অচেনা চৈত্র ও হাওরে জলাবদ্ধতা

আমাদের মনে রাখতে হবে, হাওরের পরিবেশ, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য অন্য সাধারণ এলাকার মতো নয়। তাই ওখানকার মানুষ বাঁচাতে হলে এর জন্য আলাদা ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা দরকার। সে জন্য হাওর নিয়ে গবেষণা করতে হবে, ভবিষ্যতের কথা ভেবে পরিকল্পনামাফিক বাঁধ নির্মাণ করতে হবে।

মো: শাহাদত হোসেন

চৈত্র মাস উষ্ণতম। বাংলায় বিখ্যাত প্রবচন আছে- ‘চৈত্র মাসের গরমে কুত্তা পানিত নামে’। প্রচণ্ড খরতাপে মাঠঘাট শুকিয়ে যায়, মানুষ বৃষ্টির জন্য হাহাকার করে। এ সময় অনেক শহুরে মানুষ এসি কামরায় আর গ্রামের মানুষ গাছতলায় বসে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। এটিই বাংলাদেশের চৈত্র-বৈশাখ।

কিন্তু ২০২৬ সালের চৈত্র অনেকটাই অচেনা। গত ক’দিন ধরে বর্ষার মতো টানা বৃষ্টি হচ্ছে। ইতোমধ্যে হাওরে বৃষ্টির পানি জমে ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। কৃষকের হাসি গত কয়েক দিনের বৃষ্টিতে কান্নায় পরিণত হয়েছে। বন্যা নয়, জলাবদ্ধতায় কৃষকের সব স্বপ্ন-সুখ ডুবে যাচ্ছে। সাধারণত কয়েক বছর পর পরই হাওরাঞ্চলের কৃষককে এমন অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়।

প্রকৃতি নিজস্ব নিয়মে চলে। এ যেমন মানুষের জীবনে নানা প্রতিকূলতা সৃষ্টি করে, তেমনি দুরবস্থা থেকে উত্তরণের পথও ঠিক করে দেয়। তাই হাওরে যত দিন মানুষের আঘাত পড়েনি, তত দিন জলাবদ্ধতা নিরসনেও তেমন সমস্যা হয়নি। অতীতেও আগাম বৃষ্টি হয়েছে, চৈত্র-বৈশাখ মাসে হাওরে পানি জমেছে। কিন্তু নিষ্কাশন খাল দিয়ে সে পানি নদীতে নেমেও গেছে। ফলে ফসলের বড় ক্ষতি হয়নি। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হাওরে ফসলরক্ষা বাঁধের নামে অপরিকল্পিত ও অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বাঁধ নির্মাণের কারণে জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। শক্ত ও ব্যয়বহুল বাঁধ, অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে হাওরে জমা পানি বের হতে পারছে না। এতে ধানের জমি ডুবে কৃষকের ক্ষতি হচ্ছে।

হাওর যেহেতু নিম্ন জলাভূমি, তাই ফসল রক্ষায় বাঁধ তৈরি করা অপরিহার্য। কিন্তু এসব বাঁধ হতে হবে পরিকল্পিত ও বিজ্ঞানসম্মত; যতটা সম্ভব হাওরের ক্ষতি কম করে। বর্তমানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অর্থায়নে মাটির বাঁধ নির্মাণ করা হয়। হাওরের যেসব এলাকা নদীর কাছাকাছি, সেসব এলাকায় বাঁধ দেয়া হয়, যেন বন্যার পানি ঢুকতে না পারে। তবে এসব বাঁধের মাটি আনা হয় ‘কান্দা’ বা শক্ত জায়গা থেকে। এভাবে মাটি আনায় কান্দার মতো নিরাপদ জায়গাও দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। অতীতের নিরাপদ এসব কান্দা দিয়েও পানি ঢুকে ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এভাবে আরো কয়েক বছর মাটির বাঁধ দেয়া হলে অনিরাপদ হয়ে যাবে হাওর। এতে ফসলরক্ষা বাঁধের খরচও বাড়বে। বাঁধ তৈরির জন্য মাটিও হয়তো পাওয়া যাবে না।

হাওররক্ষা বাঁধগুলো বর্ষায় পানিতে যখন তলিয়ে যায়, তখন বাঁধের মাটি কেটে জমি এবং নদীতে জমা হয়। এতে হাওর ও নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে পানি নিষ্কাশনের ক্ষমতা কমে যায়, বন্যার শঙ্কা বাড়ে। শুধু তাই নয়, ‘কান্দা’ থেকে মাটি কাটায় হাওরের স্বাভাবিক পরিবেশ বিনষ্ট হচ্ছে। জীববৈচিত্র্য নষ্ট হচ্ছে। গাছপালা কমে যাচ্ছে। গরুর চারণভূমি কমছে। মাছ ও জলজ উদ্ভিদের ক্ষতি হচ্ছে।

এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য পরিকল্পিত ও বিজ্ঞানসম্মত বাঁধ নির্মাণের উপর জোর দিয়ে আসছেন বিশেষজ্ঞদের অনেকে। সে ক্ষেত্রে মাটির বাঁধের পরিবর্তে কংক্রিটের স্থায়ী বাঁধ বানানোর কথা বলছেন তারা। কংক্রিটের বাঁধ রাস্তা হিসেবেও ব্যবহার করা সম্ভব। তবে বাঁধে ঘন ঘন কালভার্ট রাখার পরামর্শ দিয়েছেন তারা, যেনব পানি নিষ্কাশনে সমস্যা না হয়। নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকলে কংক্রিটের বাঁধ সুফলের পরিবর্তে কুফল বয়ে আনবে। তবে তাদের এই পরামর্শ কতটা পরিবেশবান্ধব ও জলবায়ু সহিষ্ণু, সেটিও ভেবে দেখতে হবে। কোনো অপরিপক্ব সিদ্ধান্ত নতুন করে বিপদ ডেকে আনুক, সেটি কাম্য নয়।

আমাদের মনে রাখতে হবে, হাওরের পরিবেশ, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য অন্য সাধারণ এলাকার মতো নয়। তাই ওখানকার মানুষ বাঁচাতে হলে এর জন্য আলাদা ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা দরকার। সে জন্য হাওর নিয়ে গবেষণা করতে হবে, ভবিষ্যতের কথা ভেবে পরিকল্পনামাফিক বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদফতর যে ভূমিকা রাখার কথা ছিল, সেটি রাখতে পারেনি। এখন সংস্থাটিকে কার্যকর ও শক্তিশালী করে হাওরের মানুষের উন্নয়নে কাজে লাগানো আবশ্যক। সংস্থাটির পরিকল্পনা তৈরিতে যেন অভিজ্ঞ মানুষের অংশগ্রহণ থাকে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক : অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, গুরুদয়াল সরকারি কলেজ, কিশোরগঞ্জ
[email protected]