ধার্মিক আর ধর্মব্যবসায়ী চেনার তরিকা

কোনটা ধর্ম আর কোনটা নয়, সেটি বোঝা মানুষের পক্ষে কঠিন নয়। নতুন বাংলাদেশে মানুষের চিন্তায় পরিবর্তন এসেছে। তারা কেবল কথায় নয়, কাজে বিশ্বাস করতে শিখেছেন। কারা বেশি বেশি ধর্ম নিয়ে খোঁটা দিচ্ছেন, নিজেদের ধার্মিক বলে জাহির করছেন সেটিও এখন খোলা চোখে ধরা পড়ছে।

রাজনৈতিক নেতাদের অনেকে এখন ভোরে জেগে উঠছেন। মাথায় টুপি ও মুখে হাসি নিয়ে মসজিদে নামাজ পড়তে যাচ্ছেন। হাজির হচ্ছেন মানুষের সামনে। ভোট চাচ্ছেন। মনে হতে পারে, নির্বাচনের মাঠ হঠাৎ যেন ইবাদতের জায়গা হয়ে উঠেছে।

প্রার্থীর শরীরে ফিনফিনে পাঞ্জাবি। ভোটারের চোখে মুগ্ধতা। আহা, এর চেয়ে ভালো লোক আর হয় না। দলে দলে লোক জড়ো হচ্ছে প্রার্থীকে ঘিরে। কেউ স্লোগান তুলছেন। কেউ ফিসফিস করে বলছেন, একে তো আগে তেমন ধর্মকর্ম করতে দেখিনি!

এই ছোট্ট দৃশ্যটা কি খুব সাধারণ? নাকি এখানে কোনো কিন্তু আছে? ওই যে লোকটা ফিসফিস করে বললেন, এই লোককে আগে ধর্মকর্ম করতে দেখিনি, প্রশ্নটা এখানেই। কেউ বলছেন, ধর্ম এখানে চর্চার জায়গায় নেই, ভোটের বাজারে পণ্যে পরিণত হয়েছে। এক কথায় ‘ধর্মব্যবসা’। আসলে কোনটা ধর্মব্যবসা, কোনটা ধর্মের চর্চা সেটা আমরা অনেক সময় গুলিয়ে ফেলি। যিনি নিয়মিত ধর্ম পালন করেন, তিনি ধর্ম চর্চা করেন। তার উদ্দেশ্য স্রষ্টার সন্তুষ্টি, আত্মশুদ্ধি, আধ্যাত্মিক শান্তি। স্রষ্টা যেভাবে চান সেভাবে তিনি ব্যবসা করেন, চাকরি করেন। এমনকি রাজনীতিও করেন। তার উদ্দেশ্য ব্যক্তিগত লাভ নয়, রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব পালন এবং মানুষের কল্যাণ। তিনি ধার্মিক, ধর্মের চর্চা করেন। যিনি ধর্মের অনুশীলন করেন না, কিন্তু সুবিধামতো ধার্মিক সাজেন, তিনি ধর্মব্যবসায়ী।

ধর্ম চর্চার মানসিকতা নিঃস্বার্থ। সেখানে ‘আমি জিতব’ বড় বিষয় নয়, ‘আমরা ভালো হবো’ এটাই মুখ্য। আর ধর্মব্যবসার মানসিকতা স্বার্থপর। এখানে ধর্ম উপরে ওঠার সিঁড়ি। আমাদের রাজনীতিতে কোনটা বেশি দেখা যাচ্ছে?

নির্বাচন সামনে রেখে অনেক ধর্মনিরপেক্ষ নেতাও এখন ধর্মের কথা বলছেন। ভোটের মাঠে ব্যবহার করছেন ধর্মীয় ভাষা। অথচ কিছু দিন আগেও তাকে বলতে শোনা গেছে, রাষ্ট্র হবে ধর্মনিরপেক্ষ। বলেছেন, রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার বিপজ্জনক। কিন্তু ভোটের মাঠে এসে সেই তিনিই ‘বিপজ্জনক’ভাবে ধর্মের ব্যবহার করছেন। ক্ষমতায় গেলে ইসলামের রীতিনীতিতে দেশ চালাবার অঙ্গীকার করছেন। সত্য বটে, এক সময় ধর্মপ্রাণ মানুষের কিছুটা আস্থা ছিল তাদের ওপর। কিন্তু চব্বিশের বিপ্লবের পর তারা নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। এমনকি দেশে ধর্মীয় গোষ্ঠীর উত্থান হচ্ছে- এ শঙ্কাও প্রকাশ করেন। অর্থাৎ নতুন বাংলাদেশে নিজেদের অবস্থান পাল্টেছেন তারা। রাজনীতিতে এটিকে বলা হয় ‘মাইগ্রেশন অব পলিটিক্স’। এর মানে হলো, সুবিধাজনক সময় বিবেচনা করে রাজনৈতিক অবস্থান বদলে ফেলা। এ ধরনের মাইগ্রেশন নানামাত্রিক সঙ্কট তৈরি করে। সাধারণ মানুষ তাদের বিশ্বাস করতে চান না।

