পবিত্র রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ জরুরি

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় নির্বাচন। আর তার পরের সপ্তাহেই শুরু হবে সিয়াম সাধনার মাস রমজান।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
পবিত্র রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ জরুরি
পবিত্র রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ জরুরি

আহসান হাবিব বরুন

দরজায় কড়া নাড়ছে পবিত্র রমজান। আর মাত্র এক মাস পরই শুরু হবে মুসলিম সম্প্রদায়ের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ, সংযম ও আত্মশুদ্ধির মাস। এ বছর রমজান আসছে এক বিশেষ প্রেক্ষাপটে। জাতি একইসাথে এগোচ্ছে একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নির্বাচনের দিকে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় নির্বাচন। আর তার পরের সপ্তাহেই শুরু হবে সিয়াম সাধনার মাস রমজান। অর্থাৎ রাজনৈতিক ব্যস্ততা, প্রশাসনিক চাপ ও সামাজিক উত্তেজনার মধ্যেই আসছে সংযমের এই পবিত্র সময়। এই বাস্তবতায় একটি বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে যেন রমজানে সাধারণ মানুষের কষ্ট না বাড়ে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম যেন মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যেই থাকে।

আমাদের মনে রাখতে হবে যে, রমজান কেবল উপবাসের মাস নয়। এটি সংযম, সহমর্মিতা, ন্যায়বোধ ও সামাজিক দায়িত্ব পালনের মাস। ইসলামের শিক্ষা হলো, এই মাসে মানুষের কষ্ট লাঘব করা, কম লাভে ব্যবসা করা এবং দুর্বল ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো। বিশ্বের বহু মুসলিম দেশে রমজান এলেই নিত্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখা হয়। কোথাও কোথাও বিশেষ ছাড় দেয়া হয়। এমনকি কিছু অমুসলিম দেশেও ধর্মীয় উৎসব ঘিরে দ্রব্যমূল্য কমিয়ে দেয়ার নজির আছে।

অথচ দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে প্রায় প্রতিবছরই রমজান এলেই উল্টো চিত্র দেখা যায়। সংযমের মাস এলেই একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী ও মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেট করে নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দেন। এতে রোজার পবিত্রতা যেমন ক্ষুণ্ণ হয়, তেমনি সাধারণ মানুষের জীবনযাপন আরো কঠিন হয়ে পড়ে।

বছরের পর বছর ধরে মানুষ এমনিতেই উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে নাকাল। চাল, ডাল, তেল, সবজি, মাছ, মাংস- সবকিছুর দাম সাধারণ মানুষের আয়ের তুলনায় অনেক বেশি। এর মধ্যেই যদি রমজানে আবার কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে পণ্যের দাম বাড়ানো হয়, তাহলে তা হবে চরম নিষ্ঠুরতা। বিশেষ করে খেজুর, ছোলা, ডাল, চিনি, দুধ, ডিম, মাছ, মাংস ও সবজি- রমজানে বহুল ব্যবহৃত এসব পণ্যের দাম অবশ্যই সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে হবে। এটি শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয় বরং এটি সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।

বর্তমান বাজার পরিস্থিতির দিকে তাকালেই উদ্বেগের কারণ স্পষ্ট হয়। রমজান শুরুর আগেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সবজির বাজার চড়া। সরবরাহ ঘাটতির অজুহাতে কাঁচামরিচ, শসা, টমেটো, ফুলকপি, শিমসহ বেশিরভাগ শীতকালীন সবজির দাম বেড়েছে। কাঁচামরিচ কেজিতে ১২০ টাকা, শসা ১১০ থেকে ১২০ টাকা, টমেটো ৯০ থেকে ১০০ টাকা। সপ্তাহের ব্যবধানে ১০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে অনেক সবজির। বিক্রেতারা কুয়াশা ও সরবরাহ সমস্যার কথা বলছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রতিবছরই কি একই অজুহাত চলবে?

