মেহেদী হাসান অনিক
বাংলাদেশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) যুগে গবেষণাগার বা প্রযুক্তিগত নীতিমালার হাত ধরে প্রবেশ করেনি; বরং প্রবেশ করেছে ফৌজদারি আইনের মাধ্যমে। ২০২৫ সালের ‘সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ’ দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম আইন যেখানে স্পষ্টভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে (আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স- এআই) অপরাধ সংঘটনের একটি মাধ্যম হিসেবে আইনি স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।
অধ্যাদেশটির ১৭ ধারায় বলা হয়েছে- কেউ যদি ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা অন্য কোনো স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা’ ব্যবহার করে এ আইনের আওতাভুক্ত কোনো অপরাধ (যেমন- গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোয় বেআইনি প্রবেশ) করেন তবে ওই ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে গণ্য করা হবে। অর্থাৎ, হ্যাকিং বা সাইবার আক্রমণে এআই টুল ব্যবহার করলে তার দায় ব্যবহারকারীর ওপর বর্তাবে। অন্যদিকে, ২৫ ধারা অনুযায়ী- কেউ যদি ডিজিটাল মাধ্যম বা এআই ব্যবহার করে ‘মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর বা মানহানিকর তথ্য’ প্রকাশ বা প্রচার করেন, তবে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। স্মরণযোগ্য, নতুন অধ্যাদেশে এ ধারার শাস্তি কমিয়ে সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড করা হয়েছে। সেই সাথে অপরাধটি জামিনযোগ্য রাখা হয়েছে যা আগের আইনে আরো কঠোর ছিল। সহজ কথায়, আইনটি এখন এআই-নির্ভর হ্যাকিং, স্বয়ংক্রিয় সাইবার আক্রমণ কিংবা ‘ডিপফেক’ ভিডিও তৈরির মতো কর্মকাণ্ডকে অপরাধের আওতায় এনেছে।
প্রেক্ষাপট : কেন এই সংযোজন?
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে এআই ব্যবহার করে তৈরি ভুয়া ভিডিও, ছবি ও তথ্যের বিস্তার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। কখনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে, আবার কখনো ব্যক্তিগত আক্রোশ মেটাতে এসব হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে সরকার মনে করছে, এআই-ভিত্তিক অপরাধ মোকাবেলায় প্রচলিত আইনগুলো যথেষ্ট নয়। ফলে ‘এআইয়ের মাধ্যমে অপরাধ সংঘটিত হলেও দায় মানুষের’ এই নীতি আইনে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
আইনে যা আছে, আর যা নেই
এই উদ্যোগ বৈশ্বিক প্রবণতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ইউরোপ ও আমেরিকায় এআই ঝুঁকি মোকাবেলায় আইন হচ্ছে। তবে বাংলাদেশের অধ্যাদেশটির পরিসর তুলনামূলক সঙ্কীর্ণ। এটি মূলত এআইয়ের অপব্যবহারকে শাস্তির আওতায় এনেছে; কিন্তু প্রযুক্তির সুশাসন বা উদ্ভাবন নিয়ন্ত্রণে কোনো কাঠামো তৈরি করেনি। সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো- আইনে ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’র সুনির্দিষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ কোনো সংজ্ঞা নেই; নেই কোনো তদারককারী সংস্থা বা এআই-বিষয়ক আলাদা নীতিগত নির্দেশনা। এতে বাস্তবে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। সাধারণ অটোমেশন আর জটিল এআই অ্যালগরিদম- উভয়কে গুলিয়ে ফেলার ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে।
আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ অবশ্য কিছুটা ভিন্নপথে হাঁটছে। ভারত ডিপফেক শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণে ‘ওয়াটারমার্ক’ ও ‘লেবেলিং’ বাধ্যতামূলক করার খসড়া নিয়ম প্রণয়ন করেছে। পাকিস্তান ও নেপাল ইতোমধ্যে জাতীয় এআই নীতিমালা অনুমোদন করেছে, যেখানে উদ্ভাবন, নৈতিকতা ও জনসচেতনতার ওপর জোর দেয়া হয়েছে। তবে এসব দেশে এখনো এআই-নির্ভর অপরাধের স্পষ্ট আইনি সংজ্ঞা নেই। সেদিক থেকে বাংলাদেশই প্রথম দেশ, যারা এআইকে সরাসরি ফৌজদারি অপরাধের পরিসরে অন্তর্ভুক্ত করে আইন পাস করেছে।
প্রথম ধাপ, তবে শেষ নয়
‘সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫’ বাংলাদেশের ডিজিটাল আইনি কাঠামোতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। এর মাধ্যমে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন এমন এক শক্তি, যা যেমন দ্রুত ক্ষতি করতে পারে, তেমনি মানুষের উপকারেও আসতে পারে। আইনটি ক্ষতিকর দিক দমনে পদক্ষেপ নিয়েছে সত্য; কিন্তু প্রযুক্তির সঠিক ও দায়িত্বশীল ব্যবহারের রূপরেখা এখনো অনুপস্থিত। অপরাধমূলক ব্যবহারের শাস্তি নির্ধারণ একটি প্রয়োজনীয় প্রথম পদক্ষেপ। তবে প্রযুক্তির নৈতিক ও স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত করতে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘জাতীয় এআই নীতিমালা’ প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি।
সারসংক্ষেপে, বাংলাদেশের নতুন সাইবার আইন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে একটি বার্তা স্পষ্ট করছে; এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে অপরাধ করলে শাস্তি অনিবার্য। কিন্তু প্রযুক্তির এ শক্তিকে কিভাবে দেশের উন্নয়ন ও জনকল্যাণে কাজে লাগানো হবে- সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো অধরা রয়ে গেছে।
লেখক : প্রভাষক, আইন বিভাগ, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি



