ছাত্র সংসদ নির্বাচনে শিবিরের জয় কী বার্তা দেয়

তরুণ প্রজন্ম ব্যালটের মাধ্যমে স্পষ্ট করে বলে দিয়েছে, তারা মালিক নয়, প্রতিনিধি চায়; তারা ভয় ও হুমকির রাজনীতি নয়; বরং অধিকার ও সম্মানের রাজনীতি চায়। ক্যাম্পাসে যে ভয়ের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা হয়েছিল বা ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ওপর আঘাত করা হয়েছিল, ব্যালটের মাধ্যমে তার চূড়ান্ত জবাব মিলেছে। এখন জাতীয় রাজনীতির কুশীলবরা এ রায় থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের শুধরে নেবেন, নাকি আবারো একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করে জনবিচ্ছিন্ন হবেন তা-ই এখন দেখার বিষয়।

মো: ওবায়দুল্লাহ

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলো সবসময় ক্ষমতার পালাবদলের সূতিকাগার হিসেবে কাজ করেছে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন কিংবা সাম্প্রতিক চব্বিশের জুলাই বিপ্লব সবখানে ছাত্ররাজনীতি ছিল অগ্রগণ্য। তবে দীর্ঘ দিন ছাত্র সংসদ নির্বাচনের অনুপস্থিতি ক্যাম্পাস রাজনীতিতে যে স্থবিরতা তৈরি করেছিল, সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলো তা ভেঙে দিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (জাকসু), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (রাকসু), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জকসু) এই পাঁচটি প্রধান বিদ্যাপীঠের ফল এবং সেখানে ইসলামী ছাত্রশিবিরের অভাবনীয় জয় কেবল ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক আলোচনা নয়; বরং আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের জন্ম দিয়েছে।

ক্যাম্পাসের এ ফল নিয়ে বর্তমানে দু’টি বিপরীতধর্মী ব্যাখ্যা প্রচলিত। একদল বিশ্লেষক মনে করেন, এটি জাতীয় নির্বাচনের ‘ট্রেলার’; অর্থাৎ ক্যাম্পাসে যা ঘটেছে, জাতীয় পর্যায়েও হুবহু তা-ই ঘটবে। অন্য দলের মতে, ক্যাম্পাসের পরিবেশ এবং জাতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন, তাই এর কোনো প্রভাব জাতীয় নির্বাচনে পড়বে না। তবে গভীর বিশ্লেষণে দেখা যায়, সত্যটি আসলে এ দুই প্রান্তের মাঝখানে। ছাত্র সংসদ নির্বাচন সরাসরি জাতীয় নির্বাচনের ফলের পূর্বাভাস না হলেও, এটি ভোটার মনস্তত্ত্বের পরিবর্তনের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং বিশ্বাসযোগ্য ‘ইঙ্গিত’। বিশেষ করে যখন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ক্যাম্পাসে একই ধরনের প্যাটার্ন দেখা যায়, তখন তাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলার সুযোগ থাকে না।

পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে পরিবর্তনের রূপরেখাটি আরো স্পষ্ট হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ৩৯ হাজার ৭৭৫ জন ভোটারের মধ্যে প্রায় ৭৮ শতাংশের অংশগ্রহণ প্রমাণ করে শিক্ষার্থীরা ভোটাধিকার প্রয়োগে কতটা উন্মুখ। ভিপি পদে ৪৫ প্রার্থীর লড়াই রাজনীতিতে একধরনের ‘উন্মুক্ত বাজার’ তৈরির ইঙ্গিত দিয়েছিল। অন্য দিকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চাকসু) ২৬টি পদের মধ্যে ২৪টিতে শিবিরের জয় একটি সুসংগঠিত শক্তির উত্থান প্রকাশ করে। তবে সেখানেও কোনো কোনো পদে জয়ের ব্যবধান ছিল মাত্র ২২ ভোট। অর্থাৎ ভোটাররা প্রতিটি পদে আলাদাভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করেছেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) নির্বাচনে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। সেখানে ভিপি পদে জিতেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী, জিএস পদে ছাত্রশিবির প্রার্থী। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যাল ছাত্র সংসদে (রাকসু) জিএস বাদে ভিপিসহ বেশির ভাগ পদে শিবির সমর্থিত প্রার্থীরা জিতেছেন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জকসু) ৬৬ শতাংশ ভোটার উপস্থিতিও একই কথা বলছে। মানুষ যদি মনে করেন তাদের ভোটে পরিবর্তনের সম্ভাবনা আছে, তবে তারা কেন্দ্রে যেতে দ্বিধা করেন না।

