এনইআইআর: জাতীয় স্বার্থ রক্ষা জরুরি

দেশের মোবাইল শিল্পসংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোও আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারের অর্থমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে লিখিতভাবে জানিয়েছে যে, এনইআইআর অকার্যকর রাখার সুযোগে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা চোরাকারবারি সিন্ডিকেটের পকেটে চলে যাচ্ছে। অর্থাৎ রাষ্ট্র প্রতিদিন রাজস্ব হারাচ্ছে, প্রতি মাসে হারাচ্ছে কয়েকশো কোটি টাকা, আর বছরে সেই ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে কয়েক হাজার কোটি টাকায়।

আহসান হাবিব বরুন
একটি রাষ্ট্র যখন নিজের চোখের সামনে রাজস্ব লুট হতে দেখে, জনগণকে প্রতারিত হতে দেখে,জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে দেখে—তবুও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে দেরি করে, তখন প্রশ্ন জাগে: এই রাষ্ট্র আসলে কাদের জন্য পরিচালিত হচ্ছে? জনগণের জন্য, নাকি একটি শক্তিশালী চোরাকারবারি সিন্ডিকেটের জন্য?

বাংলাদেশে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার—এনইআইআর নিয়ে যে দীর্ঘ নাটক চলছে, তা কেবল একটি প্রযুক্তিগত বা প্রশাসনিক ব্যর্থতার গল্প নয়; বরং এটি একটি রাষ্ট্রের নৈতিক শক্তি, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষার সক্ষমতার নির্মম পরীক্ষা।

বাস্তবতা হলো—বাংলাদেশে অবৈধ মোবাইল ফোনের এক বিশাল কালোবাজার গড়ে উঠেছে। এই বাজার শুধু সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব গিলে খাচ্ছে না; এটি সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করছে, বৈধ ব্যবসাকে ধ্বংস করছে, হুন্ডিকে উৎসাহ দিচ্ছে এবং জাতীয় নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে—এই নেটওয়ার্ক কেবল মোবাইল আমদানিতে সীমাবদ্ধ নয়। একই চক্রের মাধ্যমে বিভিন্ন সময় সোনা, মাদক, অবৈধ ইলেকট্রনিক পণ্যসহ আরও নানা ধরনের নিষিদ্ধ বা কর ফাঁকি দেয়া পণ্য দেশে প্রবেশ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অর্থাৎ এটি শুধু একটি “গ্রে মার্কেট” নয়; এটি মূলত রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামোকে দুর্বল করে দেয়া একটি সমান্তরাল অপরাধ অর্থনীতি।

আর এর সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।

একজন ক্রেতা হয়তো বাজার থেকে অনেক কষ্টের টাকা দিয়ে একটি মোবাইল ফোন কিনছেন। দোকানদার তাকে বলছে সেটি “ব্র্যান্ড নিউ”। কিন্তু বাস্তবে সেটি হতে পারে বিদেশ থেকে আনা একটি ব্যবহৃত ফোন,যার ভেতরের যন্ত্রাংশ পরিবর্তন করা হয়েছে। ফলে কয়েকদিন যেতে না যেতেই ফোনে ব্যাটারি সমস্যা,নেটওয়ার্ক সমস্যা, হ্যাং হওয়া,ডিসপ্লে ত্রুটি বা অন্যান্য প্রযুক্তিগত জটিলতা দেখা দিচ্ছে। অথচ সাধারণ ক্রেতা বুঝতেই পারছেন না,প্রতারণার মূল কারণ ছিল সেই অবৈধ চোরাকারবারি নেটওয়ার্ক। অর্থাৎ এখানে শুধু রাষ্ট্র প্রতারিত হচ্ছে না—প্রতারিত হচ্ছে দেশের কোটি কোটি ভোক্তা।

দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতা হলো,এই বিশাল জাতীয় ও জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়টি নিয়ে গণসচেতনতা তৈরির পরিবর্তে উল্টো বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে,গণমাধ্যমের একটি অংশও এখন এই কালোবাজারি সিন্ডিকেটের প্রভাবমুক্ত নয়। ফলে অত্যন্ত কৌশলে এনইআইআরকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে যেন এটি জনস্বার্থবিরোধী কোনো সিদ্ধান্ত, অথচ বাস্তবে এনইআইআরই হচ্ছে জনগণের স্বার্থ, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা এবং বৈধ অর্থনীতিকে সুরক্ষিত করার অন্যতম কার্যকর উপায়।

