সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

‘ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের শূন্যতা দীর্ঘ দিন আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাহিত্যিক পরিসরে অনুভূত হবে। তিনি ছিলেন আলো–নীরব, গভীর ও স্থায়ী।’

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম |নয়া দিগন্ত

ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম আমাদের মাঝ থেকে চলে গেছেন তিন মাস আগে। নিভৃতচারী, প্রজ্ঞাবান ও গভীরভাবে মানবিক মানুষটি কেবল একজন অধ্যাপক বা সাহিত্যিক ছিলেন না; ছিলেন একটি সময়ের বুদ্ধিবৃত্তিক মানচিত্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের দীর্ঘ দিনের শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ২০১৮ সালে অবসর গ্রহণ করেন। এরপর ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশে (ইউল্যাব) ইংরেজি ও মানবিক বিভাগে শিক্ষকতা চালিয়ে যান। ২০২৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ‘ইমেরিটাস অধ্যাপক’ উপাধিতে ভূষিত করে– যা তার দীর্ঘ অ্যাকাডেমিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবদানের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি।

ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের নাম প্রথম শুনি আমার চাচাতো ভাই, মরহুম মুক্তিযোদ্ধা জতির উদ্দিন হিরুর মুখে। হিরু ভাই গর্বের সাথে বলতেন, তাদের ব্যাচের ফার্স্টবয় ছিলেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ১৯৬৬ সালের ব্যাচের প্রথম স্থান অধিকারী ছাত্র। এখান থেকে তিনি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে কানাডার কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। তার গবেষণার বিষয় ছিল– ইংরেজ কবি ডব্লিউ বি ইয়েটসের কবিতায় দার্শনিক ইমানুয়েল সুইডেনবর্গের দর্শনের প্রভাব, যা তার গভীর পাঠ, দার্শনিক অনুধ্যান ও আন্তঃসাংস্কৃতিক বিশ্লেষণী সক্ষমতার পরিচয় দেয়।

তার পারিবারিক পরিমণ্ডলও ছিল শিক্ষিত ও সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ। ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের বাবা সৈয়দ আমিরুল ইসলাম ছিলেন সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলীর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। একই সময়ে শিক্ষা বিভাগে কর্মরত ছিলেন আরো কয়েকজন বিশিষ্ট মানুষ– প্রফেসর সৈয়দ আলী আহসানের বাবা, সাবেক বাণিজ্য সচিব ও কলামিস্ট মোফাজ্জল করিমের বাবা, সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইদুজ্জামানের বাবা এবং আমার বাবা মরহুম শামসুল করীম। এ পটভূমি থেকে সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের মধ্যে তৈরি হয় এক গভীর মানবিক ও উদার বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনা।

আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে এসেছিলাম। সে সময়ের একটি স্মৃতি আজও মনে দাগ কেটে আছে। ভর্তি পরীক্ষার পর ক্লাসে ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘একজন ছাত্র সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহর লালসালু উপন্যাসের ওপর লিখে প্রথম স্থান অধিকার করেছে।’ সৌভাগ্যক্রমে, সেই ছাত্রটি আমি নিজে। লালসালু উপন্যাসের পটভূমি ফেনীর সোনাগাজী অঞ্চল– একটি সমুদ্রতীরবর্তী জনপদ। ধার্মিকতার নামে অধার্মিকতা, নিয়তি-নির্ভরতা ও ক্ষমতার রাজনীতির যে সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ সেখানে রয়েছে, তা আমাকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছিল। একজন শিক্ষক হিসেবে সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের সবচেয়ে বড় গুণ ছিল– তিনি ছাত্রের চিন্তাকে গুরুত্ব দিতেন, উৎসাহ দিতেন এবং প্রশ্ন করতে শেখাতেন।

তার শৈশব কেটেছে কুমিল্লায়। তার মা রাবেয়া খাতুন ছিলেন কুমিল্লার একটি গার্লস স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা। নানা স্মৃতিচারণায় দেখা যায়– বাবার তুলনায় মায়ের প্রভাব ও স্মৃতি তার জীবনে বেশি গভীর ছিল। শৃঙ্খলা, মানবিকতা ও শিক্ষার প্রতি দায়বদ্ধতা– এ গুণগুলো তিনি মায়ের কাছ থেকে পেয়েছিলেন বলে মনে হয়।

