বাতাস বুঝে তরী বাও হে মাঝি

মাঝি নাও ছাইড়া দিছে, ও মাঝি পাল উড়াইয়া দিছে। তেরোতম জাতীয় সংসদের তরী নোঙর তুলে দিয়েছে কয়েকমাস আগে। ঘাট ছেড়ে রওনা হয়ে গেছে। এবার পাড়ি দিতে হবে ভরা গাঙ। সংসদে বিএনপির ঘটে আছে সুপার মেজরিটি– তিন ভাগের দুই ভাগেরও বেশি আসন। আছে আত্মবিশ্বাস। বাতাস বইছে বিএনপির অনুকূলে। পাল উড়ছে পতপত করে...

ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি করা হয়েছে
ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি করা হয়েছে

সাদামাটা কিছু সত্য আছে, সবাই জানি। এগুলো যে চিরন্তন সত্য, তা-ও জানি। তার পরও মানার সময় সত্যগুলো এড়িয়ে যেতে চাই। ‘অহঙ্কার পতনের মূল’, জেনেও বুক ফুলিয়ে অহঙ্কার করি। কেন এমন হয়?

আসলে আরামের মিথ্যাগুলো থেকে বের হয়ে আসতে ভয় পাই আমরা। কেউ যদি একচেটিয়া ক্ষমতা পেয়ে যান, সেটি তার জন্য আরামের। একটু আরাম পেলে আরো আরামের চাহিদা বাড়ে। বাড়তে বাড়তে সেটি যে কোথায় গিয়ে ঠেকে, সত্যের মুখোমুখি হওয়ার আগে টের পাওয়া যায় না।

সত্য কতটা নির্মম, সেটি এখন হারে হারে টের পাচ্ছেন শেখ হাসিনা। বাংলাদেশে তার জন্য অপেক্ষা করছে ফাঁসির দড়ি। আর যে দেশে আশ্রয় নিয়েছেন, সেখানে কি তিনি ভালো আছেন?

তিনি যে ভালো নেই, কেন ভালো নেই, মাত্র বছর দুয়েকের ব্যবধানে এ সত্যও ভুলতে বসেছি আমরা। আহা কত না বিশেষণ পেতেন তিনি– দেশরত্ন, গণতন্ত্রের মানসকন্যা, মাদার অব হিউম্যানিটি। এমনকি শেষে কওমি জননী উপাধি পর্যন্ত বাগিয়ে নিয়েছিলেন শেখ হাসিনা।

এত উপাধি নেয়ার রোগ শেখ হাসিনার কেন হয়েছিল, সেটি কি ভেবে দেখেছেন?

মূলত এর পেছনে কাজ করেছে, তার একচেটিয়া ক্ষমতা। অবৈধ হলেও জাতীয় সংসদে তার ছিল ব্রুট মেজরিটি। শেখ হাসিনা বরাবর উপাধিপাগল ছিলেন, তবে ব্রুট মেজরিটি তার পাগল পালে হাওয়া দিয়ে গেছে।

ব্রুট মেজরিটি পেয়েছিল চারদলীয় জোট সরকারও; কিন্তু সেই সরকারের হাল ধরে রেখেছিলেন দেশনেত্রী খালেদা জিয়া। উতল বাতাসে বেসামাল হওয়ার মতো প্রধানমন্ত্রী তিনি ছিলেন না। তারপরও তার ক্ষমতার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বাংলাদেশে সওয়ার হয়েছিল ‘ওয়ান ইলেভেন’। সেই থেকে শুরু অন্ধকারের। তারপর নেমে এলো ঘন ঘোর অন্ধকার।

আসলে ব্রুট মেজরিটির ইতিহাস খুব একটা সুখের নয়। ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ৯৭ শতাংশ আসন। পরে একদলীয় শাসনে চলে গিয়েছিল দেশ। ১৯৭৯ সালে ৩০০ আসনের মধ্যে ২০৭ আসনে জয় পায় বিএনপি। রাষ্ট্রপতি হন জিয়াউর রহমান। অল্পদিনের শাসনে দেশকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ছিলেন আধিপত্যবাদবিরোধী। সুশাসক হিসেবে জনপ্রিয় হওয়ার পরও তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তার সময় জাতীয় সংসদে ব্রুট মেজরিটি ছিল। এই মেজরিটি থেকে অনেকসময় অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস জন্মায়। এতে একজন নেতার অসতর্ক হওয়াটা স্বাভাবিক। সেনাবাহিনীর ভেতরে থাকা কুচক্রীদের ব্যাপারে অসতর্ক ছিলেন রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমান। এর সুযোগে তাকে হত্যা করার মতো ট্র্যাজিক ঘটনাটি ঘটতে পেরেছে।

১৯৮৮ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির ২৫১ আসন ছিল। এর পরিণতি কী হয়েছে, তা সবার জানা। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ পরিণত হয়েছিলেন স্বৈরাচারে। নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে তার পতন হয়।

২০০৮ সালে ওয়ান ইলেভেন সরকারের কারসাজিতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে থাকা মহাজোটকে দেয়া হয় ২৬৩ আসন। আওয়ামী লীগ এককভাবে পায় ২৩০। এক দিকে ব্রুট মেজরিটির গরম, অন্য দিকে আধিপত্যবাদী শক্তির সমর্থন নিয়ে নিকৃষ্ট শাসন কায়েম করেন শেখ হাসিনা। দেশ চলে যায় ভয়াবহ ফ্যাসিবাদের কবলে। সেই ফ্যাসিবাদের পতন হয় ২০২৪ সালে। শেখ হাসিনাকে পালিয়ে যেতে হয় ভারতে।

সুতরাং বাতাস বুঝে তরী বাও হে মাঝি।

মাঝি নাও ছাইড়া দিছে, ও মাঝি পাল উড়াইয়া দিছে। তেরোতম জাতীয় সংসদের তরী নোঙর তুলে দিয়েছে কয়েকমাস আগে। ঘাট ছেড়ে রওনা হয়ে গেছে। এবার পাড়ি দিতে হবে ভরা গাঙ। সংসদে বিএনপির ঘটে আছে ব্রুট মেজরিটি– তিন ভাগের দুই ভাগেরও বেশি আসন। আছে আত্মবিশ্বাস। বাতাস বইছে বিএনপির অনুকূলে। পাল উড়ছে পতপত করে।

ও মাঝি, তোমার পাল যে বাংলাদেশের পতাকা। এই পতাকায় আমাদের অস্তিত্ব। ভরা গাঙে আমরা আমাদের অস্তিত্ব নিয়ে ডুবে যেতে চাই না। হাল ধরো শক্ত হাতে।

তেরোতম সংসদের মাঝি বিএনপি। এই সংসদে মোট ৩০০ আসনের মধ্যে দলটির নেতৃত্বে থাকা জোট পেয়েছে ২১৩ আসন। জামায়াত পেয়েছে ৬৮ এবং এনসিপি ৬ আসন। বাকিরা নির্বাচিত হয়েছেন স্বতন্ত্র প্ল্যাটফর্ম থেকে। সম্প্রতি তিন শ’র সাথে সংরক্ষিত নারী আসনে যোগ হয়েছেন আরো পঞ্চাশ এমপি। তাদের মধ্যে ৩৬ জনই বিএনপির। জামায়াত জোটের ভাগে পড়েছিল ১৩ আসন। ছত্রিশের তুলনায় তেরো অনেক ছোট। তারপরও সেই ‘ছোট’ থেকে এনসিপিকে দিয়েছে দু’টি। অথচ বিএনপি বিশাল ভাণ্ডার থেকে বাইরের কোনো দক্ষ বা বিশেষজ্ঞ নারীকে সংরক্ষিত আসনে টেনে আনার প্রয়োজন মনে করেনি।

জামায়াত বাইরে আসন ভাগ করে দিয়েছে বলে বিএনপিকেও একই কাজ করতে হবে, সেটি নয়। এখানে মূল বিষয় উদারতা। বিএনপি অনেক ক্ষেত্রে উদারতা দেখাচ্ছে; কিন্তু রাজনীতির কঠিন সত্য হলো– ক্ষমতায় থাকলে এ ‘উদারতা’ শব্দটা অনেকসময় ফিকে হয়ে আসে। আসলে কোনটার কখন প্রয়োজন, ক্ষমতার চেয়ারে বসে বোঝা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ক্ষমতার এ গরমের একটি মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা আছে। মানুষের হাতে বেশি ক্ষমতা থাকলে তার মস্তিষ্কের ‘প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স’ শিথিল হয়ে যায়। মস্তিষ্কের এ অংশটি বিচার-বুদ্ধিসম্পন্ন, যাকে বলা হয় বিবেক। বিচার-বুদ্ধি শিথিল হয়ে গেলে মানুষ নিজেকে অপ্রতিরোধ্য ভাবতে শুরু করে, বদলে যায়। ওই সময় চার পাশে থাকা লোকজন বোঝাতে শুরু করেন, তিনি যা করছেন, ঠিক করছেন। এটি একটা মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ। এ ফাঁদ থেকে বাঁচতে সংযম রাখতে হয়। আর সমালোচনার পথ খোলা রাখতে হয়। কোনো গণমাধ্যম সরকারের সমালোচনা করল, এর মানে ওই গণমাধ্যমকে শত্রু হিসেবে গণ্য করা ঠিক নয়। ক্ষমতার গরম সামলানোর একমাত্র উপায় হলো– বিপক্ষ মতকে শ্রদ্ধা করা। নিজের ভেতর অতৃপ্তি রেখে দেয়া। আরো কিভাবে ভালো করা যায়, সেই দিকে হাঁটা।

