সাতটি ভুল এবং একটি যুদ্ধ

ইরানে ওয়াশিংটনের পরিকল্পনা কেন সফল হলো না

ওয়াশিংটন ধারণা করেছিল ইরানের মূল লক্ষ্য হবে কেবল ইসরাইল। কিন্তু তেহরান এবার পুরো অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানায়। সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব এবং জর্ডানে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো সরাসরি ইরানের নিশানায় চলে আসে। এর ফলে আমেরিকার আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে দেয় ইরান।

ন্যাড়া কয়বার বেল তলায় যায়? ইরানের ওপর বিনা কারণে চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধের আলোকে বাংলা প্রবাদের এই প্রশ্ন এখন জোরেশোরে শোনা যাচ্ছে। একই সাথে শোনা যাচ্ছে, ন্যাড়া কেন বেল তলায় গিয়েছিল? তার ফলই বা কী হয়েছে? ইসরাইল ও ইরানের মধ্যকার সেই ১২ দিনের যুদ্ধের পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ উত্তেজনা কমানোর বদলে সংঘাতকে আরো বড় পরিসরে নিয়ে গেছে। তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে যখন আলোচনার টেবিলে প্রত্যাশার পাহাড়সম ফারাক তৈরি হলো, তখনই হোয়াইট হাউস একটি অতি-আশাবাদী সিদ্ধান্তের দিকে ঝুঁকে পড়ে। তাদের ধারণা ছিল, একটি সীমিত যুদ্ধের মাধ্যমে ইরানকে দ্রুত পিছু হটতে বাধ্য করা যাবে।

কিন্তু রণক্ষেত্রের বাস্তবতা সেই অনুমানকে তাসের ঘরের মতো গুঁড়িয়ে দিয়েছে। যে যুদ্ধকে মনে করা হয়েছিল সংক্ষিপ্ত এবং নিয়ন্ত্রিত, তা শেষ পর্যন্ত ৪০ দিনের এক দীর্ঘ ও ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধে রূপ নেয়। এই যুদ্ধ শুধু যে আমেরিকার প্রাথমিক লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে তাই নয়, বরং ওয়াশিংটনের ওপর বিশাল সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে। আল জাজিরায় প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে আল্লামা আজিজি ,পলিটিক্যাল অ্যানালিস্ট এবং ইরান সরকারের তথ্য পরিষদের মহাপরিচালক, ওয়াশিংটনের সাতটি মারাত্মক ভুলের কথা তুলে ধরেছেন। কেন প্রাথমিক হিসাবের সাথে বাস্তবের এই বিস্তর ফারাক তৈরি হলো, তার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন আল্লামা আজিজি।

১২ দিনের যুদ্ধের অভিজ্ঞতার ভুল প্রয়োগ
আমেরিকা ধরে নিয়েছিল, ইসরাইলের সাথে ১২ দিনের যুদ্ধে ইরান যে আচরণ করেছিল, এবারো একই ঘটনা ঘটবে। কিন্তু তারা ভুলে গিয়েছিল যে, এবার খোদ আমেরিকার সরাসরি অংশগ্রহণ অনেক বেশি। ইরানও সেই অনুযায়ী নিজের কৌশল বদলে ফেলে এবং 'হরমুজ প্রণালী' কার্ডটি অত্যন্ত কার্যকরভাবে ব্যবহার করে। গত ১২ ফেব্রুয়ারির এক সিচুয়েশন রুম মিটিংয়ের রিপোর্ট অনুযায়ী, আমেরিকার জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল কিন হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু ট্রাম্প সেই সতর্কবার্তাকে উপেক্ষা করে ধরে নিয়েছিলেন যে, পরিস্থিতি অতটা দূর যাওয়ার আগেই ইরান আত্মসমর্পণ করবে। বাস্তবে হরমুজ প্রণালীই আমেরিকার অর্থনৈতিক ও সামরিক হিসাব ওলটপালট করে দেয়।

কৌশলগত পরিবর্তনের অবহেলা
ওয়াশিংটন ধারণা করেছিল ইরানের মূল লক্ষ্য হবে কেবল ইসরাইল। কিন্তু তেহরান এবার পুরো অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানায়। সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব এবং জর্ডানে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো সরাসরি ইরানের নিশানায় চলে আসে। এর ফলে আমেরিকার আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে দেয় ইরান।

সামরিক সক্ষমতাকে খাটো করে দেখা
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির উন্নয়ন, নিখুঁতভাবে আঘাত হানার ক্ষমতা এবং শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ওয়াশিংটন যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি। তারা বিশ্বাসই করতে পারেনি যে, ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করতে পারবে কিংবা তাদের উন্নত রাডার ব্যবস্থা অকেজো করে দেবে। রণক্ষেত্রে ইরানের এই প্রতিরক্ষা ও আক্রমণাত্মক সক্ষমতার কল্পনাতীত বিকাশ মার্কিন বিমানবাহিনীর শ্রেষ্ঠত্বকে শোচনীয় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়।

অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে ভুল ভবিষ্যদ্বাণী
ডিসেম্বর মাসের কিছু গোয়েন্দা রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে ট্রাম্প প্রশাসন মনে করেছিল, গুপ্তহত্যা এবং গণবিক্ষোভের কারণে ইরান ভেতর থেকে ভেঙে পড়বে। দেশটির প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকবে না। কিন্তু যুদ্ধের দামামা বাজার সাথে সাথে ইরানিদের মধ্যে জাতীয় ঐক্য এবং প্রতিরোধের স্পৃহা আরো বেড়ে যায়। ওয়াশিংটন ইরানের 'জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই' এবং 'রাজনৈতিক প্রতিবাদ'—এই দুইয়ের মধ্যকার পার্থক্য বুঝতে বোকার মতো মারাত্মক ভুল করেছিল।

'অ্যাক্সিস অফ রেজিস্ট্যান্স' বা প্রতিরোধ অক্ষের সংহতি
আমেরিকা ভেবেছিল ইরানের মিত্র গোষ্ঠীগুলো এই যুদ্ধে খুব একটা ভূমিকা রাখতে পারবে না। কিন্তু দেখা গেল, তারা অত্যন্ত সমন্বিতভাবে মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে একটি ঐক্য ফ্রন্ট গড়ে তুলেছে। উল্টোদিকে, আমেরিকা তার ঐতিহ্যবাহী মিত্র বা ন্যাটোর কাছ থেকে তেমন কোনো কার্যকর সমর্থন পায়নি, যা ওয়াশিংটনের জোটের ভেতরে ফাটল ধরিয়ে দেয়।

অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাপ
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় খোদ আমেরিকার ভেতরেই বিরোধ দানা বাঁধে। সাবেক ট্রাম্প সমর্থক এবং টাক্কার কার্লসনের মতো ব্যক্তিত্বরা সংবাদমাধ্যমে সমালোচনা শুরু করেন। বিশেষ করে মিনাব স্কুলে হামলার মতো বেসামরিক প্রাণহানির ঘটনায় আমেরিকার নৈতিক অবস্থান বিশ্বজুড়ে ধূলিসাৎ হয়ে যায়। এদিকে, যুদ্ধের প্রভাবে তেলের দাম ১২০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় মার্কিন জনজীবনে নাভিশ্বাস ওঠে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাশিয়া ও চীনের ভেটো এবং মিত্র দেশগুলোর স্বাধীন অবস্থান ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় ফাটল
যুদ্ধের মাঝপথে সিনিয়র জেনারেলদের বরখাস্ত করার ঘটনা পেন্টাগনে এক বিশাল ভূকম্পনের মতো ছিল। এটি কেবল প্রশাসনিক রদবদল ছিল না, বরং আধুনিক সামরিক ডকট্রিন বা যুদ্ধকৌশল নিয়ে যে এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, তারই বহিঃপ্রকাশ। এই নেতৃত্বহীনতা রণক্ষেত্রে আমেরিকার ধারাবাহিকতাকে ব্যাহত করেছে।

পরিশেষে বলা যায়, এই সাতটি মারাত্মক ভুল এবং কৌশলগত ব্যর্থতা আমেরিকাকে এমন এক খাদের কিনারে দাঁড় করিয়েছিল, যেখানে ৪০ দিন পর ইরানের দেওয়া শর্ত মেনে নিয়ে আলোচনার টেবিলে বসাই ছিল ওয়াশিংটনের জন্য একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ। প্রবাদের সেই ন্যাড়া দ্বিতীয়বার বেল তলায় গিয়ে যে কেবল বেলের প্রচণ্ড শক্ত আঘাতই পেয়েছে তা নয়, বরং তার সেই অতি-আশাবাদী হিসাব-নিকাশ রণক্ষেত্রের কঠিন বাস্তবের কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছে। উঁচু গাছ থেকে পড়া বেলের আঘাত যেমন মারাত্মক হতে পারে, ওয়াশিংটনের জন্য এই যুদ্ধের পরিণতিও তেমনি ধ্বংসাত্মক হয়ে দেখা দিয়েছে। এই যুদ্ধটি আন্তর্জাতিক রণকৌশলের ইতিহাসে একটি বড় উদাহরণ হয়ে থাকবে যে, মাঠের শক্তিমত্তাকে খাটো করে দেখার পরিণাম কতটা ভয়ংকর হতে পারে।

সূত্র : আল জাজিরা