গ্রাফিতি ভালো থাকলে বিপ্লবও থাকবে অমলিন

গ্রাফিতি নোঙরা হওয়ার মানে আমার স্বাধীন আকাশকে কালিমা লিপ্ত করা। গ্রাফিতিরা ভালো থাকলে আমরাও থাকব ভালো।

বাংলাদেশে জুলাই বিপ্লবের পথ ধরে দেড় দশকের বেশি সময়ব্যাপী ফ্যাসিস্ট অবরুদ্ধ দেশ স্বাদহীনতা থেকে স্বাধীনতার আস্বাদন লাভ করে। শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন ছাত্র-জনতার এ বিপ্লব গোলামির শিকল চিরকালের জন্য চুরমার করে দেয়নি কেবল বরং নতুন নতুন সুসজ্জিত শব্দ এবং কর্ম তৎপরতাও উপহার দিয়েছে। পুরনো শব্দের ঘূণেধরা অর্থ ভেঙে নতুন অর্থের নব্য পোশাকের আভরণ দিয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ‘রাজাকার।’ অন্য দিকে নতুন কালের জোয়ার হয়ে এসেছে গ্রাফিতি।

৩৬ জুলাইয়ের মুক্তির আগে গ্রাফিতি শব্দটি হাতেগোনা মানুষের শব্দভাণ্ডারের সম্পদ ছিল। তার বদলে বরং ‘চিকামারা’ ‘দেয়াল লিখন’ সাধারণের উচ্চারণে শোনা যেত। কিন্তু সেই চিকামারা মোটেও বর্ণিল হয়ে উঠত না। সাদা দেয়ালে কালাকালি বা সাদা চুন দিয়ে লেখা হতো। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের পরে ভারতীয় আধিপত্যের অন্যতম প্রতীক ছিলেন ডিপি ধর।

বিজয়নগর একটি নদর্মার ওপর দেয়ালে চিকামারা হয়েছিল, ডিপিধরকে চেপে ধর/ঢাকায় আসা বন্ধ কর। ঢাকাসহ অনেক জায়গায় চিকা দেখেছি, এক ইন্দিরার দুই নাগর/কোসিগিন ও মুজিবর। কিংবা ‘মুজিববাদের অমর বাণী/একসের দুধে তিন সের পানি!’ নকশাল ভাবধারায় উজ্জীবিত বাম ঘরানার সে কালের আরেক চিকা ‘ইতিহাসের চারটি নাম/কম্বোডিয়া, নকশালবাড়ি, গণচীন, ভিয়েতনাম।’ আজকের দিনে এ চিকা দেখলে ‘ঘোড়াও ভি হাসবো!’

প্রেসিডেন্ট সাত্তারের বিরুদ্ধে সাহারা খাতুন নামে এক নারী কুলা মার্কা নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। খ্যাত-অখ্যাত মিলিয়ে তখন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন ৫২ জন প্রার্থী। তারা সবাই ছিলেন পুরুষ। মগবাজার-তেজগাঁও রাস্তার মগবাজার রেলগেটের কাছে একটি বড় চিকা দেখেছিলাম ‘বায়ান্নর বলদের একটি গাই/কুলা মার্কায় ভোট চাই!’

বিডিআর হত্যাকাণ্ডের সময় সাহারা খাতুন নামে যে নারী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন তিনি আর ‘কুলা’র ওই নারী একই ব্যক্তি কি না বলতে পারব না।

এমনকি ফ্যাসিস্ট শাসনামলের সুবোধকে নিয়ে সাড়া জাগানো নানা কথা লেখা হলেও তখনো ‘গ্রাফিতি’ শব্দের জোয়ার আসেনি।

অবশ্য, এ কথা ঠিক গ্রাফিতির ইতিহাস প্রাচীন যুগ থেকেই শুরু। রোম, গ্রিস ও মিসরের মানুষ মন্দির, প্রাচীর ও জনসমক্ষে বিভিন্ন স্থানে বার্তা, নাম, ছবি এবং রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত মন্তব্য লিখে রাখত। এই প্রাচীন গ্রাফিতি ছিল প্রেম, রাজনৈতিক মতামত, সামাজিক প্রতিবাদ বা শুধু ব্যক্তিগত চিন্তার প্রকাশ।

পম্পেই শহরের দেয়ালের কথাই ধরুন। আগ্নেয়লাভায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া এ জনপদে প্রচুর গ্রাফিতি পাওয়া গেছে। তপ্ত লাভায় চাপা পড়ার আগে এসব লেখা হয়েছিল। সেখানে কিছু ছিল প্রেমের কবিতা, কিছু ছিল রাজনৈতিক বার্তা, আবার কিছু ছিল কৌতুক বা গালি। গ্রাফিতি মানে যেন সাধারণ মানুষের এক প্রকাশভঙ্গি। এর মধ্য দিয়ে তাদের অনুভূতি প্রকাশিত হতো। মতামতের জানান দেয়া হতো।

মধ্যযুগে ইউরোপীয় তীর্থযাত্রীরা এবং পর্যটকরা গির্জা ও পবিত্র স্থানে নিজেদের নাম, তারিখ বা ধর্মীয় প্রতীক খোদাই করে রাখত। এটি ছিল সেই জায়গায় তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার উপায় এবং এক ধরনের আধ্যাত্মিক পরিচয়। এই খোদাই করা বার্তাগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রতিক্রিয়া ছিল।

আধুনিক যুগের শুরুর দিকে, বিশেষ করে লন্ডনে, শহরের দেয়ালগুলোতে গ্রাফিতি দেখা যায়। এখানে সাধারণ মানুষ প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা রাজনৈতিক অসন্তোষের কথা প্রকাশ করত।

নিউইয়র্কে সত্তর-আশির দশকে আধুনিক গ্রাফিতির উত্থান ঘটে। আধুনিক গ্রাফিতির আন্দোলন নিউইয়র্ক শহরে ষাটের দশকের শেষ দিকে শুরু হয়। পুরোপুরি বিকশিত হয় সত্তর ও আশির দশকে। এটি মূলত একটি নগর আন্দোলন হিসেবে উঠে আসে, যা আফ্রিকান-আমেরিকান ও লাতিনো তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়। তারা ট্রেন, দেয়াল এবং অন্যান্য জনসমক্ষে তাদের নাম বা ছদ্মনাম (ট্যাগ) লিখে শহরজুড়ে ছড়িয়ে দিতে থাকে।

Taki 183 নামে এক কিশোর এই আন্দোলনের প্রথম পরিচিত মুখ। সে নিজের নাম সারা শহরজুড়ে লিখে ফেলেছিল। তার এই কাজটি অন্যদের অনুপ্রাণিত করে এবং গ্রাফিতি হয়ে ওঠে এক সাংস্কৃতিক আন্দোলন।

সত্তরের শেষ দিকে, গ্রাফিতি আরো শিল্পকর্মে রূপান্তরিত হতে শুরু করে এবং শিল্পীরা জিন-মিকেল বসকিয়াট ও কিথ হ্যারিংয়ের মতো ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে এই আন্দোলন গ্যালারিতে স্থান পায়। এটি হয়ে ওঠে হিপ-হপ সংস্কৃতির চারটি মূল উপাদানগুলোর একটি-ডিজে, এমসি (র‌্যাপ), ব্রেকড্যান্সিং এবং গ্রাফিতি।

যদিও এটি প্রায়ই বেআইনি কাজ হিসেবে গণ্য হয়, গ্রাফিতি ছিল নগরজীবনের এক প্রতিবাদ, পরিচয়, পাশাপাশি সৃজনশীলতার প্রকাশ।

ল্যাটিন আমেরিকায় গ্রাফিতির কথা বলতেই হবে। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, কলম্বিয়া, চিলি এবং মেক্সিকোতে গ্রাফিতি একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিবাদ এবং সামাজিক চেতনা রূপ পায়।

ব্রাজিলের সাওপাওলো শহরে, পিকসাসাও নামে একটি বিশেষ ধরনের গ্রাফিতি তৈরি হয়। এই গ্রাফিতিতে তরুণরা উল্লম্ব বা খাড়াখাড়িভাবে এবং তীক্ষè অক্ষরে লেখালেখি করত। এটি ছিল দারিদ্র্য, বৈষম্য এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে শাণিত এক প্রতিবাদ।

চিলি ও আর্জেন্টিনায়, দীর্ঘ স্বৈরশাসনের পর গ্রাফিতি জনগণের মৃতদের স্মরণ, মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিবাদ এবং গণতন্ত্রের প্রচারে ব্যবহৃত হতে থাকে।

