প্রহরী থাকার পরও দুঃসাহসিক চুরি হয়ে গেছে। ক্রুদ্ধ গৃহকর্তা বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন—এটা সম্ভব হলো কী করে? সরল প্রহরী মাথা চুলকে বলল, ‘এক হাতে ঢাল, আরেক হাতে তলোয়ার। চোর ধরব কোন হাতে?’
আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ক্ষেপণাস্ত্র বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থার অবস্থা এখন অনেকটা সেই প্রহরীর মতোই। আকাশ পাহারা দেয়ার জন্য যেসব জটিল প্রতিরক্ষাব্যবস্থা বসানো হয়েছে, সেগুলোই এখন নিজেরাই হামলার শিকার হয়ে পড়ছে। আকাশে আসা ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন থামানোর আগেই অনেক সময় সেই প্রতিরক্ষাব্যবস্থার চোখ-কান ভেঙে দেয়া হচ্ছে। নিষেধাজ্ঞা বেড়াজাল এড়িয়ে এমন কথা স্বীকার করছে ইহুদিবাদী সংবাদমাধ্যম।
ইহুদিবাদী ইসরাইলের দৈনিক জেরুজালেম পোস্টের এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, সাম্প্রতিক যুদ্ধের প্রথম কয়েক দিনে ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে—স্থির অবস্থায় থাকা আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আসলে কতটা ঝুঁকির মধ্যে থাকে।
ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক অভিযানের প্রথম দিকেই ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে মার্কিন নির্মিত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ রাডারগুলোর ওপর। এই রাডারগুলোই মূলত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার চোখ। এগুলোই আকাশে আসা হুমকি শনাক্ত করে, লক্ষ্য নির্ধারণ করে এবং প্রতিরোধব্যবস্থা চালু করতে সাহায্য করে। কিন্তু যুদ্ধের শুরুতেই কয়েকটি রাডার ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় নতুন এক বাস্তবতা সামনে এসেছে। ইরান যে নির্ভুলভাবে এসব লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে পেরেছে, তা মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন মিত্র দেশগুলোর জন্য এক বড় সতর্কবার্তা হয়ে উঠেছে।
স্যাটেলাইট চিত্র এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে দেখা গেছে, জর্ডানে মোতায়েন করা আমেরিকার থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যাটারির একটি এএন/টিপিওয়াই-২ রাডার সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। কাতারে ধ্বংস হয়েছে আরেকটি মার্কিন এএন/এফপিএস-১৩২ ফেজড অ্যারে রাডার। একই ধরনের রাডার সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত এবং সৌদি আরবেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।
জর্ডানে যে রাডারটি ধ্বংস হয়েছে, সেটি মোতায়েন ছিল মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে। এই ঘাঁটিতে বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন থাকা আমেরিকার ৬০টিরও বেশি যুদ্ধবিমান রয়েছে। এর মধ্যে আছে এফ-৩৫ লাইটনিং টু, এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল এবং ইএ-১৮জি গ্রাউলার ধরনের ইলেকট্রনিক যুদ্ধবিমান। অর্থাৎ এমন এক ঘাঁটিতে আঘাত লেগেছে, যেটি নিজেই ছিল আকাশযুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
যুদ্ধের সময় আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সব সময়ই অগ্রাধিকার লক্ষ্যবস্তু হয়। কারণ, এগুলো ভেঙে দেয়া গেলে শত্রুর আকাশ প্রতিরক্ষা অনেকটাই অন্ধ হয়ে যায়। স্যাটেলাইট চিত্র দেখিয়ে দিয়েছে, এ ধরনের স্থির রাডার বা ব্যাটারি শনাক্ত করা এখন খুব কঠিন নয়। বিশেষ করে যখন বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট ছবিও সহজে পাওয়া যায় এবং তাতে এসব স্থাপনার অবস্থান পরিষ্কার দেখা যায়।