মুরগির বাজারেও একই চিত্র। ডিমের দাম আপাতত স্থিতিশীল থাকলেও মুরগির দাম বেড়েছে। ব্রয়লার, দেশী ও পাকিস্তানি মুরগির দাম সপ্তাহের ব্যবধানে বেড়েছে ১০ থেকে ২০ টাকা। রমজানে প্রোটিনের প্রধান উৎস হিসেবে মুরগির চাহিদা বাড়ে। এখনই যদি দাম বাড়তে শুরু করে, তাহলে রমজানে এই পণ্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। অন্যদিকে পেঁয়াজ ও ডালের দামে কিছুটা স্বস্তি থাকলেও তা খুবই নাজুক। বাজার ব্যবস্থাপনার সামান্য ব্যত্যয়েই এই স্বস্তি উধাও হয়ে যেতে পারে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রান্নার কাজে ব্যবহৃত এলপি গ্যাস। ইতোমধ্যেই এলপি গ্যাসের দাম অনেকের নাগালের বাইরে চলে গেছে। চাহিদার তুলনায় আমদানি কম হওয়ায় সঙ্কট তৈরি হয়েছে। রমজানে রান্নার চাপ বাড়ে। সাহরি ও ইফতারের প্রস্তুতিতে গ্যাসের ব্যবহার বেড়ে যায়। এই অবস্থায় গ্যাসের সঙ্কট ও উচ্চমূল্য সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। তাই রোজা শুরুর আগেই সরকারকে যেকোনো মূল্যে এলপি গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। এখানে অজুহাতের কোনো সুযোগ নেই।

এই প্রেক্ষাপটে সরকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারকে বাজারে সরাসরি ও কার্যকর হস্তক্ষেপ করতে হবে। শুধু ভ্রাম্যমাণ আদালত বা মাঝেমধ্যে অভিযান চালালেই হবে না। বাজার ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও শক্ত নজরদারি জরুরি। বিশেষ করে চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সরবরাহ শৃঙ্খলে কোথায় কিভাবে অযৌক্তিক মুনাফা হচ্ছে, তা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। নইলে প্রতিবছরের মতো এবারো রমজান এলেই ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে উঠবে।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এবছর রমজান আসছে জাতীয় নির্বাচনের ঠিক পরপরই। পুরো প্রশাসন ও রাজনৈতিক অঙ্গন নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। এই সুযোগে যেন মুনাফালোভী ও সুযোগসন্ধানীরা বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করতে না পারে, সে বিষয়ে এখন থেকেই সতর্ক থাকতে হবে। নির্বাচন আর রমজান- দু’টি বড় ঘটনাই মানুষের জীবনের সাথে সরাসরি যুক্ত। এই সময়ে সামান্য অব্যবস্থাপনাও বড় ধরনের সামাজিক অসন্তোষ তৈরি করতে পারে।

রমজানের মূল শিক্ষা হলো সংযম ও সহমর্মিতা। কিন্তু যখন বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটে, তখন এই শিক্ষার সাথে বাস্তবতার ভয়াবহ সঙ্ঘাত দেখা যায়। দরিদ্র মানুষ রোজা রাখলেও সাহরি ও ইফতারের টেবিলে প্রয়োজনীয় খাবার তুলতে হিমশিম খায়। মধ্যবিত্ত পরিবার হিসাব কষে চলতে বাধ্য হয়। অনেকেই বাধ্য হয়ে পুষ্টিকর খাবার বাদ দেন। সুতরাং এটি শুধু অর্থনৈতিক সঙ্কট নয়। বরং এটি একটি নৈতিক সঙ্কট বলিও।

অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা যদি স্বল্প লাভে ব্যবসা করেন, সিন্ডিকেটে না জড়ান, তাহলে বাজার অনেকটাই স্থিতিশীল রাখা সম্ভব। ইসলাম ব্যবসায়ে ন্যায় ও সততার শিক্ষা দেয়। রমজান সেই শিক্ষাকে বাস্তবে প্রয়োগ করার সর্বোত্তম সময়। রাষ্ট্রের পাশাপাশি ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে। সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে তারা যদি স্বেচ্ছায় কিছু উদ্যোগ নেন, তাহলে সেটি সমাজে ইতিবাচক বার্তা দেবে।

সরকারি উদ্যোগ হিসেবে টিসিবির কার্যক্রম আরো জোরদার করা যেতে পারে। রমজানে ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রির পরিধি বাড়াতে হবে। শুধু শহর নয়, গ্রাম ও প্রান্তিক এলাকাতেও এই সুবিধা পৌঁছাতে হবে। পাশাপাশি বাজারে তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। কোন পণ্যের মজুত কত, আমদানি পরিস্থিতি কী- এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ হলে গুজব ও কৃত্রিম সঙ্কট তৈরির সুযোগ কমে যাবে।

পবিত্র রমজান যেন মানুষের জন্য কষ্টের মাসে পরিণত না হয়। এই মাস হোক সংযম, শান্তি ও সহমর্মিতার। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখা শুধু অর্থনৈতিক দায়িত্ব নয়। বরং এটি একটি নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব। সরকার, ব্যবসায়ী, প্রশাসন- সবাইকে এই দায়িত্ব পালন করতে হবে। তা না হলে রমজানের পবিত্রতা প্রশ্নের মুখে পড়বে, আর সাধারণ মানুষের অসহায় দীর্ঘশ্বাস আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতার সাক্ষী হয়ে থাকবে।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।