হাদি ‘মরে গিয়ে’ ঘুমন্ত জাতিকে জাগিয়ে গেছেন

বিপ্লবী হাদি বলতেন সাবলীল ভাষায়। তার অহঙ্কার ছিল না। সহজ-সরল সোজাসাপটা মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার কথাগুলো মানুষের হৃদয় নাড়িয়ে দেয়ার মতো। বিপ্লবীরা কখনো মরে না, তারা জীবিত থাকে মানুষের অন্তরে। বাংলাদেশে লাখ লাখ এমপি পাওয়া যাবে; কিন্তু হাদি একজনই। তিনি টাকার কাছে বিক্রি হননি। তার চিন্তা কেবল দেশ এবং দেশের মানুষের জন্য। হাদি ‘মরে গিয়ে’ ঘুমন্ত জাতিকে জাগিয়ে দিয়ে গেছেন।

শহীদ শরিফ ওসমান হাদি
শহীদ শরিফ ওসমান হাদি |ফাইল ছবি

২০ ডিসেম্বর শনিবার, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে জানাজায় গিয়ে হতবাক হয়ে গেলাম, মানুষের বাঁধভাঙা স্রোত দেখে। আমার ৭৬ বছর বয়সে কোনো জানাজায় এত মানুষ সমাগম হতে দেখিনি।

দেশে ও বিদেশে তার একাধিক জানাজায় জনসমাগম হওয়ার দু’টি মৌলিক কারণ হলো– তিনি দেশ ও জাতির কথা হৃদয় দিয়ে ভাবতেন, যাকে বলে অকৃত্রিম ভালোবাসা। খুব কম বয়সে তার ভেতরে জাতিসত্তার যে চেতনার বীজ অঙ্কুুর হতে আমরা দেখেছি, সেটি বিস্ময়কর। তিনি আল্লাহর কাছে শহীদি মৃত্যুর প্রত্যাশা করেছিলের। আর সেটিই হয়েছে। বান্দার সাথে আল্লাহর এই সংযোগ নিয়তের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। বিপ্লবী হাদি ছিলেন তার জ্বলন্ত প্রমাণ।

দেখুন তার মৃত্যুটা– ১২ ডিসেম্বর শুক্রবার দুপুরে ঢাকার পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে তিনি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এর পরের শুক্রবার ১৯ ডিসেম্বর শাহাদতবরণ করেছেন। হাদি যে আল্লাহর প্রিয় বান্দা ছিলেন সেটি পরিষ্কার হয়ে যায় তার দাফনের স্থানের দিকে তাকালে। বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদ সংলগ্ন জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের পাশেই তাকে সমাধিস্থ করা হয়। কত বড় মাপের মানুষ হলে এরকম একটি দামি জায়গায় নিজের শেষ ঠিকানা খুঁজে পান। সে হিসেবে তিনি একজন ক্ষণজন্মা অসাধারণ মানুষ ছিলেন। তার নামে ইতোমধ্যে কয়েক শতাধিক বই-পুস্তক, অডিও-ভিডিও প্রকাশ হয়েছে। মাত্র ৩২ বছর হায়াত পেয়েছেন তিনি। এই অল্প বয়সে অত্যন্ত ভাগ্যবান বলেই কোটি মানুষের কান্নামিশ্রিত দোয়াও পেয়েছেন শরিফ ওসমান হাদি।

হাদির মৃত্যুতে কেবল বাংলাদেশে নয় শোক ছড়িয়ে গেছে সারা বিশ্বে। তার পরিবারের কাছে শোকবার্তা পাঠিয়েছে পশ্চিমা জগৎ। সুষ্ঠু বিচার ও তদন্ত করার জন্য সরকারের কাছে বার্তা পাঠিয়েছেন জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব। বিশ্ব মানবাধিকার সংগঠনগুলো হাদির খুনের বিচার চেয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, এখনো বিচারের অগ্রগতি তেমন হয়নি। বিপ্লবের পর গঠন করা সরকার পিলখানা থেকে শাপলা চত্বর এবং জুলাই বিপ্লবে শত শত মানুষের গণহত্যার বিচার করতে পারেনি। বিচার কখনো হবে কি না, সেটি নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়।

শহীদ শরিফ ওসমান হাদি একটি বার্তা দিয়েছিলেন, ‘জীবন দেবো, জুলাই দেবো না’। ওসমান হাদি কোনো দলের ছিলেন না। তিনি ছিলেন এই দেশের ১৮ কোটি মানুষের প্রতিবাদী কণ্ঠ ও প্রাণ। হাদির স্বপ্ন ছিল একটি ইনসাফের রাষ্ট্র কায়েম হোক। তিনি মানুষকে শেষ বার্তা দিয়ে গেছেন এই বলে– অসমাপ্ত বিপ্লবকে আপনারা সম্পূর্ণ করেন। ইনসাফের বাংলাদেশ গঠন না হওয়া পর্যন্ত আপনারা শান্ত হবেন না। হাদি তার পূর্বসূরিদের আত্মত্যাগের ব্যাপারে বলেছেন– বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ যেন ‘শহীদ আবরার ফাহাদ’ নামে হয়। তার একটিই কথা, ভারতীয় দালালদের নামে যেন কোনো স্মৃতিফলক বাংলাদেশের জমিনে না থাকে। জুলাই সনদকে উপেক্ষা করে যদি নির্বাচন হয়, আর সেই নির্বাচনে যারা ক্ষমতায় আসবে, সেটি হবে ‘বাকশালী সরকার’। সেটি বুঝতে পিএইচডি করা লাগে না।

এক নেতা তাকে উপদেশ দিয়ে বলেছিলেন– তুমি ঢাকা- ৮ আসনে কেন দাঁড়িয়েছ। তুমি জাতীয় নির্বাচনের উপযুক্ত নও, আগে কাউন্সিলর হওয়ার চেষ্টা করো। এর জবাবে হাদি বলেছিলেন– আমি এই এলাকার ভোটার। তাই সংসদ সদস্য হিসেবে উপযুক্ততা যাচাই করা আমার নাগরিক অধিকার। আমি সংসদ সদস্য নয়, জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব হওয়ার স্বপ্ন দেখি। স্বপ্ন দেখা কি অপরাধ?

বিপ্লবী হাদি বলতেন সাবলীল ভাষায়। তার অহঙ্কার ছিল না। সহজ-সরল সোজাসাপটা মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার কথাগুলো মানুষের হৃদয় নাড়িয়ে দেয়ার মতো। বিপ্লবীরা কখনো মরে না, তারা জীবিত থাকে মানুষের অন্তরে। বাংলাদেশে লাখ লাখ এমপি পাওয়া যাবে; কিন্তু হাদি একজনই। তিনি টাকার কাছে বিক্রি হননি। তার চিন্তা কেবল দেশ এবং দেশের মানুষের জন্য। হাদি ‘মরে গিয়ে’ ঘুমন্ত জাতিকে জাগিয়ে দিয়ে গেছেন।

লেখক : গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

[email protected]