একটি সভ্য রাষ্ট্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা হওয়ার কথা ছিল সত্য তুলে ধরা, জনগণকে সচেতন করা এবং রাষ্ট্রবিরোধী অর্থনৈতিক অপরাধের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া। কিন্তু যখন অর্থনৈতিক স্বার্থ ও প্রভাবের কারণে সত্য আড়াল করা হয়, তখন সমাজে এক ধরনের নৈতিক সঙ্কট তৈরি হয়।

এখানেই সবচেয়ে বড় বেদনার জায়গা।

কারণ একটি রাষ্ট্রের নৈতিক অধঃপতন তখনই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যখন অবৈধ অর্থনীতি ধীরে ধীরে বৈধতার আবরণ পেতে শুরু করে; যখন চোরাচালানকে “ব্যবসা” কর ফাঁকিকে “কৌশল”, আর হুন্ডিকে “বিকল্প ব্যবস্থা” হিসেবে দেখানোর চেষ্টা হয়।

একটি ন্যূনতম আইনের শাসনভিত্তিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এই বাস্তবতা কেবল দুঃখজনক নয়, গভীরভাবে লজ্জাজনকও বটে। কারণ রাষ্ট্র যদি অবৈধ অর্থনীতির কাছে নতজানু হয়ে পড়ে, তাহলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় আইনের শাসন, ন্যায়বিচার এবং সাধারণ মানুষের ভবিষ্যৎ।

আধুনিক বিশ্ব বহু আগেই বুঝেছে—মোবাইল ফোন শুধু যোগাযোগের যন্ত্র নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই বিশ্বের বহু দেশ IMEI-ভিত্তিক নিবন্ধন ও ব্লকিং ব্যবস্থা চালু করেছে। পাকিস্তান “DIRBS”,ভারত “CEIR” চালু করেছে। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নেপাল, শ্রীলঙ্কাসহ বিশ্বের শতাধিক দেশে IMEI নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জাতীয় নিরাপত্তা নীতির অংশ।

অথচ বাংলাদেশ ২০২১ সালেই জনগণের করের ২৯ কোটি টাকা ব্যয় করে এনইআইআর সফটওয়্যার ক্রয় করার পরও সেটি পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর করতে পারেনি। আরো বিস্ময়কর বিষয় হলো—এনইআইআর চালুর মাত্র ১০ দিনের মধ্যেই এটি কার্যত বন্ধ করে দেয়া হয়।

কিন্তু কেন? এই প্রশ্নের উত্তরেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থার এক অন্ধকার বাস্তবতা। অভিযোগ রয়েছে, চোরাকারবারি সিন্ডিকেটের চাপ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং নেপথ্যের সমঝোতার কারণেই এনইআইআর বারবার থামিয়ে দেয়া হয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এনইআইআর বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা ছিলেন তৎকালীন আইটি উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়। অভিযোগ রয়েছে,মোবাইল চোরাকারবারিদের সঙ্গে তার একটি গোপন স্বার্থগত সম্পর্ক ছিল। সেই অদৃশ্য প্রভাবের কারণেই এনইআইআর কখনো পূর্ণাঙ্গভাবে আলোর মুখ দেখেনি। জনস্বার্থ চাপা পড়ে গিয়েছিল ব্যক্তি স্বার্থ এবং ক্ষমতার বলয়ের ভেতরের সমীকরণে।

উচ্চ পর্যায়ের নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র আমাকে নিশ্চিত করেছে যে, বিটিআরসির একটি বৈঠকে এনইআইআর ব্যবস্থা কার্যকরের প্রসঙ্গ উত্থাপিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে এ বিষয়ে আর কোনো কথা না বলার জন্য সতর্ক করেছিলেন জয়। সেই কর্মকর্তা ছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, যিনি জাতীয় নিরাপত্তা ও জনস্বার্থ বিবেচনায় আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করেছিলেন।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিশেষ করে টেলিযোগাযোগ খাতের দায়িত্বে থাকা তৈয়ব আহমেদের উদ্যোগে আবারও এনইআইআর বাস্তবায়নের ঘোষণা আসে। প্রথমে ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখ নির্ধারণ করা হলেও মোবাইল ব্যবসায়ীদের আন্দোলনের মুখে তা পিছিয়ে ১ জানুয়ারি ২০২৬ করা হয়। অবশেষে ওই দিন থেকে আংশিকভাবে এনইআইআর কার্যকর হয়। কিন্তু এই বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করেই মোবাইল বিজনেস কমিউনিটি বাংলাদেশ (এমবিসিবি) নামের একটি সংগঠন রাস্তায় নামে। তারা বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন কার্যালয়ে হামলা চালায়,ভাঙচুর করে, সরকারি স্থাপনায় আক্রমণ করে। এতে ফৌজদারি মামলায় অন্তত ৪৫ জন গ্রেফতার হয় এবং অজ্ঞাতনামা আসামি হয় আরো কয়েকশ মানুষ। তবুও তাদের অপতৎপরতা থেমে নেই। একেই বলে—“চোরের মায়ের বড় গলা”।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এনইআইআর চালুর উদ্যোগ নেয়ার কারণেই অন্তর্বর্তী সরকারের ডাক ও টেলিযোগাযোগ খাতসংশ্লিষ্ট প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী তৈয়ব আহমেদকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে নতুন সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের আগেই তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।

এই ঘটনাটি একটি ভয়ঙ্কর বাস্তবতা আমাদের সামনে আনে। মোবাইল চোরাকারবারি সিন্ডিকেট কেবল অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী নয়; তারা এতটাই প্রভাবশালী যে রাষ্ট্রের একজন দায়িত্বশীল নীতিনির্ধারকও নিজেকে নিরাপদ মনে করেননি।

তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে—এই দেশে জনস্বার্থ ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করাই কি অপরাধ? যে ব্যক্তি অবৈধ বাণিজ্য বন্ধ করতে চেয়েছিলেন, তাকেই যদি দেশ ছাড়তে হয়,তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়? তৈয়ব আহমেদের ঘটনাই প্রমাণ করে, এই সিন্ডিকেট কতটা ভয়ঙ্কর এবং কতটা গভীরে তাদের প্রভাব বিস্তৃত।

সবচেয়ে বেদনাদায়ক বাস্তবতা হলো—রাজনৈতিক দলগুলো মুখে জনগণের কথা বললেও বাস্তবে অনেক সময় জনস্বার্থকেই বিসর্জন দেয়। এনইআইআর তারই একটি নির্মম উদাহরণ। জনগণের নিরাপত্তা,রাষ্ট্রের সার্বভৌম স্বার্থ, অর্থনৈতিক সুরক্ষা—এসবের চেয়ে যদি ব্যক্তি স্বার্থ, সিন্ডিকেটের চাপ এবং অবৈধ অর্থের প্রভাব বড় হয়ে ওঠে, তাহলে সেটি শুধু রাজনৈতিক ব্যর্থতা নয়; সেটি জাতীয় নৈতিকতারও পরাজয়।

সবচেয়ে বড় কথা হলো হল, যদি একটি অবৈধ চোরাকারবারি চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কারণে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান আক্রান্ত হয়, তাহলে সেই রাষ্ট্রের আইন, সংবিধান, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আসলে কার জন্য? জনগণের নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য, নাকি চোরাকারবারিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য?

কারণ একটি কার্যকর রাষ্ট্রে কখনোই অবৈধ গোষ্ঠী রাষ্ট্রকে ভয় দেখিয়ে নীতি পরিবর্তনে বাধ্য করতে পারে না। যদি সরকার শেষ পর্যন্ত একটি চোরাই সিন্ডিকেটের কাছেই নতি স্বীকার করে, তাহলে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক—এই রাষ্ট্রব্যবস্থা দিয়ে জনগণের ভাগ্যের কী পরিবর্তন ঘটবে?

এখন প্রশ্ন হচ্ছে,তাহলে জনগণের বিপুল পরিমাণ করের টাকা ব্যয় করে এনইআইআর সিস্টেম কেনা হলো কেন? এটি কি সত্যিই জাতীয় নিরাপত্তা,জনস্বার্থ ও রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য কেনা হয়েছিল? নাকি এটি কেবল অবৈধ মোবাইল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দরকষাকষির এক রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের জন্য?

কারণ একটি রাষ্ট্র যদি কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে একটি নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ক্রয় করে, কিন্তু সেটিকে কার্যকর না করে বছরের পর বছর অকার্যকর ফেলে রাখে,তাহলে সেখানে স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ তৈরি হবে। জনগণ প্রশ্ন করবেই—কার স্বার্থে এই নীরবতা? কার স্বার্থে এই ধীরগতি?

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই চোরাকারবার এখন আর শুধু মোবাইল বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি ধীরে ধীরে হুন্ডি, অর্থপাচার এবং জঙ্গিবাদ ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধ অর্থনীতির অংশে পরিণত হয়েছে। প্রবাসীদের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার হচ্ছে, আর সেই অর্থ ব্যবহার করে দেশে ঢুকছে চোরাই মোবাইল, কর ফাঁকি দেয়া পণ্য এবং অন্যান্য অবৈধ মালামাল।

অর্থাৎ ক্ষতিটা দ্বিমুখী। একদিকে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও চাপে পড়ছে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্র কি এসব জানে না? অবশ্যই জানে।

তাহলে ব্যবস্থা নিচ্ছে না কেন?

এখানেই জনমনে সবচেয়ে বড় সন্দেহ তৈরি হয়েছে। কারণ এই অবৈধ বাণিজ্যের পেছনে এমন কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে, যাদেরকে সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে দেশপ্রেমিক ও সৎ ব্যক্তি হিসেবেই জেনে এসেছে। কিন্তু বাস্তবতার নির্মম দিক হলো—যখন ব্যক্তিগত স্বার্থ রাষ্ট্রের স্বার্থকে ছাপিয়ে যায়, তখন জাতীয় নিরাপত্তা,অর্থনীতি এবং জনগণের অধিকার একটি অদৃশ্য সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের অন্যতম বড় দুর্ভাগ্য এখানেই—আমরা কথায় দেশপ্রেম দেখেছি,কিন্তু কাজে তার উল্টো চিত্র দেখেছি। জনসমক্ষে দেশপ্রেমের ভাষণ, আর নেপথ্যে রাষ্ট্রবিরোধী অর্থনৈতিক সিন্ডিকেটের সঙ্গে সমঝোতা—এ ধরনের দ্বিচারিতা কোনো রাষ্ট্রের জন্য শুভ হতে পারে না।

এই বাস্তবতার মধ্যেই নতুন সরকারের ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। জনগণের প্রত্যাশা ছিল—নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় অন্তত জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে কঠোর সিদ্ধান্ত আসবে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত অবৈধ ফোন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করছে, কালোবাজার সচল রয়েছে এবং রাষ্ট্র রাজস্ব হারাচ্ছে।

একজন সাংবাদিক ও কলামিস্ট হিসেবে আমি নিজেও বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর সাথে কথা বলেছি। আমি তাকে স্পষ্টভাবে বলেছি—এনইআইআর কোনো সাধারণ প্রশাসনিক প্রকল্প নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা, জননিরাপত্তা, ভোক্তা অধিকার এবং অর্থনৈতিক সুরক্ষার সঙ্গে সরাসরি জড়িত একটি রাষ্ট্রিক প্রয়োজন।

আমি আরো মনে করেছি, বিষয়টি নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সঙ্গে কথা বলা জরুরি। সে কারণেই বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছি। একাধিকবার ফোন করেছি, বার্তা পাঠিয়েছি, এমনকি জাতীয় অগ্রাধিকারের ইস্যু উল্লেখ করে সাক্ষাতের অনুরোধও জানিয়েছি। কিন্তু কোনো সাড়া পাইনি। পরে একান্ত সচিবের মাধ্যমে সময় চাওয়া হলে প্রথমে একটি সময় দেয়া হলেও পরে ব্যস্ততার কথা বলে সেটি বাতিল করা হয়।

এখানেই প্রশ্ন ওঠে—যদি এমন একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে কথা বলার জন্য নীতিনির্ধারকদের হাতে সময় না থাকে,তাহলে তাদের ব্যস্ততা আসলে কোন বিষয় নিয়ে?

কারণ এনইআইআর এখন আর শুধু টেলিযোগাযোগ খাতের প্রযুক্তিগত বিতর্ক নয়;এটি পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।

আরো উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দেশের মোবাইল শিল্পসংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোও আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারের অর্থমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে লিখিতভাবে জানিয়েছে যে, এনইআইআর অকার্যকর রাখার সুযোগে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা চোরাকারবারি সিন্ডিকেটের পকেটে চলে যাচ্ছে। অর্থাৎ রাষ্ট্র প্রতিদিন রাজস্ব হারাচ্ছে, প্রতি মাসে হারাচ্ছে কয়েকশো কোটি টাকা, আর বছরে সেই ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে কয়েক হাজার কোটি টাকায়।

এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি সামনে আসে। সরকার নিজেই বলছে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কঠিন, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড অর্থসঙ্কটে ব্যাহত হচ্ছে, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ রয়েছে, রাজস্ব ঘাটতি বাড়ছে। তাহলে চোখের সামনে যদি হাজার হাজার কোটি টাকা অবৈধ পথে চলে যায়, সরকার কেন সেটি বন্ধ করছে না?

সব তথ্য-প্রমাণ সরকারের হাতে রয়েছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন জানে, এনবিআর জানে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় জানে—কীভাবে অবৈধ মোবাইল বাজার চলছে,কীভাবে হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাচার হচ্ছে, কীভাবে কর ফাঁকি দিয়ে পুরনো ও চোরাই মোবাইল দেশে ঢুকছে। তাহলে এই নীরবতার কারণ কী?

সরকারের ভেতরে কি এমন কোনো শক্তিশালী অংশ রয়েছে,যারা এখনও পুরনো ব্যবস্থার মতোই কোনো অদৃশ্য সমঝোতায় আবদ্ধ? রাষ্ট্রের রাজস্ব যেখানে কোষাগারে যাওয়ার কথা, সেখানে সেই অর্থ কি কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠীর পকেটে চলে যাচ্ছে?

এদিকে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের সাম্প্রতিক অবস্থানও নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সংস্থাটির কাছে আমি জানতে চেয়েছিলাম যে, জানুয়ারি থেকে এনইআইআর চালু করার পর কি পরিমান অবৈধ মোবাইল বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে?

জবাবে সংস্থাটি জানিয়েছে—বাংলাদেশের মোবাইল নেটওয়ার্কে প্রবেশ করা সব হ্যান্ডসেট এনইআইআরের আওতায় আনা হয়েছে এবং নির্ধারিত সময়ে সেগুলোকে “রেজিস্টার্ড” ও “আনরেজিস্টার্ড” এই দুই ভাগে ভাগ করা যাবে।

কিন্তু এখানেই মূল প্রশ্নটি সামনে আসে—যেখানে এনইআইআরের প্রধান উদ্দেশ্যই হচ্ছে বৈধ ও অবৈধ মোবাইল শনাক্ত করা এবং অবৈধ ডিভাইসকে নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করা,সেখানে এই দায়সারা বক্তব্য কতটা গ্রহণযোগ্য?

কারণ জনগণ জানতে চায়—এখন পর্যন্ত কত অবৈধ মোবাইল শনাক্ত হয়েছে? কতগুলো চোরাই বা অনিবন্ধিত সেট এখনও নেটওয়ার্ক ব্যবহার করছে? এই অবৈধ বাণিজ্যের কারণে রাষ্ট্র কত রাজস্ব হারাচ্ছে? অথচ এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর কোনো সুস্পষ্ট উত্তর জনগণ পাচ্ছে না।

সবচেয়ে বড় কথা হলো,যদি সত্যিই বিটিআরসির আন্তরিক সদিচ্ছা থাকত, তাহলে তাদেরই জনস্বার্থ ও জাতীয় স্বার্থের কথা বিবেচনা করে ব্যাপকভাবে তথ্য প্রকাশ করার কথা ছিল। তাদের উচিত ছিল গণমাধ্যমে জনসচেতনতামূলক প্রচারণা এবং পরিসংখ্যানের মাধ্যমে জনগণকে বোঝানো—কীভাবে অবৈধ মোবাইল বাজার রাষ্ট্রকে হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতির মুখে ফেলছে এবং সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করছে। কেমন করে জাতীয় নিরাপত্তা ও জনস্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