এই ধরনের রাডার হারানো শুধু সামরিক দিক থেকে নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও বড় ক্ষতি। সিএনএন-এর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্কিন মিসাইল ডিফেন্স এজেন্সির বাজেট ধরে একটি রাডার প্রতিস্থাপন করতে প্রায় অর্ধ বিলিয়ন ডলার খরচ হতে পারে। শুধু খরচ নয়, এগুলো তৈরি ও মোতায়েন করতে সময়ও লাগে অনেক। ফলে এই রাডারগুলো নষ্ট হয়ে গেলে পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা দুর্বল হয়ে পড়ে, কারণ তখন পরিস্থিতি সম্পর্কে সামরিক বাহিনীর ধারণা অনেকটাই কমে যায়।
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বর্তমানে পাঁচটি থাড ব্যবস্থা মোতায়েন আছে। এর বাইরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আরো কিছু কৌশলগত স্থানে একই ধরনের রাডার রেখেছে। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলেও আছে অন্তত দুটি। সেখানে আবার চীন নিয়মিত তাইওয়ানকে হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। ফলে এই প্রতিরক্ষাব্যবস্থাগুলো শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক কৌশলগত ভারসাম্যের সাথেও জড়িত।
সমস্যা হলো, এই রাডারগুলো আকারে বড় এবং অত্যন্ত ব্যয়বহুল হলেও এগুলো খুব নাজুক। ইরানের শাহেদ ড্রোনের মতো ছোট একটি ড্রোন, যার সাথে সামান্য বিস্ফোরক থাকে, সেটিও বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে। এমন আঘাতে পুরো রাডারব্যবস্থা দীর্ঘ সময়ের জন্য অচল হয়ে যেতে পারে। ইরানের জন্য এসব লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সব সময় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও প্রয়োজন হয় না।
শাহেদ আক্রমণ ড্রোন যুদ্ধক্ষেত্রে কতটা কার্যকর, তা ইতোমধ্যেই দেখা গেছে। যুদ্ধের প্রথম দিকেই একটি ড্রোন মার্কিন সেনাদের একটি স্থাপনায় আঘাত করলে সেখানে থাকা ছয়জন মার্কিন সেনা নিহত হন। ওই স্থাপনাটিতে ড্রোন প্রতিরোধের কোনো ব্যবস্থা ছিল না।
ড্রোনগুলো নিচু দিয়ে ধীরে উড়ে যেতে পারে। তাই অনেক সময় এগুলো সহজে ধরা পড়ে না। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন জায়গায় এই ধরনের ড্রোন হামলা হয়েছে। লক্ষ্যবস্তু হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, যেমন বিমানবন্দর, আবার বেসামরিক স্থাপনাও, যেমন হোটেল।
তবে আমেরিকা ও ইসরাইল এখনো বলছে, তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার সক্ষমতা ধীরে ধীরে দুর্বল করে দিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার বৃহস্পতিবার বলেছেন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ৯০ শতাংশ এবং ড্রোন হামলা ৮৩ শতাংশ কমে গেছে।
এদিকে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকেই কিভাবে রক্ষা করা যায়, তা নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে শুরু করেছে সামরিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো। ইসরাইলের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্পেকট্রালএক্স এই বিষয়ে কাজ করছে। তাদের লক্ষ্য হলো সৈন্য, যানবাহন এবং সামরিক সরঞ্জামকে এমনভাবে ঢেকে রাখা যাতে ভিজ্যুয়াল, থার্মাল, ইনফ্রারেড, রাডার বা মাল্টি-স্পেকট্রাল সেন্সর দিয়ে সহজে শনাক্ত করা না যায়।
