বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্ত এখন এক দীর্ঘস্থায়ী ও অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের বৈশ্বিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব যখন আমাদের দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছে, অন্যদিকে দেশের ভূ-রাজনৈতিক ও সার্বভৌমত্বের স্থিতিশীলতাকে চরম পরীক্ষার মুখে ঠেলে দিয়েছে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সঙ্ঘাত। মিয়ানমার জান্তা বাহিনী এবং সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির (এএ) মধ্যকার রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের চড়া খেসারত দিতে হচ্ছে নিরীহ বাংলাদেশী সীমান্তবাসীর। সীমান্তের ওপারে বারুদের যে গন্ধ, তা এখন এপারেও ছড়িয়ে পড়েছে ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণ, সরাসরি গুলিবর্ষণ আর সশস্ত্র অনুপ্রবেশের বিভীষিকা হয়ে। প্রশ্ন উঠেছে, এই মানবিক বিপর্যয় আর সার্বভৌমত্বের সঙ্কট আর কতকাল চলবে? সরকারের জোরালো ও কৌশলী ভূমিকা ছাড়া এই সঙ্কট থেকে উত্তরণের পথ কি আদৌ আছে?
সীমান্তে এখন সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম ‘অদৃশ্য মৃত্যু’ বা ল্যান্ডমাইন। মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মি—উভয় পক্ষই আন্তর্জাতিক আইন ও কনভেনশনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সীমান্ত ঘেঁষে বিপুল পরিমাণ ল্যান্ডমাইন ও আইইডি (ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস) পুঁতে রেখেছে। ২০২৬ সালের শুরুতেই এই আতঙ্ক বাস্তবে রূপ নেয় এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনার মাধ্যমে। গত ১২ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে টেকনাফের হোয়াইক্যং (লম্বাবিল) সীমান্তে নাফ নদীর তীরে ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে মোহাম্মদ হানিফ (২৮) নামে এক বাংলাদেশী যুবকের পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, এর ঠিক আগের দিন আরাকান আর্মির সদস্যরা গুলি করতে করতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়েছিল এবং ফেরার সময় তারা এসব মাইন পুঁতে রেখে যায়।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপি ও আলজাজিরার তথ্যমতে, ২০২৫ সালেই সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে অন্তত ২৮ জন বাংলাদেশী আহত হয়েছেন। ২০২৬-এর শুরুতে হানিফের পঙ্গুত্ব বরণ সেই আতঙ্ককে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমানে টেকনাফ ও নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের বাসিন্দারা নিজেদের কৃষিজমি কিংবা চিংড়ি ঘেরে যেতে ভয় পাচ্ছেন। স্থানীয়দের দাবি অনুযায়ী, সীমান্ত ঘেঁষে শত শত ছোট আকারের মাইন স্থাপন করা হয়েছে, যা মাটির সামান্য নিচে ঘাস ও ময়লা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। ফলে নাফ নদীতে মাছ ধরা এবং কৃষিকাজ প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। এখানে সরকারের ‘মাইন-সুইপিং’ সক্ষমতা বাড়ানো এবং আক্রান্ত পরিবারগুলোর ক্ষতিপূরণে রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ জরুরি।