‘সেকেন্ড অর্ডার ইলেকশন’ ও ভোটার মনস্তত্ত্ব : রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রাইফ ও শমিট (১৯৮০) তাদের ‘সেকেন্ড অর্ডার ইলেকশন’ তত্ত্বে দেখিয়েছিলেন, যেসব নির্বাচন সরাসরি সরকার গঠন করে না, সেখানে ভোটাররা তুলনামূলক কম ঝুঁকিতে থেকে মুক্তভাবে ভোট দেন। এ সুযোগে তারা মূলধারার রাজনৈতিক শক্তিকে ‘শাস্তি’ দিতে বা নতুন কোনো শক্তিকে ‘পরীক্ষা’ করতে কুণ্ঠাবোধ করেন না। ক্যাম্পাসের এ জয়গুলোর পেছনে তিনটি প্রধান বার্তা লুকিয়ে আছে।

১. পুরনো রাজনীতির ব্র্যান্ড-ধস ও নেগেটিভ ভোটিং : ক্যাম্পাসে শিবিরের জয় মানে যে ভোটাররা সবাই রাতারাতি তাদের আদর্শে দীক্ষিত হয়েছেন, তা নয়। বরং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এটি ছিল ‘নেগেটিভ ভোটিং’। অর্থাৎ ভোটাররা আগের আমলের দখলদারি এবং বর্তমানের বিকল্পগুলোর অযোগ্যতার বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন। ডাকসু থেকে জকসু সবখানে দেখা গেছে, মূলধারার অনেক বড় দলের প্রতি একধরনের বিরাগ। বিশেষ করে ছাত্রদলের মতো বড় দলের ভোট যখন অনেক ক্ষেত্রে হাজারের নিচে নেমে আসে, তখন বুঝতে হবে সাধারণের কাছে সেই পুরনো রাজনীতির ‘ব্র্যান্ড ভ্যালু’ এখন প্রশ্নবিদ্ধ।

২. ছাত্রদলের কৌশলগত ভুল ও আচরণগত সঙ্কট : এ পরিবর্তনের নেপথ্যে ছাত্রদলের ধারাবাহিক ভুল কৌশল এবং আচরণগত বিচ্যুতি বড় ভূমিকা রেখেছে। দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থেকেও সাধারণ শিক্ষার্থীদের মনস্তত্ত্ব বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে। ক্যাম্পাসে ‘হিজাব’ বা ধর্মীয় পোশাক নিয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে যে ধরনের অসহিষ্ণু আচরণ বা ‘টানাহেঁচড়া’র অভিযোগ উঠেছে, তা সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে। আধুনিক রাজনীতির অন্যতম শর্ত হলো, ব্যক্তিগত পছন্দ ও ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা জানানো। ছাত্রদলের একাংশের এমন আচরণ তাদের একটি ‘অসহিষ্ণু’ শক্তি হিসেবে চিত্রিত করেছে।

পাশাপাশি, ক্যাম্পাসে ‘ভয়ের সংস্কৃতি’ ভাঙার প্রতিশ্রুতি দিয়ে মাঠে নামলেও, অনেক ক্ষেত্রে ছাত্রদলের কর্মীরা নিজেরা সেই পুরনো ভয়ের রাজত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়েছেন। দখলদারি বা সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর খবরদারির মানসিকতার পুনরাবৃত্তি ভোটারদের মনে সঙ্কেত দিয়েছে যে, ‘নাম বদলালেও কাজ বদলায়নি’। তরুণ ভোটাররা যখন দেখেন এক ভয়ের বদলে আরেক ভয়ের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে, তখন তারা সুশৃঙ্খল বিকল্পের দিকে ঝুঁকে পড়েন। এ আচরণগত সঙ্কট ছাত্রদলকে ব্যালট যুদ্ধে পিছিয়ে দিয়েছে।

