মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার একতরফা ও হটকারি নীতির মাধ্যমে বিশ্বব্যবস্থা তছনছ করে দিচ্ছেন। বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থা উল্টে দেয়া থেকে শুরু করে পশ্চিম গোলার্ধ এবং তার বাইরে সামরিক হামলা চালানো পর্যন্ত তিনি আন্তর্জাতিক আইন এবং অন্যান্য জাতির সার্বভৌমত্বের প্রতি অবজ্ঞা দেখিয়েছেন। যিনি যুদ্ধ না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তার আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ এবং বাগাড়ম্বর বিপরীত ইঙ্গিত দিচ্ছে।
‘ট্রাম্পের আমেরিকা ফার্স্ট’ পররাষ্ট্রনীতির অর্থ হলো, অন্যদের ওপর চড়াও হওয়া। ট্রাম্পের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ স্টিফেন মিলার ট্রাম্পের বিশ্ব দৃষ্টির বর্ণনা করে বলেন, ‘আমরা এমন এক বিশ্বে বাস করি যা শক্তি দিয়ে পরিচালিত হয়। এর অর্থ হলো, জোর যার মুল্লুক তার।
নিশ্চিতভাবেই ট্রাম্প এমন একটি পরিবেশে কাজ করছেন, সেখানে বিশ্বব্যবস্থা ইতোমধ্যেই ভেঙে পড়েছে এবং আন্তর্জাতিক নিয়ম ও রীতিনীতির প্রতি বৃহৎ ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ক্রমবর্ধমান অবজ্ঞা রয়েছে। ‘জোর যার মুল্লুক তার’ তথা ‘শক্তিই সঠিক’ পদ্ধতি অনুসরণের মাধ্যমে কিছু দেশের সামরিক শক্তির ব্যবস্থার খুব সাধারণ ব্যাপার হয়ে উঠেছে। ট্রাম্প এই প্রবণতাগুলোকে আরো শক্তিশালী বা তীক্ষ্ণ করছেন এবং বিশ্বকে আইনহীনতার দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। তিনি ক্রমবর্ধমান সংখ্যক দেশের এই আচরণের দিকেও ইঙ্গিত করেছিলেন যে, ‘এরা অন্য দেশ আক্রমণ করতে পারে, সমগ্র সমাজের ক্ষতি করতে পারে’ এবং ‘আন্তর্জাতিক আইনের ব্যাপারে নাক গলায়।’ তিনি বলেন, ‘দায়মুক্তির যুগ’ সর্বত্র। অবশ্যই তিনি সঠিক কথা বলেছেন, এই দায়মুক্তির যুগ কেবল ভেনিজুয়েলায় মার্কিন আক্রমণ এবং ইরানে বোমা হামলায় প্রতিফলিত হয়নি; বরং গাজায় ইসরাইলি গণহত্যা, প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর তাদের সামরিক আক্রমণ, ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলা এবং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের সামরিক হামলার মাধ্যমেও প্রতিফলিত হয়েছে। এই শক্তিগুলোকে আন্তর্জাতিক জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হয়নি।
বহুপাক্ষিকতা এবং বহুপক্ষীয় সংস্থাগুলো এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চাপের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু বৃহৎ শক্তিগুলোর মনোভাব, বিশেষ করে ট্রাম্পের আচরণ, এই প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করেছে এবং চাপ আরো বাড়িয়ে তুলেছে। সঙ্ঘাত বন্ধে ব্যর্থতা জাতিসঙ্ঘের অকার্যকরতা স্পষ্ট করে তুলেছে। তবে এটি ঠিক যে, বৃহৎ শক্তিগুলোর স্বার্থের সঙ্ঘাতের কারণে জাতিসঙ্ঘ তার মূল দায়িত্ব পালনে অক্ষম হয়ে পড়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা রেকর্ড নিম্নে পৌঁছেছে। জাতিসঙ্ঘের ৩১টি সংস্থাসহ ৬৬টি আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক প্রত্যাহার বিশ্বব্যবস্থার জন্য আরেকটি বড় ধাক্কা।
বিশ্ব এখন ‘নতুন মহা খেলার’ যুগে প্রবেশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে তীব্র সম্পদের লড়াই। এটি প্রতিফলিত হয় বিরল মৃত্তিকা এবং সেমি-কন্ডাক্টর এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পদার্থ নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের প্রতিযোগিতায়। এ ক্ষেত্রে ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে চীনের সাথে তাল মিলিয়ে চলার চেষ্টা করছে। অথচ চীন কয়েক দশক ধরে এই খাতে কৌশলগত বিনিয়োগ করে একটি ভার্র্চুয়াল একচেটিয়া প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছে। গত বছর তারা মার্কিন শুল্ক আরোপের বিরুদ্ধে বিরল মৃত্তিকার বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে তার লিভারেজ ব্যবহার করেছিল। যার ফলে ওয়াশিংটন শুল্ক কমাতে বাধ্য হয়।
ট্রাম্প প্রশাসন এখন সরবরাহের বিকল্প উৎস তৈরি করে চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে চায়। তারা কঙ্গোর সাথে খনিজ চুক্তি করেছে। সম্পদের এই লড়াই কেবল খনিজ সম্পদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ভেনিজুয়েলায় ট্রাম্প যে কর্তৃত্ববাদী পদক্ষেপ নিয়েছেন তাতে প্রযুক্তি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। বিশেষত ট্রাম্প ইতোমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছেন, দেশটির তেল সম্পদ তারাই নিয়ন্ত্রণ করবে। এটি অতীতের দিকে ফিরে যাওয়া। অতীতে ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো সম্পদের জন্য প্রতিযোগিতা করত এবং দখলকৃত দেশের সম্পদ লুটের নানা ফন্দিফিকির করত।
মধ্যপ্রাচ্য এখনো সঙ্ঘাত এবং অস্থিরতার অঞ্চল। ট্রাম্পের তথাকথিত শান্তি পরিকল্পনার অধীনে সাময়িকভাবে স্থগিত হওয়া গাজায় ইসরাইলের গণহত্যা আপাতত বন্ধ । এই অঞ্চলটি আঞ্চলিক আধিপত্যের জন্য এখন একটি উচ্চবাজির প্রতিযোগিতার সাক্ষী। গাজায় শান্তির নামে ট্রাম্প নানা খেলা খেলছেন। সৌদি আরব এবং ইরানের মধ্যে আগের পুরনো দ্বন্দ্বের বাইরেও মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে এখন প্রতিযোগিতা ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। এমন দেশ তাদের আঞ্চলিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন ফ্রন্টে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রক্সিযুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে সঙ্ঘাত ইয়েমেনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। দু’টি দেশ সুদানে বিভিন্ন পক্ষকে সমর্থন করে এবং লিবিয়া ও সিরিয়ায় তাদের ভিন্ন স্বার্থ রয়েছে। ইসরাইলের সাথে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় আরেকটি মাত্রা যোগ করেছে।
সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের ক্ষমতার লড়াই, সর্বোপরি কোন দেশ প্রধান বাণিজ্য ও বিনিয়োগ কেন্দ্র হবে, সেটি নিয়ে রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলছে। সৌদি আরব আমিরাতের আঞ্চলিক শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য মিসর এবং সোমালিয়ার সাথে সামরিক চুক্তির পরিকল্পনা করছে। তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা তৈরি করছে।
ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং ভূ-অর্থনৈতিক দ্বন্দ্বে বিশ্ব এক বিশৃঙ্খল পরিস্থতির দিকে ধাবিত হচ্ছে।
লেখক : যুগ্ম বার্তা সম্পাদক, নয়া দিগন্ত



