আজিজ আকতার
প্রায় চার বছর ধরে চীনের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে আমার প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা রয়েছে। রেনমিন ইউনিভার্সিটি অব চায়না থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর বর্তমানে সাংহাই জিয়াও তং বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা ও কমিউনিকেশন বিষয়ে পিএইচডি গবেষণায় নিয়োজিত আছি। এই সময়ের অভিজ্ঞতা আমাকে চীনের শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন দিক কাছ থেকে দেখার সুযোগ করে দিয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির আলোকে কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরতে চাই।
চীনের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো গবেষণা অবকাঠামোর শক্তিশালী ভিত্তি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গ্রন্থাগার, গবেষণাগার, ডিজিটাল ডেটাবেস এবং আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রবেশাধিকার গবেষকদের জন্য অত্যন্ত সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অন্যতম সাংহাই জিয়াও তং বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য যে প্রযুক্তিগত সুবিধা ও সম্পদ রয়েছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। একজন গবেষক চাইলে এখানে নিরবচ্ছিন্নভাবে জ্ঞানচর্চা ও গবেষণাকর্মে নিজেকে নিবিষ্ট রাখতে পারেন।
চীনের শিক্ষাব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো শৃঙ্খলা ও সময়ানুবর্তিতা। শ্রেণিকক্ষে নির্ধারিত সময়ে উপস্থিতি, নিয়মিত অংশগ্রহণ, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অ্যাসাইনমেন্ট, উপস্থাপনা ও গবেষণাপত্র জমা দেওয়ার সংস্কৃতি শিক্ষার্থীদের পেশাগত দক্ষতা গঠনে কার্যকর ভূমিকা রাখে। শুরুতে এ নিয়ম-কানুন কিছুটা কঠোর মনে হলেও সময়ের সঙ্গে উপলব্ধি করেছি, কর্মজীবনে সফল হওয়ার জন্য এসব অভ্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিগতভাবেও এই পরিবেশ আমার দায়িত্ববোধ ও সময় ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বৃদ্ধি করেছে।
চীনের শ্রেণিকক্ষের পরিবেশও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শিক্ষার্থীরা সাধারণত শিক্ষককে গভীর মনোযোগ দিয়ে অনুসরণ করে এবং জ্ঞান অর্জনের প্রতি আন্তরিকতা প্রদর্শন করে। শিক্ষকের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা এখানে শিক্ষাব্যবস্থার একটি সাংস্কৃতিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। ফলে শ্রেণিকক্ষে একটি মনোযোগী, সুশৃঙ্খল ও ফলপ্রসূ শিক্ষার পরিবেশ গড়ে ওঠে। এই মূল্যবোধ শুধু একাডেমিক উৎকর্ষ নয়, শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও ব্যক্তিগত বিকাশেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
গবেষণার ক্ষেত্রে চীনা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক। বিশেষ করে পিএইচডি শিক্ষার্থীদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাপত্র প্রকাশের বাধ্যবাধকতা গবেষণার মান উন্নয়নে সহায়ক হলেও এর ফলে শিক্ষার্থীদের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি হয়। একদিকে এটি উৎকর্ষ অর্জনের প্রেরণা জোগায়, অন্যদিকে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিকেও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা সামনে নিয়ে আসে।
গত এক দশকে চীনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিকীকরণের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। চীনা সরকারের বিভিন্ন বৃত্তি কর্মসূচির মাধ্যমে বিশ্বের নানা দেশের শিক্ষার্থীরা সেখানে পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছেন। ইংরেজি মাধ্যমের কোর্স বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন এবং যৌথ গবেষণা প্রকল্পের সম্প্রসারণ শিক্ষার পরিবেশকে আরও বৈশ্বিক করে তুলেছে। এর ফলে বিদেশি শিক্ষার্থীরা বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশে নিজেদের দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গি সমৃদ্ধ করার সুযোগ পাচ্ছেন।
তবে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা তার মধ্যে অন্যতম। প্রশাসনিক কার্যক্রম, দৈনন্দিন জীবনযাপন কিংবা অনেক ক্ষেত্রে একাডেমিক যোগাযোগে চীনা ভাষার প্রাধান্য বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করে। যদিও এই বাস্তবতা নতুন ভাষা শেখার অনুপ্রেরণা জোগায় এবং দীর্ঘমেয়াদে তা ব্যক্তিগত ও পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
চীনা শিক্ষার্থীদের অধ্যবসায় ও পরিশ্রমী মনোভাবও বিশেষভাবে দৃষ্টিগোচর হয়। গভীর রাত পর্যন্ত গবেষণা, ছুটির দিনেও গ্রন্থাগারে সময় ব্যয় এবং নিরন্তর আত্মোন্নয়নের চেষ্টা তাদের একাডেমিক সংস্কৃতির অংশ। একই সঙ্গে সহপাঠীদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও জ্ঞান ভাগাভাগির প্রবণতা একটি ইতিবাচক শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করে, যা বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্যও সহায়ক।
চীনের শিক্ষাব্যবস্থা মূলত ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এক সফল সমন্বয়ের উদাহরণ। এখানে একদিকে যেমন শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের ঐতিহ্যগত মূল্যবোধ সংরক্ষিত রয়েছে, অন্যদিকে গবেষণা, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনকেন্দ্রিক আধুনিক শিক্ষার বিকাশ ঘটেছে। এই সমন্বয়ই চীনকে বৈশ্বিক উচ্চশিক্ষার অন্যতম শক্তিশালী কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য চীনের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে অনেক কিছু শেখার রয়েছে। বিশেষ করে গবেষণায় বিনিয়োগ, শিক্ষা অবকাঠামোর উন্নয়ন, শৃঙ্খলাভিত্তিক শিক্ষার পরিবেশ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে চীনের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হতে পারে।
একজন গবেষক ও শিক্ষার্থী হিসেবে চীনে অর্জিত অভিজ্ঞতা আমাকে শুধু একাডেমিকভাবে সমৃদ্ধ করেনি; বরং শৃঙ্খলা, অধ্যবসায়, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধা এবং বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি অর্জনের সুযোগ করে দিয়েছে। ভবিষ্যতের পেশাগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক পথচলায় এই অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
লেখক: পিএইচডি গবেষক, সাংবাদিকতা ও কমিউনিকেশন বিভাগ, সাংহাই জিয়াও তং বিশ্ববিদ্যালয়, চীন।