কেবল ল্যান্ডমাইন নয়, সীমান্তের এপারে সরাসরি গুলিবর্ষণও এখন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে নাইক্ষ্যংছড়ির তুমব্রু সীমান্তে মিয়ানমারের অভ্যন্তর থেকে আসা গুলিতে ১৩ বছরের কিশোরী আনিকা আক্তার আহত হওয়ার ঘটনাটি পুরো জাতিকে স্তম্ভিত করেছে। আনিকা তার বাড়ির আঙিনায় কাজ করার সময় ওপার থেকে আসা একটি বুলেট তার পিঠে বিদ্ধ হয়। এই অবুঝ কিশোরীটি জানত না যে, প্রতিবেশী দেশের ক্ষমতার লড়াই তার শৈশবকে এভাবে রক্তাক্ত করবে। দীর্ঘ ২৭ দিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে বিদায় নিত হয়ে পৃথিবী থেকে।
আনিকার এই গল্পটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি সীমান্তের শত শত পরিবারের আতঙ্কের প্রতিচ্ছবি। গত জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে নাইক্ষ্যংছড়ি ও টেকনাফ সীমান্তে মিয়ানমার জান্তা বাহিনী এবং আরাকান আর্মির ছোঁড়া গুলিতে একাধিক বাংলাদেশী নাগরিক ও বিজিবি সদস্য আহত হয়েছেন। বিশেষ করে নাফ নদীতে মাছ ধরার সময় বা সীমান্তের জমিতে কৃষিকাজ করার সময় ওপার থেকে আসা গুলি আমাদের সাধারণ মানুষের জীবনকে প্রতিনিয়ত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতি সীমান্ত সংলগ্ন জনপদগুলোকে প্রায় জনশূন্য করে তুলছে। সরকারের পক্ষ থেকে মিয়ানমারের ওপর যে কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে, তা যে যথেষ্ট নয়—আনিকার রক্তের দাগ যেন সেই সাক্ষ্যই দিচ্ছে।
মিয়ানমারের বিদ্রোহীদের আনাগোনা এখন আর কেবল ওপারেই সীমাবদ্ধ নেই। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখের ‘কালের কণ্ঠ’ পত্রিকার একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৩ ফেব্রুয়ারি বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের সময় বিজিবি সদস্যরা আরাকান আর্মির তিন সদস্যকে আটক করেছে। আটককালে তাদের কাছে অত্যাধুনিক অস্ত্র এবং মিয়ানমারের মুদ্রা পাওয়া যায়। বিজিবির তৎকালীন অধিনায়ক লে. কর্নেল আবদুল্লাহ আল মাসরুর জানিয়েছেন, অনুপ্রবেশ রোধে সীমান্তে কড়া পাহারা ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
এই অনুপ্রবেশের ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, সুযোগ পেলেই সশস্ত্র বিদ্রোহীরা বাংলাদেশের ভূখণ্ডকে তাদের নিরাপদ আশ্রয়, রসদ সরবরাহ বা ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহারের অপচেষ্টা করছে। এটি কেবল অনুপ্রবেশ নয়, বরং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত। বিভিন্ন সময়ে মিয়ানমার জান্তা বাহিনীর ছোঁড়া মর্টার শেল ও আকাশসীমা লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো এই নিরাপত্তাহীনতাকে আরো ঘনীভূত করেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ি এলাকাগুলোকে ব্যবহার করে কোনো গোষ্ঠী যেন রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড চালাতে না পারে, সে বিষয়ে এখন সর্বোচ্চ সতর্কতার সময়।
বিদ্রোহীদের দাপটে টিকতে না পেরে মাঝেমধ্যেই মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিপি) ও জান্তা সেনাদের অস্ত্রসহ বাংলাদেশে পালিয়ে আসার ঘটনা ঘটছে। যদিও মানবিক ও আন্তর্জাতিক আইনের কারণে তাদের নিরস্ত্রীকরণ করে ফেরত পাঠানো হয়েছে, কিন্তু তাদের ফেলে আসা অস্ত্র এবং সীমান্তের এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য এক বিশাল হুমকি। জান্তা বাহিনীর এই পলায়ন প্রমাণ করে যে ওপারে কোনো কার্যকর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নেই, যা অপরাধী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর জন্য অভয়ারণ্য তৈরি করছে। ল্যান্ডমাইন শনাক্ত করতে বিজিবি বর্তমানে মাইন-সুইপিং অপারেশন চালাচ্ছে এবং বিপদজনক এলাকায় লাল পতাকা পুঁতে সতর্কতা জারি করেছে। কিন্তু দীর্ঘ সীমান্তের প্রতিটি ইঞ্চি এভাবে সুরক্ষিত করা এবং পাহাড়ি এলাকায় মাইন শনাক্ত করা অত্যন্ত টেকনিক্যাল ও চ্যালেঞ্জিং কাজ। এখানে সেনাবাহিনীর বিশেষায়িত ‘কোর’কে আরো বড় পরিসরে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।