কিন্তু দুঃখজনকভাবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র। স্বচ্ছতার পথে না হেঁটে এক ধরনের নীরবতা ও ছলচাতুরীর আশ্রয় নিয়েছে বিটিআরসি।

ফলে জনমনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—এই রহস্যের পেছনে কারণ কী?

অভিযোগ রয়েছে, বিটিআরসি, এনবিআর এবং সংশ্লিষ্ট কিছু প্রশাসনিক ও নিয়ন্ত্রক মহলের একটি অংশ এনইআইআর পুরোপুরি কার্যকর হোক তা চায় না। কারণ এটি কার্যকর হলে অবৈধ আয়ের বহু পথ বন্ধ হয়ে যাবে।

এখানে আমি সরাসরি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে একটি বিষয় স্মরণ করিয়ে দিতে চাই—এনইআইআর ইস্যুটি কেবল মোবাইল ফোন বা টেলিযোগাযোগ খাতের কোনো সীমাবদ্ধ বিষয় নয়; এটি পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার বাস্তব চিত্র বোঝার একটি আয়না।

এই একটি বিষয় দিয়েই বোঝা সম্ভব, আপনার চারপাশে কারা অবস্থান করছে, কারা আপনাকে সঠিক তথ্য দিচ্ছে আর কারা তথ্য গোপন করছে।

একটি রাষ্ট্র সফলভাবে পরিচালনার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো—নির্ভুল ও সত্য তথ্য। কারণ ভুল তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে কখনো সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব নয়। তাই প্রশ্ন হচ্ছে, আপনার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কি সত্যিই আপনাকে বাস্তব পরিস্থিতি জানাচ্ছেন?

তারা কি আপনাকে বলছেন, কীভাবে প্রতিদিন শত শত কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার তথা রাষ্ট্র? কীভাবে অবৈধ মোবাইল বাণিজ্য, হুন্ডি ও কর ফাঁকির মাধ্যমে একটি সিন্ডিকেট বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে? নাকি তারা ব্যক্তি স্বার্থে তথ্য গোপন করছে এবং আপনাকে ভুল পথে পরিচালিত করছে?

আমি মনে করি, আপনার সামনে আজ একটি ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে। জনগণ বিশ্বাস করে, আপনি জনস্বার্থবিরোধী যেকোনো সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেবেন এবং দেশ, জনগণ ও জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবেন।

সুতরাং আপনার চারপাশে যে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—তাদের দ্রুত চিহ্নিত করা জরুরি। কারণ এই সিন্ডিকেট শুধু রাষ্ট্রের ক্ষতি করছে না;তারা ধীরে ধীরে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করছে, জনগণের আস্থা নষ্ট করছে। পাশাপাশি সরকারকে আন্তর্জাতিকভাবেও প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিতে পারে বলে আমি আশঙ্কা করছি।

বিশেষ করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। যদি কোথাও দায়িত্বে অবহেলা, তথ্য গোপন,দুর্নীতি বা অবৈধ সিন্ডিকেটকে প্রশ্রয় দেয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়,তাহলে তাদের আইনের আওতায় আনতেই হবে।

কারণ রাষ্ট্র পরিচালনায় সবচেয়ে বড় বাধা বিরোধী শক্তি নয়; বরং ভেতরে লুকিয়ে থাকা সুবিধাবাদী চক্র। যারা দুর্দিনে আপনার পাশে না দাঁড়িয়ে আপনার বিরুদ্ধেই সাক্ষ্য দেবে। সুতরাং আপনি জনগণের শক্তিতে এগিয়ে চলুন। জাতীয় নিরাপত্তা ও জনস্বার্থবিরোধী মোবাইল চোরাকারবারি চক্রকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিন। আপনার সরকার ও প্রিয় বাংলাদেশকে নিরাপদ রাখুন।

লেখক: সাংবাদিক কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

[email protected]