একটি গ্রাম। গ্রামে অনেক ঘর। একটি ঘর বড়সড়, ওখানে গ্রামের মানুষ আসে-বসে, আড্ডা দেয়। চারদিকে উঠান, সামনে বারান্দা। ভেতরে বেশ কয়েকটি কামরা। দূর থেকে দেখলে বোঝা যায়, ঘরটি যথেষ্ট মজবুত। ঝড় আসে, ঝঞ্ঝা আসে, তবু ঘর দাঁড়িয়ে থাকে। মানুষ ভাবে, এ ঘর ভাঙে না, ভাঙবে না। এ ঘরে কোনো সমস্যা নেই।
কিন্তু সমস্যা আছে। সমস্যাটি একেবারে ঘরের ভেতরে। বাইরে থেকে বোঝা যায় না। ঘরের ভেতরে কেউ নীরবে আরেকটি ঘর বানিয়ে ফেলেছে। ভেতরের ঘরে আলো-বাতাস ঢোকে না। ঘরটি খুব ছোট, তবে দরজা-জানালা শক্ত। ওগুলো মূল ঘরের দেয়ালের সাথে মিলিয়ে রঙ করা। আসলে পুরো ঘরের অনেক সিদ্ধান্ত আসে ওই ছোট ঘর থেকে। কে কোথায় বসবে, কোন কামরায় কে থাকবে, কে গলা চড়িয়ে কথা বলতে পারবে, কে পারবে না, এসব সিদ্ধান্ত। গ্রামের মানুষ জানেই না, তারা যে ঘরে ঢুকছে-আড্ডা দিচ্ছে, সেটির ভেতর আরেকটি ঘর আছে।
রাষ্ট্র অনেক সময় ঠিক এমন একটি ঘরের মতো। বাইরে থেকে দেখলে সব ঠিকঠাক। রাষ্ট্রে নির্বাচন হয়, সংসদ বসে, আদালত চলে, সংবাদপত্র প্রকাশ হয়। নাগরিকরা প্রতিদিনের জীবনে ব্যস্ত থাকে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা জনগণের হাতছাড়া হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে মূলত রাষ্ট্রের দৃশ্যমান কাঠামোর আড়ালে কাজ করতে থাকে আরেক অদৃশ্য কাঠামো। এই ‘অদৃশ্য কাঠামো’র ধারণাগত নাম ‘ডিপ স্টেট’।
‘ডিপ স্টেট’ শব্দটি পরিচিত, প্রায় সবাই বোঝেন– গভীর রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্র। তবে ‘ডিপ স্টেট’-এর গতিবিধি হয়তো অনেকে টের পান না। বাস্তবতা হলো, ডিপ স্টেট চোখে দেখার মতো কোনো বস্তু নয়। ডিপ স্টেটের লোকেরা রাষ্ট্রের ভেতরের রাষ্ট্র শাসন করতে বন্দুক নিয়ে ঘুরে বেড়ান এমনও না। গভীর রাষ্ট্রের হয়ে যারা কাজ করেন, তারা অনেক সময় ভদ্র টাইপের হন।
মার্জিত আচরণ করেন। নির্দোষ টাইপের গান শোনেন। তাদের কথা পরিশীলিত। আইনের বাইরে একটি কদমও ফেলেন না, এমন ভাব দেখান। ডিপ স্টেটের লোকেরা দেখতে সাদামাটা মানুষের মতোই। তবে দেখার পর এদেরকে মানুষের চাইতে আরো বড় কিছু বলে ভুল হওয়ার শঙ্কা থাকে। এই ভুল ধারণার কারণেই তরুণরা তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়। আর সেই আকর্ষণকে কাজে লাগিয়েই তরুণদের মানসিক জগতে প্রভাব বিস্তার করা তাদের জন্য সহজ হয়।
তাদের বাহ্যিক ও ভেতরগত বিষয় বিশ্লেষণ করার আগে চলুন ঘরের গল্প থেকে আবার একটু উঁকি দিয়ে আসি। গ্রামের ওই ঘরটি দাঁড়িয়ে আছে চারটি বড় খুঁটির ওপর। আমরা খুঁটিগুলোর নাম দিলে আলাদা করতে সুবিধা হবে। ধরুন একটা খুঁটির নাম ‘আইনসভা’। একটির নাম ‘নির্বাহী বিভাগ’। আরো একটির নাম ‘বিচার বিভাগ’। আর শেষটির নাম ‘গণমাধ্যম’। প্রথম তিনটি খুঁটি সবার পরিচিত। কিন্তু চতুর্থ খুঁটিটি এমন একটি খুঁটি, যা কেবল ঘর ধরে রাখে না; বরং ঘরের ভেতর আলো-বাতাসও নিয়ন্ত্রণ করে। ঘরের দরজা, জানালা আর ভ্যান্টিলেটরের ভার বহন করে এই খুঁটিটি।
আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তায় গণমাধ্যমকে বলা হয় রাষ্ট্রের ‘চতুর্থ খুঁটি’। এই খুঁটির কাজ হলো আলো ফেলা। ক্ষমতার অন্ধকার দিক নিয়ে প্রশ্ন তোলা। অন্ধকারের তথ্য সামনে নিয়ে আসা। কিন্তু ঘরের জানালা দিয়ে যখন আলো ঢুকে, তখন ভেতরের ছোট ঘর থেকে যদি আলোর সাথে অতি বেগুনি রশ্মি মিশিয়ে দেয়া হয়, তাহলে এই ঘরে যাদের আনাগোনা তাদের অবস্থাটা কী হবে? তাদের ত্বকে ক্যান্সার দেখা দেবে। কমে যাবে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা।
আমাদের দুর্ভাগ্য, আমাদের ঘর তথা এই রাষ্ট্রের আলোতে মিশিয়ে দেওয়া হয় ‘অতি বেগুনি রশ্মি’! যে রশ্মির খবর অনেকেই রাখেন না। কারণ গভীর রাষ্ট্র সাধারণত মূল ঘর ভেঙে দেয় না, ঘরের ভেতর ঘর বানিয়ে সেখান থেকে ক্ষতিকর ‘অতি বেগুনি রশ্মি’ ছেড়ে দেয়। এরা সংবিধান ছিঁড়ে ফেলে না, নির্বাচন বাতিল করে না। এরা করে আরো সূক্ষ্ম কাজ।
ঘরের ভেতরে তৈরি ঘর থেকে ঠিক করে দেয়া হয়, মানুষ কী ভাববে, কী নিয়ে ভয় পাবে, কাকে বিশ্বাস করবে আর কাকে সন্দেহ করবে। এই মানসিক মানচিত্র তৈরির সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হলো গণমাধ্যম। বিশেষ করে সেসব গণমাধ্যম, যেগুলো বাইরে থেকে বিশ্বাসযোগ্য বলেই মনে হয়। সেসব গণমাধ্যম, যেগুলোতে শহুরে মধ্যবিত্তদের সকালের অভ্যাসের অংশ হওয়ার উপাদান থাকে। এই গণমাধ্যমগুলোর ভাষা হয় ঝরঝরে। বাক্য হয় পরিপাটি। এতে পাঠকদের কাছে প্রভাব ধরে রাখতে পারে তারা। এই গণমাধ্যমগুলো চিৎকার করে না, গালি দেয় না; বরং বেশি করে মানবিক শব্দ ব্যবহার করে। ঠিক এখানেই তাদের শক্তি।
এই গণমাধ্যমগুলোর সবচেয়ে বড় সম্পদ তাদের কঠোর স্টাইলশিট। কীভাবে শিরোনাম হবে, কোন বিশেষণ ব্যবহার হবে, কোনটি চলবে, কোনটি চলবে না– সব আগে থেকে নির্ধারিত থাকে। এর সাথে যুক্ত হয় এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক ভান। তারা সবচেয়ে বেশি যুক্তিবাদীর অভিনয় করে। নিজেদের সভ্য দেখানোর চেষ্টা করে। এই পরিপাটির আড়ালেই লুকিয়ে থাকে তাদের বিপজ্জনক ক্ষমতা। কারণ মানুষ ভাষা দেখেই সত্য বিচার করে। যে লেখা সুখপাঠ্য, মার্জিত, পরিমিত, সেটি বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হয়। আর মানুষের এই প্রবণতা ব্যবহার করেই ঘরের ভেতরে ঘর শক্ত করে এরা। অনেক সময় কী সংবাদ করা হবে, সেই সিদ্ধান্ত আগেই ঠিক হয়ে থাকে। তথ্য সাজানো হয় পরে। আর এর মাধ্যমেই গণমাধ্যম হয়ে উঠে গভীর রাষ্ট্রের অংশ।
ঘরের ভেতরের ঘর থেকে প্রকাশ হওয়া গণমাধ্যম খবর প্রকাশ করে না, প্রকাশ করে নির্দেশনা। আদালতের রায়ের আগেই শিরোনামে রায় দিয়ে দেয় তারা। কে ভালো মানুষ, কে খারাপ, এই তালিকা তৈরি হয় কাগজের পাতায়। সংবাদপত্র বলে দেয়, কার সাথে মেশা যাবে না। কে কতটা ঝুঁকি বহন করে?
একটি সংবাদপত্র যখন গভীর রাষ্ট্রে জায়গা করে নেয়, তখন ওই রাষ্ট্র ঝাপসা হয়ে যায় সত্য। অর্ধসত্য আর মোহনীয় ভাষা মিলিয়ে এমন এক বাস্তবতা তৈরি হয়, যেখানে প্রশ্ন করার জায়গা থাকে না। বিচারব্যবস্থার ওপর চাপ পড়ে। ন্যায়বিচারের ভিত্তি নড়িয়ে দেয় মিডিয়া ট্রায়াল। সমাজে কৃত্রিম বিভাজন তৈরি হয়। মানুষ কাঠামোগত সমস্যার বদলে উন্মাদ হয়ে চারদিকে শত্রুর খোঁজ করতে থাকে। সামনে যাকে দেখে, তাকেই মনে হয় শত্রু।
এর পরিণতি কী হয়? রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বে ক্ষয় ধরে। জনগণের সাথে আলোচনায় নয়, বরং গভীর রাষ্ট্রের ইচ্ছায় নীতি নির্ধারণ হয়। ঘরের ভেতরের ঘর পুরো ঘরকে দুর্বল করে দেয়। এই বাস্তবতা বুঝতে পারছেন অনেকে। কিন্তু বুঝতে পারার পরও গভীর রাষ্ট্রের গতিবিধি ঠিকমতো আন্দাজ করতে পারছেন না তারা। ‘ডিপ স্টেট’ ধ্বংস করার নামে ভুল পথে হাঁটছেন কেউ কেউ। তারা একই ভাষা, একই ভঙ্গি ব্যবহার করে বিকল্প তৈরি করতে চাইছেন। কিন্তু সামনে একটি মডেল রেখে সেটি অনুকরণ করে বিকল্প তৈরি করা যায় না। সেটি হয় নকল। পথ তৈরি করে নিতে হয় নিজেদের মতো করে। তৈরি করতে হয় নিজের মতো স্টাইলশিট। ভালো শিরোনাম, পরিষ্কার বাক্য, সঠিক সূত্র থাকলে সংবাদের পরিবেশন মজবুত হয়। আর এই মজবুত পরিবেশনের জন্য গড়ে তুলতে হয় টেকসই সিস্টেম। এই কাজ একা কেউ চাইলেই করে ফেলতে পারে না। এর জন্য দরকার সংগঠিত উদ্যোগ।
সংগঠিত উদ্যোগ মানে কেবল নতুন পত্রিকা বা নতুন চ্যানেল খোলা নয়। পুরনোকে নিয়েও নতুন করে ভাবার সুযোগ আছে। এতে পাঠক বা দর্শককেও ভাবতে অভ্যস্ত করে তোলা যায়। পাঠক আগে বুঝতে চায়, পরে ভাবতে চায়। লেখা বা কনটেন্ট উপস্থাপনের ভাষা যদি দুর্বোধ্য হয়, প্রথম ধাপেই পাঠক সরে যায়। সহজ ভাষা পাঠককে লেখার ভেতরে ডেকে নেয়। লেখক ও পাঠকের দূরত্ব কমায়। গভীর চিন্তা সহজ ভাষায় প্রকাশ করা লেখকের দক্ষতা। জটিল বাক্য নয়, স্পষ্টতা লেখাকে শক্তি দেয়। মানুষ তত্ত্ব ভুলে যায়, কিন্তু অনুভূতি মনে রাখে। সাদামাটা ভাষা অনুভূতি জাগিয়ে দেয়, এ কারণে এর প্রভাব দীর্ঘদিন থাকে। পাঠক বা দর্শককে প্রভাবিত করতে পারলে গণমাধ্যমের আর কিছু করার দরকার হয় না। প্রভাবশালী ওই গণমাধ্যমটি যদি মিথ্যা নয়, সত্যের আলো ফেলতে জানে, সেই আলোয় ভেসে যায় পুরো ঘর। এতে ঘরের ভেতরের ঘরে কারো পক্ষে লুকিয়ে থাকা সম্ভব হয় না।
লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত
[email protected]