মিয়ানমার সীমান্তের এই অস্থিরতা কেবল স্থানীয় সমস্যা নয়। এর সাথে জড়িয়ে আছে ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ। আরাকান আর্মি বা অন্য কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী যদি বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহার করার সুযোগ পায়, তবে তা আঞ্চলিক সম্পর্কের অবনতি ঘটাবে। একইসাথে পার্বত্য চট্টগ্রামের নৃতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক সমীকরণকেও তা জটিল করে তুলতে পারে। ল্যান্ডমাইন আর বুলেটের আঘাত যখন সাধারণ মানুষের জানমালের ক্ষতি করছে, তখন রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কেবল ‘প্রতিবাদ লিপি’ বা ‘পতাকা বৈঠক’ যথেষ্ট নয়। আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে এই নতুন ধরনের ‘হাইব্রিড থ্রেট’ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
সীমান্তে অস্থিরতা ও সার্বভৌমত্বের ঝুঁকি আজ আর কেবল তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বরং এক রূঢ় বাস্তব। কিশোরী আনিকার পিঠে বিদ্ধ বুলেট কিংবা হানিফের বিচ্ছিন্ন পা আমাদের নীতিনির্ধারকদের দিকে এক কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে। মিয়ানমার থেকে উড়ে আসা প্রতিটি গুলি কিংবা বিদ্রোহীদের প্রতিটি অনুপ্রবেশ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় আমাদের আর এক মুহূর্তও হাত গুটিয়ে বসে থাকার সুযোগ নেই।
পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক ও কৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে আমূল পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি। এই সঙ্কট মোকাবিলায় সরকারের প্রতি কিছু সুপারিশ তুলে ধরছি।
১. স্মার্ট বর্ডার ম্যানেজমেন্ট: সীমান্তে অত্যাধুনিক নজরদারি প্রযুক্তি যেমন—সার্ভেইল্যান্স ড্রোন, নাইট ভিশন থার্মাল সেন্সর এবং সিসিক্যামেরা বৃদ্ধি করতে হবে।
২. বিশেষায়িত মাইন ইউনিট: মাইন শনাক্ত ও অপসারণের জন্য বিজিবি ও সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে একটি বিশেষায়িত ‘মাইন ক্লিয়ারেন্স ইউনিট’ গঠন করা।
৩. প্রক্সি ওয়ার প্রতিরোধ: কোনোভাবেই যেন বিদেশী সশস্ত্র গোষ্ঠী আমাদের ভূমি ব্যবহার করতে না পারে, সেজন্য গোয়েন্দা নজরদারি ও কঠোর সামরিক অবস্থান নিশ্চিত করা।
৪. আগ্রাসী কূটনীতি: আন্তর্জাতিক ফোরামে ওআইসি, আসিয়ান এবং জাতিসঙ্ঘের মাধ্যমে মিয়ানমারের এই আগ্রাসী ও আন্তর্জাতিক আইনবিরোধী আচরণের বিরুদ্ধে জোরালো আইনি ও কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা।
৫. সীমান্তবাসীদের সুরক্ষা: সীমান্ত এলাকার মানুষের জীবন ও জীবিকা রক্ষায় বিশেষ অর্থনৈতিক প্যাকেজ এবং আহতদের পুনর্বাসন নিশ্চিত করা।
পরিশেষে- নীতিনির্ধারকদের মনে রাখতে হবে, দেশের এক ইঞ্চি জমিও যেন কোনো বিদেশী সশস্ত্র গোষ্ঠীর চারণভূমি হতে না পারে, তা নিশ্চিত করাই হবে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সার্বভৌমত্ব রক্ষা কেবল সীমান্তের পাহারা নয়, এটি রাষ্ট্রের সংকল্প ও সক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।


