানুর রহমান
সমাজ ও রাষ্ট্রে শৃঙ্খলা রাখা এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পুলিশের প্রধান ও পবিত্র দায়িত্ব। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশ হবে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় আস্থার জায়গা। সংবিধান ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী, কোনো নাগরিককে বিনাবিচারে শাস্তি দেয়ার অধিকার পুলিশের নেই। পুলিশের কাজ হলো অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা বা সন্দেহভাজন কাউকে গ্রেফতার করে আদালতের কাছে উপস্থাপন করা। আইন অনুযায়ী আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে তারা জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নিতে পারে; কিন্তু কোনো অবস্থাতেই শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করার এখতিয়ার তাদের দেয়া হয়নি।

বাংলাদেশ সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা আছে— কোনো ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেয়া যাবে না কিংবা নিষ্ঠুর, অমানবিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেয়া যাবে না। এ ছাড়া, ‘নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩’ অনুযায়ী পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যেকোনো সদস্যের দ্বারা সংঘটিত শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন একটি সুস্পষ্ট ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

তা সত্ত্বেও রাস্তাঘাটে সাধারণ মানুষকে চড়-থাপ্পড় মারা, অকারণে লাঠিচার্জ করা বা হেফাজতে নিয়ে মারধরের ঘটনাগুলো প্রমাণ করে, দেশে আইনের প্রয়োগের চেয়ে ক্ষমতার অপপ্রয়োগই বেশি হচ্ছে। আমাদের সমাজব্যবস্থা ও মনস্তত্ত্বে এই বেআইনি মারধর ও নির্যাতনের সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে।

জনসমক্ষে বা আড়ালে একজন মানুষকে যখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মারধর করে, তখন সেই ব্যক্তির মানবিক মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত হয়। এতে পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের যে বিশ্বাস ও সম্মান থাকার কথা, তা তীব্র ভীতি ও ক্ষোভে রূপান্তরিত হয়। একটি সভ্য সমাজে আইন ভঙ্গকারীকে আইনের আওতায় এনে আদালতের মাধ্যমে শাস্তি নিশ্চিত করা হয়; রাস্তায় ফেলে পেটানো কোনো সভ্যতার লক্ষণ হতে পারে না। যখন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা নিজেরাই আইন ভঙ্গ করে, তখন সমাজে এক ধরনের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

পুলিশের এ ধরনের অনৈতিক আচরণের পেছনে বেশ কিছু মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত কারণ কাজ করে। এর মধ্যে অন্যতম হলো জবাবদিহিতার চরম অভাব এবং ক্ষমতার দম্ভ। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, সাধারণ মানুষকে মারধরের পর অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে কোনো দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা নেয়া হয় না। বড়জোর তাদের সাময়িক বরখাস্ত বা বদলি করা হয়, যা আসলে কঠোর শাস্তি নয়। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি অন্যান্য সদস্যদেরও ক্ষমতার অপব্যবহারে বেপরোয়া করে তোলে। পাশাপাশি, পুলিশের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় মানবাধিকার, সংবেদনশীলতা ও মনস্তাত্ত্বিক বিষয়গুলোর ঘাটতি রয়েছে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ অনেক সময় পুলিশকে আইন নিজের হাতে তুলে নিতে উৎসাহিত করে।

এই অচলায়তন ভাঙতে হলে সবার আগে প্রয়োজন জবাবদিহিতা ও আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা। পুলিশের কোনো সদস্য যদি বেআইনিভাবে কারো গায়ে হাত তোলে, তবে তাকে শুধু বিভাগীয় শাস্তির আওতায় আনলেই হবে না; বরং প্রচলিত ফৌজদারি আইনে তার বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। বাহিনীর আধুনিকায়নের পাশাপাশি তাদের মানবাধিকার বিষয়ে সংবেদনশীল করার জন্য নিয়মিত মনস্তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, পুলিশ জনগণের সেবক-প্রভু নয়। নাগরিকদের টাকায় পরিচালিত একটি বাহিনী কোনোভাবেই নাগরিকদের ওপর অন্যায় বলপ্রয়োগ করতে পারে না। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে আইন প্রয়োগকারীদের সর্বপ্রথম আইন মেনে চলতে হবে। একটি গণতান্ত্রিক দেশে এমন একটি পুলিশ বাহিনী কাম্য, যারা হবে মানবিক, পেশাদার এবং জনগণের নির্ভরতার প্রতীক।