বিমানকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগ

সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, বিমানকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার উদ্যোগ একটি প্রয়োজনীয় এবং সময়োপযোগী পদক্ষেপ। তবে এটি কোনো স্বল্পমেয়াদি প্রকল্প নয়; এটি একটি দীর্ঘ যাত্রা, যেখানে প্রতিটি ধাপে সতর্কতা, পরিকল্পনা এবং সৎ ইচ্ছার প্রয়োজন।

আহসান হাবিব বরুন
একটি দেশের আকাশপথ কেবল যাতায়াতের মাধ্যম নয়; এটি সেই দেশের সামর্থ্য, শৃঙ্খলা, আধুনিকতা এবং আন্তর্জাতিক পরিচয়ের প্রতিফলন। আর সেই প্রতিচ্ছবির কেন্দ্রেই থাকে জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা—বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য, এই প্রতিষ্ঠানটি বহু বছর ধরেই সম্ভাবনা ও ব্যর্থতার এক অদ্ভুত সহাবস্থানের মধ্যে আটকে আছে। যে প্রতিষ্ঠানটি দেশের আকাশে গর্বের প্রতীক হয়ে ওড়ার কথা, সেটিই দীর্ঘদিন ধরে লোকসান, অনিয়ম এবং আস্থাহীনতার ভার বহন করে চলেছে।

বিমানের গল্প আসলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত অনেক প্রতিষ্ঠানের গল্পেরই প্রতিচ্ছবি। এখানে যেমন রয়েছে দক্ষ জনবল ও বিপুল সম্ভাবনা,তেমনি রয়েছে ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা,জবাবদিহিতার অভাব এবং দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম। সময়মতো ফ্লাইট ছাড়তে না পারা,যাত্রীসেবায় অবহেলা, টিকিটিং জটিলতা কিংবা অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির অভিযোগ—এসব যেন বিমানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক পরিচিত বাস্তবতা। ফলে যাত্রীদের আস্থার জায়গাটি ধীরে ধীরে ক্ষয়ে গেছে, আর আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রতিযোগিতায় বিমান বারবার পিছিয়ে পড়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে বর্তমান সরকারের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে নতুন আশার সঞ্চার করছে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতের ঘোষণায় উঠে এসেছে এক উচ্চাভিলাষী কিন্তু সময়োপযোগী পরিকল্পনা—উড়োজাহাজ বহরকে ‘আন্তর্জাতিক মানে’ উন্নীত করা। এ লক্ষ্যে বোয়িং কোম্পানির সঙ্গে ১৪টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি হয়েছে,পাশাপাশি আরো কিছু বিমান লিজ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। এই ঘোষণা কেবল একটি কেনাকাটার খবর নয়; বরং এটি একটি বার্তা—বিমানকে নতুন করে দাঁড় করানোর চেষ্টা শুরু করেছে সরকার।

তবে প্রশ্ন হচ্ছে—আন্তর্জাতিক মান কি শুধুই আধুনিক উড়োজাহাজে সীমাবদ্ধ? বাস্তবতা বলছে, মোটেও তা নয়। বরং একটি এয়ারলাইন্সের মান নির্ধারিত হয় তার প্রতিদিনের পরিচালনায়, যাত্রীদের সঙ্গে তার আচরণে, সময়ের প্রতি তার প্রতিশ্রুতিতে এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার কঠোরতায়। নতুন উড়োজাহাজ নিঃসন্দেহে দৃশ্যমান উন্নয়ন এনে দেবে, কিন্তু যদি পুরনো মানসিকতা ও দুর্বল ব্যবস্থাপনা বহাল থাকে,তাহলে সেই উড়োজাহাজও খুব দ্রুতই পুরনো সমস্যার ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়বে। এতে আমার ন্যূনতম সন্দেহ নেই।

বিমানের উন্নয়নের এই আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে—দেশের অব্যবহৃত বিমানবন্দরগুলোকে সক্রিয় করার পরিকল্পনা। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে থাকা এই বিমানবন্দরগুলো অনেকটাই অবহেলিত অবস্থায় পড়ে আছে। এগুলোকে সংস্কার করে অভ্যন্তরীণ রুটে চালু করা গেলে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে। আকাশপথে দ্রুত ও নিরাপদ যোগাযোগ শুধু মানুষের যাতায়াত সহজ করবে না,বরং আঞ্চলিক অর্থনীতিকেও গতিশীল করে তুলবে বলে আমি মনে করি।