শিক্ষকতার পাশাপাশি ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ছিলেন একজন বহুমাত্রিক সাহিত্যিক। তিনি গল্পকার, ঔপন্যাসিক, প্রবন্ধকার, সাহিত্য সমালোচক ও নিয়মিত কলাম লেখক হিসেবে পরিচিতি পান। মাইকেল মধুসূদন দত্ত, কাজী নজরুল ইসলাম, শামসুর রাহমান, ফররুখ আহমদের সাহিত্য নিয়ে তার বিশ্লেষণ ছিল স্বতন্ত্র ও কখনো কখনো বিতর্কিত। বিশেষ করে ফররুখ আহমদ সম্পর্কে তার মন্তব্য– ইসলামী আদর্শের চেয়ে কবির লেখনীর ধরন ও ঐতিহ্য অনুসন্ধানকে তিনি বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন–এটি বহু পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তার মতে, ঐতিহ্যপ্রিয়তার সন্ধানে গিয়ে ফররুখ কখনো কখনো নিজস্ব সৃজনশীলতা হারিয়ে ফেলেছিলেন– এ বিশ্লেষণ অনেকের কাছে সাহসী ও চিন্তাপ্রবণ।

বাংলা সাহিত্যে ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলামকে অনেকে আধুনিক-পরবর্তী বা পোস্টমডার্ন ধারার পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচনা করেন। তার লেখায় বাস্তবতা, স্মৃতি, ইতিহাস ও ব্যক্তিমানুষের সঙ্কট এক অনন্য ভঙ্গিতে উঠে এসেছে। এই সাহিত্যকীর্তির স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৬ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পান তিনি। এ ছাড়া ২০১৮ সালে ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে একুশে পদক লাভ করেন।

সাংগঠনিকভাবেও তিনি ছিলেন সক্রিয়। লেখকদের আন্তর্জাতিক সংগঠন পিইএনের বাংলাদেশ সেন্টারের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি), বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, বাংলা একাডেমির নির্বাহী পরিষদ, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)– এসব প্রতিষ্ঠানের সাথেও যুক্ত ছিলেন।

একটি ছোট ঘটনা তার ভাষা ও সংস্কৃতি-চেতনার গভীরতা প্রকাশ করে। তার একমাত্র ছেলের বিয়ের কার্ড তিনি ছাপিয়েছিলেন বাংলায়। কেউ একজন প্রশ্ন করেছিলেন– ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষক হয়েও ইংরেজিতে কার্ড ছাপাননি কেন? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘এখানে কোনো বিদেশী নেই। আমি বিদেশী ভাষায় কেন লিখব?’ এই উত্তরে ফুটে ওঠে তার সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাস।

অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ ঘোষণার সময় অনেকে আশা করেছিলেন, তার নাম থাকবে; কিন্তু তা হয়নি। হয়তো তার বামপন্থী ও স্বাধীন চিন্তাচেতনার কারণে তিনি উপেক্ষিত হয়েছেন। তিনি ফররুখ আহমদ নিয়ে লিখলেও ইসলামপন্থী ছিলেন না; ছিলেন যুক্তিবাদী ও মানবিক। দৈনিক প্রথম আলোতে নিয়মিত কলাম লিখে তিনি রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি নিয়ে গভীর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন।

সর্বশেষ তাকে দেখেছিলাম বারডেম হাসপাতালের সামনে, সম্ভবত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়ার্টারের দিকে যাচ্ছিলেন। শরীরে ক্লান্তির ছাপ, পোশাকে চিরচেনা সাধারণত্ব। এই সাধারণত্ব ছিল তার প্রকৃত পরিচয়। বয়স খুব বেশি হয়নি; আল্লাহর ইচ্ছাতে তিনি বিদায় নিয়েছেন। এ নিয়ে বলার কিছু নেই– শুধু এটুকু বলা যায়, ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের শূন্যতা দীর্ঘ দিন আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাহিত্যিক পরিসরে অনুভূত হবে। তিনি ছিলেন আলো–নীরব, গভীর ও স্থায়ী।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক