নিভৃতে জেগে উঠেছিল এক সম্ভাবনা

কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, এত সহায়তা দিয়ে বিদেশী শিক্ষার্থী ডেকে আনার ঠেকা পড়েছে কেন? ঠেকা পড়েনি, এটা সত্য। কিন্তু বৈদেশিক মুদ্রার অভাবে আমরাই যে ঠেকে যাচ্ছি! বাইরের দেশের সাথে ঠিকমতো ব্যবসা-বাণিজ্যও করতে পারছি না। দেশের বাইরে থেকে কেউ পড়তে এলে সাথে নিয়ে আসে কাঙ্ক্ষিত সেই বৈদেশিক মুদ্রা।

কাশ্মিরের শ্রীনগর থেকে মেয়েটা পড়তে এসেছেন বাংলাদেশে। অথবা থিম্পুর উপত্যকায় বেড়ে ওঠা কোনো এক মেয়ে ধুলোবালু আর জ্যামের শহর ঢাকায় এসেছেন, ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে। আমরা বাংলাদেশীরাও বিদেশে যাই। পড়তে, উন্নত ভবিষ্যৎ গড়তে। যাওয়ার জন্য ভিসার লাইনে দাঁড়িয়ে ঘাম ঝরাই। সম্ভবত এ কারণেই আমাদের মধ্যে একটা ধারণা গেঁড়ে বসেছে- আমাদের পক্ষে কখনো উন্নত হওয়া সম্ভব নয়! উন্নত হওয়ার ইচ্ছাটাও আমাদের নেই! যদি কখনো উন্নত হওয়ার সম্ভাবনা যেঁচে এসে সামনে দাঁড়ায়, সেটাও বিরক্তিভরে প্রত্যাখ্যান করি! উপড়ে ফেলি সম্ভাবনার শেকড়।

বাংলাদেশে নিভৃতে জেগে উঠেছিল একটি সম্ভাবনা। সেই সম্ভাবনার চারা গাছটাকে মেরে ফেলা হচ্ছে গলা টিপে। জম্মু ও কাশ্মির থেকে যারা ডাক্তারি পড়তে আসে, কাঠমান্ডু বা থিম্পু থেকে যারা আসতে চায়, বিপুল বিরক্তির সাথে আমরা তাদের ফিরিয়ে দিচ্ছি।

দেখা যাচ্ছে, কোনো একটি হাসপাতালে দুর্ঘটনা ঘটছে। তার প্রতিকারের পরামর্শ না দিয়ে হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করে দিচ্ছি। বাতিল করছি মেডিক্যাল কলেজের লাইসেন্সও। মশা মারতে মহাসমারোহে দাগা হচ্ছে ধ্বংসাত্মক কামান। কামানের গোলায় ছাড়খার হয়ে যাচ্ছে পুরো এস্টাবলিশমেন্ট। বাড়ছে রোগীর দুর্দশা। হুমকিতে পড়ছে মেডিক্যাল শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন। শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেশী যেমন আছে, বিদেশীও আছে। তাদের সবাইকে মাইগ্রেশন করিয়ে অন্য কোনো মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে যাওয়া যাবে। তবে ভারত থেকে যারা পড়তে এসেছে, মাইগ্রেশন করে অন্য প্রতিষ্ঠানে গেলে তাদের ডিগ্রি কাজে লাগানো যাবে না। বিদেশী বা বিদেশ থেকে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ভারতের ‘ন্যাশনাল মেডিক্যাল কমিশন’ বা এনএমসির নিয়ম কঠোর। বাংলাদেশ, চীন বা রাশিয়া থেকে কেউ যদি ডাক্তারি পড়ে ভারতে যায়, তাদের বেলায় এনএমসি দেখে তারা একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে থিউরি ও ইন্টার্নশিপ শেষ করেছে কি না। সেটা নাহলে ডিগ্রির স্বীকৃতি দেয়া হয় না। মাঝপথে কলেজ পরিবর্তন বা ভারতে গিয়ে ইন্টার্নশিপ করার সুযোগ নেই।

তাহলে কী দাঁড়াল? ভারতের শিক্ষার্থীরা চার-পাঁচ বছর ধরে লাখ লাখ টাকা খরচ করে বাংলাদেশে লেখাপড়া করল। ফিরে যাওয়ার সময় সাথে করে নিয়ে গেল ‘বেকারত্ব’। এতে দেশের বাইরে আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থার ভাবমর্যাদা কেমন হবে?

আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থার দুর্নাম এমনিতেই কম নেই। আমাদের দক্ষ চিকিৎসক আছে, ব্যবস্থাপনা ত্রুটিপূর্ণ। কোনো একটি সরকারি হাসপাতালে গেলে দেখা যায়, ভেন্টিলেশন মেশিন সচল আছে, পরীক্ষা করার টেকনিশিয়ান নেই। তিনি ডেপুটেশনে আছেন অন্য জেলায়। ইসিজি মেশিন আছে। কিন্তু তার কাগজ কেনার ফাইল মন্ত্রণালয়ে বন্দী! এই দশা কাটানোর উদ্যোগও আছে। কিন্তু সে উদ্যোগ কিছুদূর এগিয়ে থমকে যায়।

হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা নিয়ে মিডিয়ায় হইচই হলে হঠাৎ জেগে উঠতে দেখা যায় প্রশাসনকে। হম্বিতম্বি চলে, তদন্ত কমিটি হয়। তদন্তের ফল প্রকাশ্যে আসে না। মাঝখান থেকে বাতিল হয় হাসপাতালের লাইসেন্স।

ধরুন সদরঘাট থেকে ছেড়ে যাওয়া একটা লঞ্চ চাঁদপুর গিয়ে ডুবে গেল। অথবা গোলাপবাগ থেকে ছেড়ে যাওয়া একটি বাস উল্টে গেল নরসিংদীতে। এতে অনেক মানুষ হতাহত হলো। তখন প্রশাসন কি ওই পরিবহনের মালিককে গ্রেফতার করবে, নাকি পুরো পরিবহন কোম্পানির লাইসেন্স বাতিল করে দেবে? অথবা সব বাস বা সব লঞ্চ পুড়িয়ে দেবে? সড়ক দুর্ঘটনার দায়ে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কটাই সিলগালা করে দেয়া কি যৌক্তিক হবে?

হাসপাতালে কোনো রোগীর মৃত্যু হলে সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া দরকার। অপরাধীকে কঠিন শাস্তি দেয়া দরকার। কিন্তু পুরো মেডিক্যাল কলেজ বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে কেন?

এভাবে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হলে, লোটে শেরিংরা এখানে পড়তে আসবেন না। ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ থেকে ডিগ্রি নিয়ে যাওয়া লোটে শেরিং ভুটানের প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশ থেকে এমবিবিএস এবং এফসিপিএস শেষ করে ফিরে যান তিনি। তারপর রাজনীতি শুরু করেন। প্রধানমন্ত্রী হন। শেরিং সরকারি মেডিক্যাল কলেজে পড়েছেন। বাংলাদেশের বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ থেকে ডিগ্রি নিয়েও অনেকে ভারত, নেপাল, ভুটান ও মালদ্বীপে ডাকসাইটে চিকিৎসক হয়েছেন। এমন উদাহরণ অসংখ্য।

অন্য অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে ক্লিনিক্যাল এক্সপোজার বা রোগী দেখার সুযোগ বেশি। এ কারণে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো থেকে এখানে পড়তে আসার আগ্রহ আছে। বাংলাদেশের ৭২টি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে মোট আসনের ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত বিদেশী শিক্ষার্থী ভর্তির অনুমতি আছে। সে হিসাবে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে সুযোগ ছিল ২,৮০০ শিক্ষার্থীর। সেখানে ভর্তি হয়েছে মাত্র ১,০৯৮ জন। ফাঁকা থেকে গেছে অর্ধেকের বেশি আসন। এ বছর বেশ কয়েকটি নামকরা মেডিক্যাল কলেজে একজন বিদেশীও ভর্তি হননি। কারণ কী?

শেখ হাসিনা রেজিমের তৈরি করা রাজনৈতিক অস্থিরতা একটি কারণ ছিল। তখন ভারত কৃত্রিম জটিলতা তৈরি করেছিল। এতে ভারত থেকে পড়তে আসতে চাইলেও সেটা সম্ভব ছিল না। কিন্তু এখন সম্ভব। তারপরও কেন আসছে না?

প্রধান কারণ, তারা কেন আসছে না, সেটা নিয়েই আমাদের মাথাব্যথা নেই। তা ছাড়া বিদেশ থেকে কেউ এলে তার জন্যও নানা জটিলতা আছে এখানে। কাগজপত্র ঠিক রাখতে বাংলাদেশীদের মতোই জুতার তলা ক্ষয় করতে হয় তাদের। এতসব ধকল সামলে হাসপাতালে যখন পড়তে যায়, রোগীদের সাথে কথা বলতে যায়, তখন দেখা দেয় ভাষাগত সমস্যা। রোগী তাদের কথা বোঝে না, তারা বোঝে না রোগীর কথা। বাংলা ভাষাটা কোনোরকম বলতে শিখতে অনেকটা সময় চলে যায়। অথচ শুরুর দিকে তাদের ভাষাগত সহায়তা দেয়ার ব্যবস্থা করা হয় না।

কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, এত সহায়তা দিয়ে বিদেশী শিক্ষার্থী ডেকে আনার ঠেকা পড়েছে কেন? ঠেকা পড়েনি, এটা সত্য। কিন্তু বৈদেশিক মুদ্রার অভাবে আমরাই যে ঠেকে যাচ্ছি! বাইরের দেশের সাথে ঠিকমতো ব্যবসা-বাণিজ্যও করতে পারছি না। দেশের বাইরে থেকে কেউ পড়তে এলে সাথে নিয়ে আসে কাঙ্ক্ষিত সেই বৈদেশিক মুদ্রা। এমবিবিএস শেষ করতে ৫০ লাখ টাকার মতো খরচ করতে হয় তাকে। এই বিপুল টাকা আমাদের অর্থনীতির সঙ্গে জুড়ে যায়। তারা এখানে বাড়িভাড়া দেয়, রেস্টুরেন্টে খায়, দেশের ভেতর যাতায়াত করে। বিদেশী শিক্ষার্থীদের যে দেড় হাজার আসন ফাঁকা আছে, এর মানে হলো- আমরা বছরে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা হারাচ্ছি। এভাবে আমরা কি চূড়ান্ত ঠেকে যাওয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি!

লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত

[email protected]