মেক্সিকোতে গ্রাফিতি সমাজের নানা সমস্যা, যেমন- দারিদ্র্য, সহিংসতা এবং বৈষম্য নিয়ে কথা বলে, এটি ঐতিহাসিকভাবে মেক্সিকোর আদিবাসী ও বিপ্লবী ঐতিহ্যের অংশ।

আজকাল ল্যাটিন আমেরিকার শহরগুলোর দেয়ালগুলোতে উজ্জ্বল রঙের চিত্রকর্ম রয়েছে, যা রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বার্তা দেয় এবং এর মধ্যে দেশীয়, ঔপনিবেশিক এবং আধুনিক ইতিহাস এক হয়ে উঠে এসেছে।

‘৩৬ জুলাইয়ের’ স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ হঠাৎ করে গ্রাফিতির উজ্জ্বল রঙের বিকাশ ঘটে। কচি হাতে এসব গ্রাফিতি আঁকা হলেও ভাবধারায় কাঁচা ছিল না মোটেও। ঢাকাসহ গোটা দেশের দেয়ালে এসব গ্রাফিতির বাণীকে মুক্ত প্রাণের কল্লোল বললে অত্যুক্তির দায় বহন করতে হবে না। অন্য দিকে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা যে ক্যালিগ্রাফির চর্চায়ও কম নয়। তারও প্রমাণ মেলে। আরবি বা ফার্সি বর্ণমালার জন্য তৈরি এ বিদ্যা নিখুঁতভাবে বাংলায় আত্মস্থ করা হয়। বলা যেতে পারে, চমকে দেয় পোড় খাওয়া বোদ্ধার চোখকেও।

বিপ্লব সফল হওয়ার পর আঁকা গ্রাফিতিতে ভেগে যাওয়া স্বৈরদেবী ও তার দোসরদের প্রতি ব্যাঙ্গ, বিদ্রƒপ, টিটকারির ধারালো শব্দগুলোর পাশে মানবিকতার রেশম কোমল বাণীও স্থান করে নিয়েছে। পশুক্লেশ নিবারণের জন্য গ্রাফিতি বলছে, এ নগরী নিরাপদ হোক সব প্রাণীর জন্য। পশুক্লেশ নিবারণে এককালে মোবাইল কোর্ট নামত পথে। বহুকাল সে খবর আর দেখি না বা শুনি না। কিন্তু আমাদের সন্তানদের চোখকে কেউ ফাঁকি দিতে পারেননি।

পশুর প্রতি মানবিক আচরণের দাবি যারা তুলছেন, তারা পাশবিক আচরণের শিকার ফিলিস্তিনের কথা কী করে ভুলে যাবেন! না আমাদের শিশুরা আমাদের দীক্ষাদানকারী হয়ে উঠেছে। তাদের গ্রাফিতিতে ফিলিস্তিনের নিশানও উড়ছে।

গ্রাফিতি আঁকার সে হুল্লোড়, উৎসাহ এবং আন্তরিকতা চান্দ রাতের আনন্দের কথা মনে করিয়ে দেয়। অনুদান-ফানের তোয়াক্কা করেননি, কারো ব্র্যান্ড অ্যাম্বেসেডর হওয়ার ধার ধারেননি গ্রাফিতিশিল্পীরা। রঙ-তুলি কালির অর্থকড়ি নিজেরাই জুগিয়েছেন খুদে শিল্পীরা। আঁকতে গিয়ে রোদে পুড়েছেন। ঘামে ভিজেছেন। বৃষ্টিতে ভিজেছেন। কিন্তু তারপরও প্রাণের জোয়ার আটকানো যায়নি। এ নগরীর প্রতি কোণে কোণে গ্রাফিতির দেখা মিলবে।

আজকের দিনে, বিপ্লবের সাত বা আট মাস পরে গ্রাফিতির দেখা মিলবে অনেক ক্ষেত্রে করুণ অবস্থায়। যত্ন নেই। অবজ্ঞা বিস্তর। গ্রাফিতির ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে বাড়ি ভাড়ার বা পড়াইতে চাইয়ের বিজ্ঞাপন! বিপ্লবের স্মৃতি উজ্জ্বল রাখতে হলে গ্রাফিতিগুলোকে চকচকে রাখতে হবে। এখানে মিশে আছে অনেক আবেগ। অনেক খাটুনি। অনেক আনন্দ।

গ্রাফিতি নোঙরা হওয়ার মানে আমার স্বাধীন আকাশকে কালিমা লিপ্ত করা। গ্রাফিতিরা ভালো থাকলে আমরাও থাকব ভালো।