অধ্যাপক ড. সাবরিনা নাজ
প্রতিবছর ৩ মার্চ পালিত বিশ্ব বন্যপ্রাণ দিবস সাধারণত বাঘ, হাতি, ডলফিন কিংবা পাখির মতো আইকনিক প্রাণীদের সাথে যুক্ত করে দেখা হয়। কিন্তু বন্যপ্রাণ বলতে শুধু প্রাণীই নয়। এ বছরের প্রতিপাদ্য— ‘ঔষধি ও সুগন্ধি উদ্ভিদ: স্বাস্থ্য, ঐতিহ্য ও জীবিকার সংরক্ষণ’। এই প্রতিপাদ্যটি বন্য উদ্ভিদের গুরুত্বকে তুলে ধরে, যা ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা এবং আধুনিক ওষুধশিল্প—উভয়ের ভিত্তি। এটি টেকসই ব্যবহার ও ন্যায্য সুবিধা বণ্টনের ওপর জোর দেয় এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করে।
উদ্ভিদ জীববৈচিত্র্যের অপরিহার্য উপাদান এবং সব বাস্তুতন্ত্রের ভিত্তি। বিশেষ করে জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ অথচ জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ বাংলাদেশের মতো প্রেক্ষাপটে জীবন টিকিয়ে রাখতে উদ্ভিদের অপরিহার্য ভূমিকা তুলে ধরা অত্যন্ত জরুরি।
সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বন থেকে শুরু করে হাওর অববাহিকার মিঠাপানির জলাভূমি, চট্টগ্রামের পাহাড়ি বনাঞ্চল থেকে কক্সবাজারের উপকূলীয় বালিয়াড়ি—বাংলাদেশের উদ্ভিদজগৎ পরিবেশগত স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মেরুদণ্ড গঠন করে। এই নিবন্ধে উদ্ভিদকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিশ্ব বন্যপ্রাণ দিবস ২০২৬ উপলক্ষে বাংলাদেশের উদ্ভিদ বৈচিত্র্য, সংরক্ষণ চ্যালেঞ্জ, অর্জন এবং ভবিষ্যৎ করণীয় আলোচনা করা হয়েছে।
উদ্ভিদ হলো প্রাথমিক উৎপাদক। সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে তারা সূর্যালোককে শক্তিতে রূপান্তর করে, অক্সিজেন উৎপাদন করে এবং খাদ্যশৃঙ্খলের ভিত্তি তৈরি করে। উদ্ভিদ ছাড়া মানুষ বা প্রাণী—কেউই বাঁচতে পারত না। তারা জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ করে, মাটিক্ষয় রোধ করে, পানি চক্র বজায় রাখে, খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহ করে এবং জীবিকা নিশ্চিত করে।
তবুও উদ্ভিদ প্রজাতি প্রায়ই প্রাণীদের তুলনায় কম গুরুত্ব পায়। বিশ্বব্যাপী হাজারো উদ্ভিদ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে। আবাসস্থল ধ্বংস, জলবায়ু পরিবর্তন, আগ্রাসী প্রজাতি ও অতিরিক্ত আহরণ দেশীয় উদ্ভিদকে বিপন্ন করছে। উচ্চ জনসংখ্যা ও সীমিত জমির বাংলাদেশে উদ্ভিদ সংরক্ষণ একদিকে পরিবেশগত প্রয়োজন, অন্যদিকে উন্নয়নগত চ্যালেঞ্জ।
ভৌগোলিক আয়তন ছোট হলেও বাংলাদেশ উদ্ভিদ বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। উষ্ণমণ্ডলীয় মৌসুমি জলবায়ু, উর্বর ব-দ্বীপীয় মাটি ও বিভিন্ন বাস্তুতন্ত্র নানা ধরনের উদ্ভিদের আবাসস্থল তৈরি করেছে। বিশ্বের বৃহত্তম একটানা ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে সুন্দরী, গেওয়া, কেওড়া প্রভৃতি লবণসহিষ্ণু উদ্ভিদ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে প্রাকৃতিক সুরক্ষা দেয়, উপকূল স্থিতিশীল রাখে এবং মাছ ও চিংড়ির প্রজননক্ষেত্র তৈরি করে। কিন্তু লবণাক্ততা ও রোগের কারণে সুন্দরী গাছ এখন হুমকির মুখে।
পাহাড়ি বনাঞ্চলে গর্জন, সেগুন, আগরসহ মূল্যবান কাঠ ও ঔষধি উদ্ভিদ রয়েছে। আদিবাসী জনগোষ্ঠী খাদ্য, ওষুধ ও সাংস্কৃতিক প্রয়োজনে এসব উদ্ভিদের ওপর নির্ভরশীল। মধুপুর ও ভাওয়ালের শালবন জীববৈচিত্র্য ও জীবিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও কৃষি সম্প্রসারণ ও বসতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
নদী, বিল ও হাওরে শাপলা (জাতীয় ফুল), পদ্ম, হাইড্রিলা এবং কচুরিপানার মতো জলজ উদ্ভিদ পানি অক্সিজেনসমৃদ্ধ রাখে, মাছের আবাসস্থল তৈরি করে এবং পুষ্টির ভারসাম্য বজায় রাখে। উপকূলীয় অঞ্চলের লবণসহিষ্ণু উদ্ভিদ মাটিক্ষয় রোধ করে এবং ঝড়ের আঘাত থেকে ভেতরের এলাকা রক্ষা করে।
উদ্ভিদ বাংলাদেশের জীবনে অপরিহার্য বাস্তুসেবা প্রদান করে। বন কার্বন শোষণ করে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কমায়। গাছের শিকড় মাটি বেঁধে রাখে। নদী তীরবর্তী গাছ ভাঙন রোধ করে। জলাভূমির উদ্ভিদ দূষণ কমায়। কৃষি, বনজ, মৎস্য, ভেষজ চিকিৎসা ও কুটিরশিল্প—সব ক্ষেত্রেই উদ্ভিদনির্ভর জীবিকা লাখো মানুষের আয়ের উৎস। বাঁশ, পাট, চা, ধান ও ফলমূল অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বটগাছ শক্তির প্রতীক, তুলসী ধর্মীয় মূল্য বহন করে, শাপলা সৌন্দর্য ও স্থিতিস্থাপকতার প্রতীক।
তবে নগরায়ন, কৃষি সম্প্রসারণ, অবৈধ গাছকাটা, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন, আগ্রাসী প্রজাতি (যেমন কচুরিপানা, পার্থেনিয়াম) এবং দূষণ উদ্ভিদজগৎকে হুমকির মুখে ফেলছে। ঔষধি ও কাঠজাত উদ্ভিদ অতিরিক্ত আহরণের ফলে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে। উদ্ভিদ গবেষণায়ও পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও মনোযোগের অভাব রয়েছে।
বাংলাদেশ সরকার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান উদ্ভিদ সংরক্ষণে উদ্যোগ নিয়েছে। সংরক্ষিত বন, জাতীয় উদ্যান ও অভয়ারণ্য স্থাপন করা হয়েছে। লাওয়াছড়া ন্যাশনাল পার্ক ও রেমা-কেলেঙ্গা ওয়াল্ডলাইফ সেঞ্চারি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভিদসম্পদ রক্ষা করছে। সামাজিক বনায়ন, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী, হার্বেরিয়াম গবেষণা ও আন্তর্জাতিক চুক্তিতে অংশগ্রহণ সংরক্ষণে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
২০২৬ সালের বিশ্ব বন্যপ্রাণ দিবসে নেয়া যেতে পারে—
- দেশীয় ঔষধি গাছ রোপণ কর্মসূচি
- বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভিদ প্রদর্শনী
- ম্যানগ্রোভ ও জলবায়ু সহনশীলতা নিয়ে সেমিনার
- স্কুল প্রতিযোগিতা
- রান্নাঘর বাগান ও টেকসই কৃষি প্রশিক্ষণ
আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যগত জ্ঞান উদ্ভিদ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তরুণ বিজ্ঞানী, শিক্ষার্থী ও পরিবেশকর্মীরা গবেষণা, ডিজিটাল হার্বেরিয়াম, নগর বনায়ন ও সবুজ উদ্যোগে যুক্ত হচ্ছে।
টেকসই উদ্ভিদ বৈচিত্র্য নিশ্চিত করতে বন আইন প্রয়োগ জোরদার, সংরক্ষিত এলাকা সম্প্রসারণ, জলবায়ু সহনশীল প্রজাতি রোপণ, গবেষণায় বিনিয়োগ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি অপরিহার্য। উন্নয়ন পরিকল্পনায় উদ্ভিদ সংরক্ষণকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
বিশ্ব বন্যপ্রাণ দিবস ২০২৬ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—পৃথিবীর সব জীবনের ভিত্তি উদ্ভিদ। বাংলাদেশে উদ্ভিদ আমাদের ঘূর্ণিঝড় থেকে রক্ষা করে, খাদ্য জোগায়, অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করে এবং সংস্কৃতিকে ধারণ করে। প্রাণীরা যতই আলোচনায় থাকুক, নীরবে বাস্তুতন্ত্র টিকিয়ে রাখে উদ্ভিদই। তাই উদ্ভিদ বৈচিত্র্য সংরক্ষণ করলেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ, স্থিতিশীল ও সহনশীল বাংলাদেশ নিশ্চিত করা সম্ভব।
লেখিকা : চেয়ারম্যান, উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাবেক পরিচালক, পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট


