এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দেশের কৃষি অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত হয়ে দেখা দিয়েছে। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতায় তৈরি হয়েছে ডিজেল সঙ্কট। চাহিদামতো ডিজেল না পাওয়ায় বোরো ধানক্ষেতে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। একইসাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সীমাহীন লোডশেডিংয়ের সমস্যা তো আছেই। ঠিকমতো চলছে না বিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্প। কোথাও কোথাও একটা বড় সময় বন্ধ থাকছে সেচযন্ত্র। বোরো আবাদি জমির প্রায় ৬৫ শতাংশ জমিই ডিজেলচালিত পাম্প নির্ভর। জমি তৈরি থেকে শুরু করে ধানের শীষ শক্ত হওয়া পর্যন্ত পুরোমাত্রায় সেচ কার্যক্রম সচল রাখা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে- পাম্পের পর পাম্প হন্যে হয়ে ঘুরেও মিলছে না ডিজেল। কাঙ্ক্ষিত পানির অভাবে সেচনির্ভর বোরো আবাদ নিয়ে চরম এক অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে মাঠের নায়ক কৃষকদের। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে সেচ সঙ্কট প্রকট আকার নিয়েছে।
দেশের একক বৃহত্তম ফসল বোরো থেকেই ৬০ শতাংশ চালের জোগান আসে। মাছে ভাতে বাঙালির খাদ্যের বড় অংশই নিশ্চিত করে এই আবাদ। এখন ভরা মৌসুমে সেচের সমস্যার দ্রুত সমাধান না হলে বোরোর উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অর্জিত হবে না সরকারের লক্ষ্যমাত্রাও। অবধারিতভাবেই চালের বাজার চড়ার ঝুঁকি থাকে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তাও চরম হুমকিতে পড়ার আশঙ্কা অমূলক নয় মোটেও। এক্ষেত্রে সরকারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ডিজেল সঙ্কটের সমাধান করতে হবে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। বিদ্যুৎ ও সারের মতো ডিজেলেও সরকার ভর্তুকি দিলে বোরো চাষে ইতিবাচক ফলাফল আসতে পারে। কৃষিবান্ধব সরকারের সময়োচিত এমন সব পদক্ষেপই হতে পারে দেশের কৃষি খাতকে সম্ভাব্য বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষার অন্যতম হাতিয়ার।
কৃষকের পরিশ্রম, ত্যাগ ও দৃঢ়তার ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের ভিত্তি বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কৃষিকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে রূপ দিতে চান। তিনি সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, কৃষক ভালো থাকলে বাংলাদেশ ভালো থাকবে। কৃষির উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে চায় তার সরকার। কৃষিকে প্রযুক্তিনির্ভর ও টেকসই খাতে উন্নীত করতে সরকার মনোযোগ দিয়েছে। জিডিপিতে কৃষির অবদান ১১ থেকে ১৩ শতাংশ। দেশের শ্রমশক্তির ৪১ শতাংশ এই খাতে সম্পৃক্ত থেকে জীবিকা নির্বাহ করে। কৃষিকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার পাশাপাশি প্রণোদনা, ভর্তুকি ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পেতে ইতোমধ্যেই বর্তমান সরকার দু’মাসেরও কম সময়ের মধ্যে ‘কৃষক কার্ড’ চালু করেছেন। এই সমন্বিত ডিজিটাল স্মার্ট কার্ড ব্যবস্থার আওতায় ধাপে ধাপে আসবেন ২ কোটি ৭৫ লাখ কৃষক। ক্ষমতায় এসেই ১২ লাখ কৃষকের দেড় হাজার কোটি টাকার কৃষি ঋণ মওকুফ করেছেন।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৫০ লাখ ৫৩ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে কৃষি বিভাগ। গত বছরের ডিসেম্বর থেকে শুরু হয়েছে বোরো ধানের চাষ। প্রায় ৯০ শতাংশ জমিতে এরই মধ্যে চারা রোপণ হয়েছে। আগামী মে থেকে জুন মাসে পাকবে স্বপ্নের বোরো। এখন দেশের বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠজুড়ে অফুরান সবুজের সমারোহ। সবুজের ঢেউ দোল খাচ্ছে বাতাসে। এই চিত্র নয়নাভিরাম হলেও ডিজেল সঙ্কট ও লোডশেডিংয়ের ফলে বোরো ক্ষেতগুলোতে কিন্তু পানি নেই। শুকিয়ে যাচ্ছে ক্ষেত। মাঝপথে মরে যেতে পারে ধানের চারা। তা ছাড়া ধানের শীষ সম্পূর্ণ না হলে থোড়াও বের হবে না। নিজেদের স্বপ্ন সোনা হয়ে ধরা দিবে না কৃষককূলের ভাগ্যে। ফলত দুশ্চিন্তার ভাঁজ মাঠের নায়কদের কপালে। জ্বালানিসংকট আরো তীব্র হলে ধান উৎপাদনে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ায় শঙ্কা থাকছেই।
কৃষি অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, বোরো চাষের প্রয়োজনীয় এই সময়ে সেচ দেয়া সম্ভব না হলে ফলন অর্ধেকে নেমে আসতে পারে। তাই পর্যাপ্ত সেচ সুবিধা নিশ্চিত করাই এখন প্রধান দায়িত্ব। নতুন করে লিটারে ১৫ টাকা ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ সঙ্কট পরিস্থিতিকে নাজুক করে তুলেছে। বোরো আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হলে কেবল খাদ্য নিরাপত্তাই নয় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকারকে ডিজেলে ভর্তুকির বিষয়টি অতি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে। নয়তো কৃষকের মনোবল ভেঙে যাবে। ভবিষ্যতে বোরো আবাদে তারা নিরুৎসাহিত হবেন।
কৃষকদের অগ্রাধিকার দিয়ে ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশের খাদ্য নিরাপত্তার সাথে বোরোর উৎপাদন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে ডিজেল সঙ্কটের সমাধানে এর সাথে সম্পৃক্ত মন্ত্রণালয়কে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। ডিজেল প্রাপ্তি সহজ করতে মাঠ পর্যায়ে সরবরাহ ব্যবস্থায় সমন্বয়হীনতা দূর করতে হবে। খোলাবাজারে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে ডিজেল। দুর্বল তদারকির ফলে মুনাফালোভীদের পোয়াবারো অবস্থা। কৃষকদের জন্য বরাদ্দ জ্বালানি যেন কালোবাজারি সিন্ডিকেটের হাতে চলে না যায় সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে।
চলমান সঙ্কটে মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের দৌরাত্ম হ্রাসে কঠোর নজরদারি রাখতে হবে। কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে কৃষি বিভাগকে। তাদের সরাসরি কৃষকের পাশে থাকতে হবে এবং সমস্যা সমাধানে সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে হবে। সরকারের কৃষিবান্ধব মানসিকতার সংশ্লিষ্টদেরও প্রশ্নাতীত আন্তরিকতার নজির স্থাপন করতে হবে। স্মরণে রাখতে হবে কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনেও সরকারের লক্ষ্য অর্জিত হবে। এক্ষেত্রে কৃষকের স্বার্থকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সুরক্ষিত করার কোন বিকল্প নেই।
লেখক : পেশাদার গণমাধ্যমকর্মী ও বিশ্লেষক।