৩. সংগঠিত শক্তি বনাম বিক্ষিপ্ত উপস্থিতি : রাজনীতিতে কেবল জনপ্রিয়তা যথেষ্ট নয়, মাঠপর্যায়ে শৃঙ্খলারও প্রয়োজন। শিবিরের দীর্ঘ দিনের নিভৃত সাংগঠনিক কাজ তাদের এ প্রতিযোগিতায় এগিয়ে দিয়েছে। বিপরীতে, অন্য দলগুলো কেবল লোক দেখানো জনপ্রিয়তার ওপর ভর করে চলতে চেয়ে ব্যর্থ হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রেও ১২ দশমিক ৭৬ কোটি ভোটারের বিশাল দেশে কেবল স্লোগান দিয়ে জেতা সম্ভব নয়; সেখানে মজবুত নেটওয়ার্ক না থাকলে জনপ্রিয় ঢেউও ব্যালটে রূপান্তরিত হয় না।

পরিবর্তনের আকাক্সক্ষা ও ‘সুইং ভোটার’ : ক্যাম্পাসের তথ্যে দেখা যায়, ভোটাররা এখন কোনো নির্দিষ্ট দল বা প্যানেলে আটকে নেই। তারা ব্যক্তি, পারফরম্যান্স এবং সংগঠনের অতীত আচরণ বিশ্লেষণ করছেন। জাহাঙ্গীরনগরে স্বতন্ত্র প্রার্থীকে ভিপি হিসেবে এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে জিএস পদে স্বতন্ত্র প্রার্থীকে নির্বাচিত করা এবং অন্য পদে দলীয় প্রার্থীকে বেছে নেয়া প্রমাণ করে, ভোটাররা কাউকে ‘ব্ল্যাঙ্ক চেক’ দিচ্ছেন না। জাতীয় নির্বাচনেও এই ‘সুইং ভোটার’ বা দোদুল্যমান ভোটাররা হবেন তুরুপের তাস।

১২ ফেব্রুয়ারি সামনে রেখে ১২ দশমিক ৭৬ কোটি ভোটারের এই দেশে যে পরিবর্তনের তীব্র আকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছে, ক্যাম্পাসের নির্বাচনগুলো ছিল তার এক ছোট পরিসরের সফল মহড়া। তরুণরা বুঝিয়ে দিয়েছেন, তারা আর ‘পেশিশক্তি’র রাজনীতিকে বৈধতা দিতে রাজি নন। তরুণ প্রজন্মের কাছে রাজনৈতিক দলের ইতিহাস বা বংশগৌরবের চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো তাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, শিক্ষার পরিবেশ এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার গ্যারান্টি কে দিচ্ছেন।

পরিশেষে বলা যায়, ক্যাম্পাসের ব্যালট বাক্স আসলে আমাদের এ বার্তাই দিচ্ছে, দেশের নাগরিকরা এখন আর কেবল ‘কে ক্ষমতায় যাবেন’ তা নিয়ে চিন্তিত নন; বরং ‘ক্ষমতায় গিয়ে তারা কেমন আচরণ করবেন’ তা নিয়ে বেশি সচেতন। ক্যাম্পাসে শিবিরের জয় মানে, কেবল একটি বিশেষ দলের জয় নয়, একই সাথে এটি বাংলাদেশের প্রচলিত এবং স্থবির রাজনীতির পরাজয়। জনগণের ভাষা বুঝতে না পারলে এবং নিজেদের ভেতরকার আধিপত্যবাদী মানসিকতা সংশোধন না করলে পুরনো রাজনীতির ধারক-বাহকরা খুব শিগগির ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবেন, এটি সহজে অনুমেয়।

তরুণ প্রজন্ম ব্যালটের মাধ্যমে স্পষ্ট করে বলে দিয়েছে, তারা মালিক নয়, প্রতিনিধি চায়; তারা ভয় ও হুমকির রাজনীতি নয়; বরং অধিকার ও সম্মানের রাজনীতি চায়। ক্যাম্পাসে যে ভয়ের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা হয়েছিল বা ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ওপর আঘাত করা হয়েছিল, ব্যালটের মাধ্যমে তার চূড়ান্ত জবাব মিলেছে। এখন জাতীয় রাজনীতির কুশীলবরা এ রায় থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের শুধরে নেবেন, নাকি আবারো একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করে জনবিচ্ছিন্ন হবেন তা-ই এখন দেখার বিষয়।

লেখক : যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন মিসিসিপিতে পলিটিক্যাল সায়েন্সে উচ্চ শিক্ষারত