এই উদ্যোগের সঙ্গে পর্যটন খাতের সম্ভাবনাও অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। কক্সবাজার কিংবা কুয়াকাটা—এসব স্থানের সৌন্দর্য বিশ্বমানের,কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর সুবিধা এখনো পুরোপুরি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত হয়নি। যদি সহজ ও নিয়মিত বিমান যোগাযোগ নিশ্চিত করা যায়,তাহলে বিদেশী পর্যটকদের জন্য বাংলাদেশ আরো আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। এতে অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত নতুন করে প্রাণ ফিরে পাবে।

এদিকে আগামী ১৬ ডিসেম্বর হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল উদ্বোধনের পরিকল্পনাও এই পরিবর্তনের ধারাকে আরো দৃশ্যমান করে তুলছে। একটি আধুনিক টার্মিনাল শুধু যাত্রীসেবার মান বাড়ায় না, এটি একটি দেশের সক্ষমতা ও পরিকল্পনার প্রতীক হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক যাত্রীরা যখন একটি দেশের বিমানবন্দরে অবতরণ করেন,তখন সেটিই তাদের কাছে প্রথম অভিজ্ঞতা—সেই অভিজ্ঞতা যত উন্নত হবে,দেশের ভাবমূর্তিও তত উজ্জ্বল হবে।

তবে এই সব উন্নয়নের মাঝেও একটি প্রশ্ন বারবার সামনে আসে—বিমানের মূল সমস্যাগুলোর কি সত্যিই সমাধান হচ্ছে? কারণ দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, অদক্ষতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত না হলে কোনো সংস্কারই টেকসই হবে না। এইজন্য প্রয়োজন একটি মৌলিক পরিবর্তন—প্রতিষ্ঠানটিকে একটি পেশাদার,দক্ষ এবং জবাবদিহিমূলক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা। এখানে নিয়োগ থেকে শুরু করে অপারেশন পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।

বিশ্বের সফল এয়ারলাইন্সগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা শুধু প্রযুক্তি বা উড়োজাহাজে নয়, বরং সেবার দর্শনে আলাদা। তারা যাত্রীকে ‘গ্রাহক’ হিসেবে নয়, বরং ‘অভিজ্ঞতার অংশীদার’ হিসেবে বিবেচনা করে। বিমানের ক্ষেত্রেও এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি। যাত্রী যেন বিমানে ওঠার পর নিজেকে সম্মানিত ও নিরাপদ মনে করেন—এই অনুভূতিই আন্তর্জাতিক মানের প্রকৃত সূচক।

আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার বাস্তবতাও এখানে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। মধ্যপ্রাচ্যের এয়ারলাইন্সগুলো কিংবা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক সংস্থা ইতোমধ্যেই বিশ্বমানের সেবা দিয়ে বাজার দখল করেছে। সেই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে বিমানের কৌশলগত পরিকল্পনা, ব্র্যান্ডিং এবং সেবার মান সবকিছুতেই একযোগে উন্নতি আনতে হবে।

সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, বিমানকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার উদ্যোগ একটি প্রয়োজনীয় এবং সময়োপযোগী পদক্ষেপ। তবে এটি কোনো স্বল্পমেয়াদি প্রকল্প নয়; এটি একটি দীর্ঘ যাত্রা, যেখানে প্রতিটি ধাপে সতর্কতা, পরিকল্পনা এবং সৎ ইচ্ছার প্রয়োজন। নতুন উড়োজাহাজ, আধুনিক টার্মিনাল কিংবা উন্নত অবকাঠামো—সবই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো একটি সুশাসিত, দক্ষ এবং দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা।

যদি সেই লক্ষ্য অর্জন করা যায়, তাহলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কেবল একটি লোকসানি সংস্থা থেকে বেরিয়ে আসবে না; বরং এটি হয়ে উঠবে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার এক উজ্জ্বল প্রতীক। আর যদি সেই পরিবর্তন না আসে, তাহলে এই সব উদ্যোগ কেবল ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে—আর আকাশে উড়লেও বিমান তার কাঙ্ক্ষিত উচ্চতায় কখনোই পৌঁছাতে পারবে না।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।

[email protected]