‘না’ ভোট কার স্বার্থে, কোন রাজনীতিতে

এখানে প্রশ্ন ওঠে– যেখানে জুলাইবিপ্লবের মধ্য দিয়ে এই অন্তর্বর্তী সরকার এসেছে, যেখানে জুলাই সনদ সরকার ও সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যে তৈরি, সেখানে ‘হ্যাঁ’ হওয়াই কি স্বাভাবিক নয়? তাহলে বিতর্ক কেন?

গণভোট সাধারণত বিতর্কহীন হওয়ার কথা। বিশেষ করে যখন সেই গণভোট একটি বিপ্লবোত্তর রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে আসে। কিন্তু আমাদের দেশে বাস্তবতা ভিন্ন। আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ নিয়ে দেশে একটি কৃত্রিম বিতর্ক তৈরি করা হয়েছে। এই বিতর্ক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

এখানে প্রশ্ন ওঠে– যেখানে জুলাইবিপ্লবের মধ্য দিয়ে এই অন্তর্বর্তী সরকার এসেছে, যেখানে জুলাই সনদ সরকার ও সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যে তৈরি, সেখানে ‘হ্যাঁ’ হওয়াই কি স্বাভাবিক নয়? তাহলে বিতর্ক কেন?

সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে যারা সবচেয়ে বেশি সরব, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় লক্ষ করলে একটি ধারাবাহিকতা চোখে পড়ে। তাদের বড় অংশ সেই শক্তি, যারা ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার শাসনামলে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সুবিধাভোগী ছিল। কেউ প্রশাসনে ছিলেন, কেউ বুদ্ধিবৃত্তিক বৈধতা দিয়েছেন, কেউ নীরব থেকে সহযোগিতা করেছেন। এখন তারা প্রকাশ্যে ‘না’ বলতেও সাহস পাচ্ছেন না। আবার ‘হ্যাঁ’ বলতেও অস্বস্তি। তাই তারা প্রশ্ন তুলছেন প্রক্রিয়া নিয়ে।

নিরপেক্ষতা নিয়ে। ভাষার আড়ালে রাজনীতি করছেন। এটি একটি পরিচিত কৌশল। সরাসরি বিরোধিতা না করে সন্দেহ তৈরি করা। বিভ্রান্তি ছড়ানো। জনগণের মনে প্রশ্ন ঢুকিয়ে দেয়া– আসলে কী সব ঠিক আছে? তারা বলছেন, সরকারের কাজ ছিল কেবল সচেতনতা তৈরি করা। কিন্তু সরকার নাকি নির্দিষ্টভাবে ‘হ্যাঁ’র পক্ষে নেমেছে। এ যুক্তি আপাতদৃষ্টিতে আকর্ষণীয়। কিন্তু গভীরে গেলে প্রশ্নকারীদের মতলবটা বুঝতে পারা যায়।

প্রথমত, এ সরকার কোনো দলীয় সরকার নয়। এটি একটি বিপ্লবোত্তর অন্তর্বর্তী সরকার। এর জন্মই হয়েছে একটি ঐকমত্যের ভিত্তিতে। দ্বিতীয়ত, গণভোটের প্রশ্নটি কোনো দলীয় ইশতেহার নয়। এটি রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্ন। জুলাই সনদের বাস্তবায়নের প্রশ্ন।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, বিপ্লব-পরবর্তী সরকার কখনো ‘দর্শক’ হতে পারে না। তাদের দায়িত্ব থাকে বিপ্লবের অর্জন রক্ষা করা। কাঠামোগত রূপান্তর নিশ্চিত করা। ফরাসি ও রুশবিপ্লবের পর, এমনকি দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদ পতনের পর সব ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী কর্তৃপক্ষ একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক অবস্থান নিয়েছে।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বলা দরকার। ‘না’ ভোট কেবল একটি ভিন্নমত নয়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি একটি রাজনৈতিক বার্তা। এই ‘না’-এর মানে কী? এর মানে হলো– জুলাইবিপ্লবের প্রয়োজন ছিল না। এর মানে হলো পতিত ফ্যাসিবাদী সরকার যেভাবে রাষ্ট্র চালিয়েছে, তাই গ্রহণযোগ্য ছিল। এর মানে হলো গুম, খুন, ভোটহীন নির্বাচন, দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে যে গণ-অভ্যুত্থান হয়েছে, সেটি ভুল ছিল। এই বার্তাই ‘না’ ভোটের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। সে কারণে ‘না’-কে জয়যুক্ত করার তৎপরতা বিপ্লববিরোধী অপচেষ্টা।