এই প্রযুক্তির মধ্যে আছে উন্নত ছদ্মবেশী উপকরণ, অভিযোজিত লুকানোর ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন ধরনের সিগনেচার কমিয়ে দেয়ার সমাধান—যা স্থল, সমুদ্র ও আকাশ—তিন ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা যায়। স্পেকট্রালএক্স এমনকি কম্পিউটার দিয়ে তৈরি করা বিশেষ ছদ্মবেশী নকশাও তৈরি করেছে, যা নির্দিষ্ট জায়গা ও নির্দিষ্ট অভিযানের জন্য আলাদা করে সাজানো যায়।
অপারেশন রোরিং লায়ন বা এপিক ফিউরি শুরুর আগে জেরুজালেম পোস্টের ডিফেন্স অ্যান্ড টেক বিভাগকে দেয়া সাক্ষাৎকারে স্পেকট্রালএক্স-এর প্রধান নির্বাহী আসাফ পিচ্চিওত্তো বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত বেশিরভাগ সামরিক বাহিনী ছদ্মবেশের বিষয়টিকে খুব একটা গুরুত্ব দিত না।
তার ভাষায়, ইউক্রেন যুদ্ধের আগে কেউ ছদ্মবেশ নিয়ে তেমন কথা বলত না। কিন্তু যুদ্ধ সবার চিন্তা বদলে দিয়েছে। এখন সবাই বুঝতে পারছে সস্তা ড্রোন আর উন্নত সেন্সর কত বড় হুমকি।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান রাশিয়ার কাছ থেকেও কিছু গোয়েন্দা তথ্য পাচ্ছে—যেমন সেনা মোতায়েনের অবস্থান বা সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু। সেই তথ্যের সাথে খোলা উৎসের তথ্য যোগ হয়ে ইরানকে লক্ষ্যবস্তুর নির্ভুল স্থানাঙ্ক পর্যন্ত জানিয়ে দিচ্ছে।
পিচ্চিওত্তোর মতে, এখন পরিস্থিতি এমন যে সেনাদের নিজেদের সিগনেচার বা শনাক্তযোগ্য চিহ্ন নিয়ন্ত্রণ করতে শিখতেই হবে। কারণ ১০ বছর আগের তুলনায় এখন নজরদারি চালানো অনেক সহজ হয়ে গেছে।
তবু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে রক্ষা করতে হলে একাধিক স্তরের ব্যবস্থা দরকার। শুধু ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধক দিয়ে হবে না। এর সাথে থাকতে হবে জ্যামিং, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, উচ্চ ক্ষমতার লেজার এবং মাইক্রোওয়েভ প্রযুক্তি।
মাইক্রোওয়েভ পালস বা এইচপিএম ব্যবস্থা একসাথে অনেকগুলো ড্রোনের ইলেকট্রনিক্স অচল করে দিতে পারে। ফলে ড্রোনের ঝাঁক আক্রমণের বিরুদ্ধে এটি কার্যকর। অন্যদিকে লেজার অস্ত্র একেবারে নির্ভুলভাবে একেকটি লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে পারে।
এই দুটি প্রযুক্তি একসাথে ব্যবহার করলে ড্রোন প্রতিরোধে নতুন ধরনের স্তরভিত্তিক ব্যবস্থা তৈরি হয়। এতে ব্যয়বহুল ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর নির্ভরতা কমে যায় এবং বিভিন্ন ধরনের হুমকির বিরুদ্ধে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেয়া সম্ভব হয়।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, বর্তমান যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে আমেরিকা ও তার মিত্রদের শিক্ষা নিতে হবে। কারণ ভবিষ্যতে যদি চীন বড় ধরনের হামলা চালায়, তখন এই শিক্ষা খুব দরকার হবে। শুধু শত্রুর ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকেন্দ্র ধ্বংস করলেই পূর্ণ নিরাপত্তা আসে না। প্রকৃত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে লাগে চলমান মোতায়েন, ছদ্মবেশ, বহুস্তর প্রতিরোধ এবং শক্তিশালী ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা—সব মিলিয়ে এক জটিল প্রতিরক্ষা কাঠামো। তখনই আকাশ রক্ষার সেই প্রহরী সত্যিকার অর্থে ঢাল আর তলোয়ার—দুটোই ব্যবহার করতে পারবে।