জাতীয় সংসদে ব্রুট মেজরিটি পাওয়াটা দেখতে রাজমুকুটের মতো, আদতে সেটি বিশাল বোঝা। কারো কাঁধে পাহাড়ের মতো সমর্থন চেপে গেলে, পায়ের নিচের মাটি দেখা তার পক্ষে কঠিন হয়ে যায়। তিনি তখন মেঘের উপর দিয়ে হাঁটবেন বলে ঠিক করে ফেলেন। মেঘে পা ফেলতে গিয়ে বিভ্রমে পড়তে হয়। লোহা অতিরিক্ত গরম হলে নিজের ভারে নুইয়ে যায়। তারপর গলে পড়ে। কানে অহঙ্কারের পট্টি লাগানো থাকলে দীর্ঘশ্বাস শোনা যায় না। চাটুকারদের শোরগোলে হারিয়ে যায় প্রকৃত বন্ধুর কণ্ঠ। মানুষের সমর্থনের সাগর একটি দলকে ক্ষমতায় বসাতে পারে। আবার সেই সাগরের এক ঢেউ তীরে আছড়ে ফেলার ক্ষমতাও রাখে।

ক্ষমতা কারো জন্য স্থায়ী হয় না। তবে ক্ষমতার বোঝাকে বিনম্র দায়িত্ব হিসেবে নিলে সম্মানটা ধ্রুব হয়ে থাকে। রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমান এবং দেশনেত্রী খালেদা জিয়া মানুষের যে ভালোবাসা পেয়েছিলেন, সেটি এখনো টিকে আছে।

বিএনপি আজ যে আসনে বসে আছে, সেখান থেকে চাইলে পাহাড় সরিয়ে দিতে পারে। আবার চাইলে আইনের মারপ্যাঁচে উপেক্ষা করতে পারে জন-আকাঙ্ক্ষা। এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে তাদেরই- তারা কি বিগত সময়ে পতিত হয়ে যাওয়া শক্তির মতো ক্ষমতা দীর্ঘ করতে চান, নাকি মানুষের কল্যাণে কাজ করে সম্মান ধ্রুব করে রাখতে চান।

দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় ছিলেন মার্গারেট থ্যাচার। তিনি ‘আয়রন লেডি’ হিসেবে পরিচিত। তার পরিচয়ের সাথে ‘আয়রন’-এর মতো কঠিন তকমা কেন এলো? তকমাটা আসলে তার জন্য ইতিবাচক, নাকি নেতিবাচক?

মার্গারেট থ্যাচার টানা এগারো বছর টিকে ছিলেন ব্রিটেনের গদিতে। তিনি ভালো করেছিলেন না মন্দ, সেটি নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। তবে লম্বা সময় ধরে ক্ষমতায় থাকায় এ তকমা পেয়েছেন। থ্যাচার শেষ পর্যন্ত নিজের দলের ভেতরের বিদ্রোহে ক্ষমতা হারিয়েছিলেন। বাইরের শত্রু নয়, ক্ষমতার অতিকেন্দ্রিকতা তাকে পতনের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। মার্গারেট থ্যাচার নিজেকে লোহা বানিয়েছিলেন ঠিকই; কিন্তু তিনি ভুলে গিয়েছিলেন- লোহা পুড়িয়ে বাঁকানো যায়।

‘শেখ হাসিনা’ একটি নাম, একটি রক্ত-মাংসের মানুষ। সেই সাথে স্বৈরতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী মানসিকতার প্রতীক। এনসিপি নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছিলেন– হাসিনা কোনো ব্যক্তি নয়, অনেকগুলো ফ্যাসিবাদী ধারণার সমষ্টি। ক্ষমতার কাঠামোগত পরিবর্তন না হলে যে কেউই ‘হাসিনা’ হয়ে উঠতে পারেন।

তরতর করে নাও বেয়ে চলতে থাকা যেকোনো মাঝি অহঙ্কারী হয়ে উঠতে পারেন। ভেবে বসতে পারেন– গাঙে কোনো ঝড় ওঠে না, কখনো উঠবেও না।

বিএনপির সামনে এখন আগুন-পরীক্ষা। হাতে থাকা ‘আয়রন’ দিয়ে আগামীর সমৃদ্ধি গড়ে তোলা সম্ভব। আবার নতুন করে শেকল বানানোও সম্ভব।

তেরোতম সংসদের এই তরীতে সওয়ার আছে বাংলাদেশের আঠারো কোটি মানুষ। আর গাঙের পানিতে তরীর হাল ধরে আছে বিএনপি। তাদের মনে রাখতে হবে– আজ যে বাতাস এই তরীকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। কাল সে ফিরে আসতে পারে বাউলা বাতাস হয়ে।

লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত

[email protected]