খালেদা জিয়া : গণতান্ত্রিক বিশ্বাসের এক অমর অধ্যায়

খালেদা জিয়ার উত্তরাধিকারের এক অবমূল্যায়িত অথচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তার রাজনৈতিক উদারতা ও ন্যায়ের প্রতি দায়বদ্ধতা– যা দলীয় সীমার গণ্ডি ছাড়িয়ে বিস্তৃত ছিল। ভয় ও দমননীতির পরিবেশে, যখন তিনি নিজেই চরম হুমকির মুখে, তখনো তিনি অন্য রাজনৈতিক দলের নেতাদের ওপর সংঘটিত গুরুতর অন্যায়ের বিরুদ্ধে কণ্ঠ তুলেছেন। বিচারব্যবস্থাকে ব্যবহার করে ভিন্নমত দমনের যে প্রয়াস– যাকে অনেকেই বিচারিক হত্যাকাণ্ড হিসেবে দেখেছেন, তার তিনি প্রকাশ্য নিন্দা করেছেন। সে সময়ে এমন অবস্থান নেয়া ছিল অসাধারণ সাহসের পরিচয়

বেগম খালেদা জিয়া
বেগম খালেদা জিয়া |সংগৃহীত

হামিদ এইচ আজাদ

অত্যন্ত গভীর শোক ও বেদনার সাথে জাতি স্মরণ করছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক মহান ব্যক্তিত্ব, গণতন্ত্রের অন্যতম দৃঢ় কণ্ঠস্বর বেগম খালেদা জিয়াকে।

তার মৃত্যু শুধু একটি রাজনৈতিক যুগের অবসান নয়; এটি এমন এক সঙ্কটকালে জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি, যখন বাংলাদেশকে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল উদারচিত্ত, বিভাজনের ঊর্ধ্বে ওঠা, দূরদর্শী ও নৈতিক দৃঢ়তাসম্পন্ন নেতৃত্বের।

বিলম্বিত ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া সাহস, দৃঢ়তা ও নীতিনিষ্ঠ নেতৃত্বের এক অনন্য প্রতীক। তার পুরো রাজনৈতিক জীবন ছিল কর্তৃত্ববাদ ও স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে অবিচল প্রতিরোধ এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি অটল অঙ্গীকারের সাক্ষ্য। দীর্ঘ নির্যাতন, অপমান ও ব্যক্তিগত যন্ত্রণার মধ্যেও তিনি কখনো নীতি থেকে সরে যাননি, কখনো ব্যক্তি বা দলের স্বার্থকে রাষ্ট্র ও জনগণের কল্যাণের ঊর্ধ্বে স্থান দেননি। তার সংগ্রাম ছিল কেবল রাজনৈতিক নয়– তা ছিল গণতন্ত্র, জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও জনগণের মর্যাদার প্রতি গভীর দায়বদ্ধতার এক জীবন্ত দলিল। নিরবচ্ছিন্ন ভীতি ও দমননীতির মুখেও তিনি নতিস্বীকার করেননি; নীরব দৃঢ়তায় তিনি অনুপ্রাণিত করেছেন কোটি মানুষকে।

এই রাজনৈতিক সংগ্রামের মূল্য তাকে দিতে হয়েছে চরম ব্যক্তিগত ত্যাগের মাধ্যমে। শেখ হাসিনা সরকারের স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী শাসনামলে বেগম খালেদা জিয়াকে পরিকল্পিতভাবে নিপীড়নের লক্ষ্যবস্তু করা হয়– নিজ বাসভবন থেকে উচ্ছেদ, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় দীর্ঘ কারাবাস এবং গুরুতর অসুস্থতা সত্ত্বেও ন্যায্য চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা হয় তাকে। এসব ব্যবস্থার লক্ষ্য ছিল তাকে নত করা, স্তব্ধ করে দেয়া। কিন্তু বন্দিত্ব ও অসুস্থতার মধ্যেও তিনি অযৌক্তিক দাবি মেনে নেননি, গণতান্ত্রিক বিশ্বাস থেকে সরে আসেননি। তার নীরব সহনশীলতাই পরিণত হয়েছিল এক শক্তিশালী প্রতিরোধে।

বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে উত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বিরল ও অনুপ্রেরণাদায়ী অধ্যায়। তিনি রাজনীতিতে জন্মগ্রহণ করেননি; ছিল না কোনো অভিজাত শিক্ষাগত পটভূমি বা বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি। গৃহিণী হিসেবে জনজীবনে পথচলা শুরু করে তিনি পরিণত হন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরের একজন রাষ্ট্রনায়কে। তার জীবন প্রমাণ করেছে–ক্ষমতা ও নেতৃত্বের প্রকৃত ভিত্তি বংশ বা বিশেষাধিকার নয়; বরং দৃষ্টি, সততা ও সাহস। বিশেষত নারীদের জন্য তার জীবন হয়ে উঠেছিল আত্মবিশ্বাস ও সম্ভাবনার এক দীপ্ত প্রতীক।

খালেদা জিয়ার উত্তরাধিকারের এক অবমূল্যায়িত অথচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তার রাজনৈতিক উদারতা ও ন্যায়ের প্রতি দায়বদ্ধতা– যা দলীয় সীমার গণ্ডি ছাড়িয়ে বিস্তৃত ছিল। ভয় ও দমননীতির পরিবেশে, যখন তিনি নিজেই চরম হুমকির মুখে, তখনো তিনি অন্য রাজনৈতিক দলের নেতাদের ওপর সংঘটিত গুরুতর অন্যায়ের বিরুদ্ধে কণ্ঠ তুলেছেন। বিচারব্যবস্থাকে ব্যবহার করে ভিন্নমত দমনের যে প্রয়াস– যাকে অনেকেই বিচারিক হত্যাকাণ্ড হিসেবে দেখেছেন, তার তিনি প্রকাশ্য নিন্দা করেছেন। সে সময়ে এমন অবস্থান নেয়া ছিল অসাধারণ সাহসের পরিচয়। নিজের নিরাপত্তার চেয়ে নীতিকে অগ্রাধিকার দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, ন্যায়বিচারের লড়াই কখনো নির্বাচনী বা দলীয় হতে পারে না; রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর নিপীড়ন মেনে নিলে গণতন্ত্র টিকে থাকতে পারে না।

পুরো রাজনৈতিক জীবনে তিনি ব্যক্তিগত ক্ষমতার চেয়ে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। সঙ্কটকালে তিনি বেছে নিয়েছেন ধৈর্য, বিভাজনের বদলে ঐক্য, সুবিধাবাদের বদলে নীতি। তার রাজনৈতিক দর্শন ছিল গণতান্ত্রিক বহুত্ববাদ, ন্যায্যতা ও জনগণের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধার ওপর প্রতিষ্ঠিত। বন্দিত্ব, নীরবতা কিংবা বিচ্ছিন্নতার মধ্যেও তার নৈতিক কর্তৃত্ব রাজনীতির চেতনায় প্রভাব ফেলেছে এবং স্বৈরতন্ত্রবিরোধী প্রতিরোধকে শক্তিশালী করেছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন জনগণের ভালোবাসায় সিক্ত। তার সাথে জাতির সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল কোনো কৃত্রিম জনপ্রিয়তাবাদের ওপর নয়; বরং যৌথ সংগ্রাম ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে। সাধারণ মানুষ তার মধ্যে দেখেছে নিজেদের সহনশীলতা, আশা ও স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি। তার সহমর্মিতা, দৃঢ়তা ও দেশপ্রেম দল-মতের সীমা ছাড়িয়ে তাকে এনে দিয়েছে গভীর সম্মান।

আজ যখন বাংলাদেশ অনিশ্চয়তা ও বিভাজনের মুখোমুখি, তখন খালেদা জিয়ার শূন্যতা আরো গভীরভাবে অনুভূত হয়। তার জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়– প্রকৃত নেতৃত্বের পরীক্ষা হয় স্বাচ্ছন্দ্যের সময়ে নয়; বরং সঙ্কটের মুহূর্তে। মাথা নত না করা, কষ্টের মধ্যেও ধৈর্য এবং গণতন্ত্রের প্রতি অটল বিশ্বাস– এ গুণগুলোই তাকে জাতির হৃদয়ে ও ইতিহাসে স্থায়ী আসন করে দিয়েছে। তিনি রেখে গেছেন শুধু একটি রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নয়; বরং একটি নৈতিক দৃষ্টান্ত– যেখানে মর্যাদা, সাহস ও দেশপ্রেম দমননীতিকে অতিক্রম করে এবং স্বৈরাচারের চেয়েও দীর্ঘজীবী হয়।

আল্লাহ তায়ালা তাকে চিরশান্তি দান করুন, নেককারদের কাতারে তার মর্যাদা বৃদ্ধি করুন, আমিন।

লেখক : যুক্তরাজ্যের একজন আইনজীবী ও কমিউনিটি নেতা।