‘না’-এর পেছনের শক্তি কারা? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখানে। কারা ‘না’-কে জয়যুক্ত করতে চায়? খেয়াল করলে একটি মিল পাওয়া যায়। এসব শক্তি সবাই কোনো না কোনোভাবে পতিত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সমর্থক ছিল। কেউ সরাসরি। কেউ নীরবে। কেউ সুবিধাভোগী হিসেবে। তারা তখন ভোট ডাকাতিকে বৈধতা দিয়েছিল। গুম-খুনের প্রতিবাদ করেনি। অপশাসনের সাথে আপস করেছিল।

আজ তারা নতুন মুখোশে হাজির। তাদের লক্ষ্য একটাই– জুলাইবিপ্লবকে ব্যর্থ প্রমাণ করা। ‘না’ জিতলে তারা বলবেÑ দেখুন, জনগণ সংস্কার চায়নি। বিপ্লব ছিল ভুল। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, এটি শুধু একটি গণভোট নয়; এটি ইতিহাসের রায়।

আরেকটি প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসছে। গণভোট নিয়ে কিছু রাজনৈতিক দল কী ইচ্ছাকৃতভাবে ‘গ্রে জোনে’ থাকতে চায়? উত্তরটা সোজা। হ্যাঁ, চায়। কারণ ‘হ্যাঁ’ বললে দায় নিতে হয়। ‘না’ বললে ঝুঁকি নিতে হয়। আর চুপ থাকলেÑ দুই দিকই খোলা থাকে।

এই ‘গ্রে জোন’ রাজনীতি নতুন নয়। এটি সুবিধাবাদী রাজনীতির পুরনো কৌশল। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জুয়ান লিনজ লিখেছিলেন, ‘সঙ্কটকালে অস্পষ্টতা গণতন্ত্রকে রক্ষা করে না; বরং কর্তৃত্ববাদকে সুযোগ দেয়’। ইতিহাস বলে– বিপ্লবের সময় যারা স্পষ্ট অবস্থান নেয় না, পরবর্তীতে তারাই বিপ্লবের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

এই গ্রে জোন নিরপেক্ষতা নয়। এটি সুবিধাবাদ। এটি অপেক্ষার রাজনীতি। হাওয়া কোন দিকে বইবে, তাই দেখে অবস্থান নেয়ার অপকৌশল। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এ অপকৌশল নতুন নয়। অতীতেও দেখা গেছে, সঙ্কটের মুহূর্তে কিছু শক্তি স্পষ্ট অবস্থান না নিয়ে সময় পার করেছে। পরে সুবিধাজনক জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে।

কিন্তু জুলাইবিপ্লব-পরবর্তী বাস্তবতায় এ কৌশল ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এখানে প্রশ্নটি আর ক্ষমতার ভাগাভাগির নয়। প্রশ্নটি হচ্ছে– আপনি বিপ্লবের পক্ষে, না বিপ্লবের বিপক্ষে। মাঝামাঝি কোনো জায়গা নেই।

বাংলাদেশের বাস্তবতা এক জায়গায় বদলে গেছে। তরুণরা এখন রাজনীতির ভরকেন্দ্র। জুলাইবিপ্লব ছিল মূলত তরুণদের বিদ্রোহ। তাদের রক্তে লেখা ইতিহাস।

তরুণরা রাজনীতি বোঝেন ভিন্নভাবে। তারা ধোঁয়াশা পছন্দ করেন না। স্পষ্টতা চান। কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠী যদি এ মুহূর্তে ‘না’-এর পক্ষে যায়, অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে অস্পষ্ট থাকে, তরুণদের চোখে তারা স্বাভাবিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হবে। এমনকি খলচরিত্রে পরিণত হবে। কারণ তরুণদের কাছে গণভোট শুধু একটি ভোট নয়। এটি তাদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের প্রশ্ন। সেই সাথে একটি গভীর আশঙ্কাও তৈরি হবে– ফ্যাসিবাদ কি আবার ফিরে আসতে পারে?

