স্বপ্ন ও সম্ভাবনায় উদ্ভাসিত বাংলাদেশ : এক নতুন ভোরের প্রতীক্ষা

এই নির্বাচন তাই কেবল আরেকটি ভোট নয়; এটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের এক সন্ধিক্ষণ। এই নির্বাচন হোক গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণের প্রতীক, ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রগঠনের সূচনা এবং স্বপ্ন ও সম্ভাবনায় উদ্ভাসিত এক নতুন বাংলাদেশের পথচলা।

ব্যারিস্টার হামিদ হোসাইন আজাদ
২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক আবহ কাছ থেকে দেখার উদ্দেশ্যে সম্প্রতি এক সপ্তাহের বাংলাদেশ সফর করি। এই অল্প সময়েই ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রংপুর ও কুড়িগ্রাম—পাঁচটি জেলার নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের সাথে কথা বলার সুযোগ হয়। নারী-পুরুষ, তরুণ-বৃদ্ধ, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, শ্রমজীবী—সবাই যেন এক অদৃশ্য প্রত্যাশায় উজ্জীবিত। তাদের কথায়, চোখে-মুখে এবং জনসমাবেশের আবহে স্পষ্ট—জাতি আজ এক নতুন ভোরের অপেক্ষায়।

এবারের নির্বাচন সাম্প্রতিক সময়ের যে কোনো নির্বাচনের তুলনায় ব্যতিক্রমী ও ঐতিহাসিক। দীর্ঘ প্রায় সতেরো বছরের এক দমনমূলক ও কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার অবসানের পর মানুষ এমন এক নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে, যাকে তারা প্রকৃত অর্থেই অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বলে মনে করছে। অতীতের সাজানো নির্বাচন ও ভোটাধিকারবঞ্চনার অভিজ্ঞতা জনগণের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। ফলে এবারের ভোট কেবল সরকার পরিবর্তনের প্রক্রিয়া নয়—এটি তাদের কাছে মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও অধিকার পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম।

বিগত বছরগুলোর মানবাধিকার লঙ্ঘনের স্মৃতি এখনো তাজা। জোরপূর্বক গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, ভয়ের সংস্কৃতি—এসব কাহিনি অসংখ্য পরিবারকে বিপর্যস্ত করেছে। অনেকেই হারানো স্বজনের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়েছেন। তাই এই নির্বাচনকে অনেকে দেখছেন দায়মুক্তির সংস্কৃতির অবসান, আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গঠনের ঐতিহাসিক সুযোগ হিসেবে।

এবারের নির্বাচনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিপুলসংখ্যক নতুন ভোটার। চার কোটিরও বেশি তরুণ-তরুণী প্রথমবারের মতো ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে যাচ্ছে। এই প্রজন্ম রাজনীতিতে পুরোনো বাগাড়ম্বর বা পেশিশক্তির সংস্কৃতি প্রত্যাখ্যান করে দক্ষতা, সততা ও নৈতিক নেতৃত্বের দাবি তুলছে। তাদের কাছে রাজনীতি মানে উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, স্বচ্ছতা ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখছে। এখন জনমত গড়ে উঠছে দ্রুত, তথ্য ছড়াচ্ছে মুহূর্তে। ফলে নির্বাচন ক্রমেই শক্তিপ্রদর্শনের বদলে ধারণা ও নীতির প্রতিযোগিতায় রূপ নিচ্ছে। তরুণদের এই ডিজিটাল সম্পৃক্ততা গণতন্ত্রকে নতুন মাত্রা দিচ্ছে।

দেশজুড়ে মানুষ পরিবারকেন্দ্রিক ও গোষ্ঠীনির্ভর রাজনীতিতে ক্লান্ত। তাদের অভিযোগ—প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো এখনো পুরোনো কৌশল, অর্থবল ও প্রভাবের রাজনীতির ওপর নির্ভরশীল। এতে রাজনৈতিক স্থবিরতা তৈরি হয়েছে এবং নতুন প্রজন্মের সাথে সংযোগ দুর্বল হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। বিশেষ করে তরুণদের একাংশের মধ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে একটি সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে দেখার প্রবণতা লক্ষ্য করেছি। দলের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান ও সংগঠিত কাঠামো তাদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। একই সাথে অনেকেই গণতন্ত্রপন্থী শক্তিগুলোর মধ্যে বৃহত্তর ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন।

অন্যদিকে, বিএনপির প্রতি একধরনের হতাশাও চোখে পড়েছে। নেতৃত্বের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা ও কৌশলগত প্রস্তুতির অভাব নিয়ে ভোটারদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। তারা বিশ্বাসযোগ্য ও কার্যকর নেতৃত্ব খুঁজছে, যে নেতৃত্ব ভবিষ্যতের রূপরেখা স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে পারবে।

তবে সামগ্রিকভাবে নির্বাচন ঘিরে পরিবেশ তুলনামূলক শান্ত ও উৎসবমুখর। দীর্ঘদিন পর মানুষ মুক্তভাবে মত প্রকাশ করছে, সভা-সমাবেশ করছে, ভোট নিয়ে আলোচনা করছে। এটি গণতান্ত্রিক চর্চার ইতিবাচক লক্ষণ।

সব মিলিয়ে মনে হয়েছে, বাংলাদেশ এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক রূপান্তরের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। মানুষের প্রত্যাশা খুব স্পষ্ট—দুর্নীতিমুক্ত শাসন, মানবাধিকারের সুরক্ষা, কার্যকর জবাবদিহিতা এবং সবার অংশগ্রহণে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা। তারা এমন একটি বাংলাদেশ চায়, যেখানে তরুণ, নারী, সংখ্যালঘু, গ্রাম-শহরের মানুষ—সবাই সমানভাবে প্রতিনিধিত্ব পাবে।

এই নির্বাচন তাই কেবল আরেকটি ভোট নয়; এটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের এক সন্ধিক্ষণ। এই নির্বাচন হোক গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণের প্রতীক, ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রগঠনের সূচনা এবং স্বপ্ন ও সম্ভাবনায় উদ্ভাসিত এক নতুন বাংলাদেশের পথচলা।