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল হান্টিংটন বলেছেন, ‘যে বিপ্লব নতুন প্রজন্মের সমর্থন হারায়, সে বিপ্লব টিকে থাকতে পারে না।’ বিপ্লব কোনো এক দিনের ঘটনা নয়। এটি একটি প্রক্রিয়া। একটি দীর্ঘ, জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা। শাসকের পতন দিয়ে বিপ্লব শুরু হয়। কিন্তু সেখানে শেষ হয় না; বরং সেখান থেকে আসল পরীক্ষা শুরু হয়।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা একমত– বিপ্লবের সবচেয়ে বিপজ্জনক সময় হলো রূপান্তর পর্ব। এ সময় পুরনো ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। নতুন ব্যবস্থা তখনো পুরোপুরি দাঁড়ায় না। এই শূন্য স্থানে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি মাথা তোলে। বিভ্রান্তি ছড়ায়। প্রশ্ন তোলে। সন্দেহ তৈরি করে।

ফরাসিবিপ্লব তার উদাহরণ। রাজা পালালেন; কিন্তু বিপ্লব টেকেনি সহজে। বহুবার পুরনো শক্তি ফিরে আসতে চেয়েছে। আরব বসন্ত আরেকটি জ্বলন্ত উদাহরণ। জনগণ রাস্তায় নেমেছিল। স্বৈরশাসক পালিয়েছিল। কিন্তু রূপান্তর ব্যর্থ হওয়ায় অনেক দেশে স্বৈরতন্ত্র ফিরেছে নতুন নামে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল হান্টিংটন বলেছিলেন, বিপ্লব সফল হয় তখনই, যখন তা নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে। শুধু শাসক বদলালে হয় না। রাষ্ট্রের কাঠামো বদলাতে হয়। নিয়ম বদলাতে হয়। ক্ষমতার ভারসাম্য নতুনভাবে স্থাপন করতে হয়।

জুলাইবিপ্লবও সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। পতিত ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার অবসান হয়েছে। কিন্তু বিপ্লবের পরিণতি এখনো নির্ধারিত নয়। সেটি নির্ধারিত হবে রূপান্তরের মাধ্যমে। সংস্কারের মাধ্যমে। গণতান্ত্রিক সম্মতির মাধ্যমে। এ পর্যায়ে সিদ্ধান্তহীনতা মানে বিপদ। অস্পষ্টতা মানে সুযোগ। যারা বিপ্লব চায়নি, তারা এ সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। তারা সরাসরি আঘাত করে না। প্রশ্ন তোলে। প্রক্রিয়াকে সন্দেহের মুখে ফেলে। বিপ্লবকে ক্লান্ত করে।

গণভোট এই রূপান্তরের অংশ। এটি কেবল একটি ভোট নয়। এটি বিপ্লবকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার প্রয়াস। এখানে ব্যর্থতা মানে একটি সুযোগ হারানো নয়। এর মানে হলো– ইতিহাসকে আবার পেছনে ঠেলে দেয়া। বিপ্লব হয় সাহস দিয়ে; কিন্তু টিকে থাকে সিদ্ধান্ত দিয়ে।

এই গণভোট কোনো দলকে জেতানোর জন্য নয়। এটি একটি সময়কে বৈধতা দেয়ার প্রশ্ন। ‘হ্যাঁ’ মানে রাষ্ট্র সংস্কার। ‘হ্যাঁ’ মানে জুলাইবিপ্লবের স্বীকৃতি। ‘হ্যাঁ’ মানে ভবিষ্যতের দিকে এগোনো। ‘না’ মানে অতীতের ছায়া। ফ্যাসিবাদ ফেরার আশঙ্কা। এখানে নিরপেক্ষ থাকার সুযোগ নেই। এখানে চুপ থাকার বিলাস নেই। গ্রে জোনে থাকার অবকাশ নেই। ইতিহাস এখানে অবস্থান চাইছে। ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। বিশেষ করে যারা সিদ্ধান্তের মুহূর্তে দায় এড়িয়ে চলে। এই বাস্তবতায় জনগণ এবং রাজনৈতিক দলের কাছে প্রশ্ন একটিই– আপনি কোন পক্ষে?

লেখক : অ্যাংকর, টকশো ‘আগামীর বাংলাদেশ’, বিটিভি