যাদের ব্যাকগ্রাউন্ড ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি, তারা সবসময় ধর্মকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখার কথা বলেন। কিন্তু ভোটের মৌসুম এলে ধর্মকে নানাভাবে ব্যবহার শুরু করেন, তখন সেটাকে কি নীতিগত অবস্থান বলা চলে? এতে ভোটাররা প্রতারিত হন। সহজ-সরল মানুষ বিভ্রান্ত হন। অন্য দিকে, ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তার মানুষও বিভ্রান্তিতে পড়েন। এ দ্বিচারিতা রাজনীতিকে ধোঁয়ার আড়ালে নিয়ে যায়। এতে বিশ্বাস আর কৌশলের ফারাক ঝাপসা হয়। ভেদরেখা মুছে যায়। রাজনীতি তখন আর নীতির জায়গায় থাকে না, হিসাবের জায়গায় চলে যায়। এতে ধর্ম ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ধর্মনিরপেক্ষতাও প্রশ্নের মুখে পড়ে।

এ কারণে সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থান হলো, যার যার বিশ্বাস ও নীতি প্রকাশ্যে এবং স্পষ্টভাবে বলা। কেউ যদি ধর্মকে আদর্শ হিসেবে নিয়ে রাজনীতি করেন, সেটি লুকানোর কিছু নেই। কেউ ধর্মনিরপেক্ষ হলে ভোটের চাপে অবস্থান বদলে ফেলা ঠিক নয়। রাজনীতিতে সততা মানে কেবল দুর্নীতিমুক্ত থাকা না, নিজের আদর্শের প্রতিও সৎ থাকতে হয়।

কেউ সতর্ক করে বলেছিলেন, ধর্ম দিয়ে মানুষকে বোকা বানানো ঠিক নয়, জান্নাতের টিকিট বিক্রি করা অনৈতিক। কিন্তু কে কখন জান্নাতের টিকিট বিক্রি করেছেন, টিকিটের কাউন্টার বসানো হয়েছে কোথায়, এসব তথ্য হাজির করতে পারেননি তারা। যাদের বিরুদ্ধে টিকিট বিক্রির অভিযোগ আনা হচ্ছে, তারা মূলত ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করেন। নিজেদের ইসলামভিত্তিক দল হিসেবে ঘোষণা করেছেন। দলের নামের সাথেও ‘ইসলাম’ শব্দ আছে। ধর্মকে তাদের নীতি, তাদের রাজনীতি, সিদ্ধান্ত নেয়ার মানদণ্ড মনে করেন।

কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি যদি বলে থাকেন, ধর্মের নামে রাজনীতি ইসলাম সমর্থন করে না। আবার সেই তিনি যদি নির্বাচনী মঞ্চে দাঁড়িয়ে ভূমিকম্প, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা সামাজিক অস্থিরতাকে কারো ‘শিরক’ বা ‘মুনাফেকির’ সাথে জুড়ে দিয়ে থাকেন, তাহলে? এক দিকে যদি বলা হয়, ধর্ম দিয়ে বিভাজন সৃষ্টি করা সুবিধাবাদ; অন্য দিকে নির্বাচনী জনসভায় ধর্মীয় পরিচয়ের সূক্ষ্ম ইঙ্গিত দিয়ে প্রতিপক্ষকে চিহ্নিত করা হয়। সেটি কি ধর্মীয় অনুশীলন, নাকি ধর্মীয় আবেগকে রাজনৈতিক অস্ত্র বানানোর কৌশল? যে দল বা নেতৃত্ব নিজেদের ধর্মভিত্তিক বলে দাবি করে না, যারা বলে– আমরা ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার বানাই না। তাদের থেকে ধর্মের সবক আসা কতটা মানায়?

ধর্মভিত্তিক দলগুলো খোলাখুলি বলে, তাদের রাজনীতির ভিত্তি ধর্মীয় আদর্শ। আপনি তাদের সাথে একমত না হতে পারেন; কিন্তু ধর্ম তাদের ঘোষিত অবস্থান। বিপরীতে যারা নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ বলে পরিচয় দেন; কিন্তু প্রয়োজনমতো ধর্মীয় পোশাক ও ভাষা ব্যবহার করেন, তাদের ধর্মব্যবসায়ী বললে কি অপরাধ হবে? কোনো রাজনৈতিক নেতা যখন বলেন, দেশে এত মসজিদ-মাদরাসা, এত আলেম থাকার পরও কেন এত দুর্নীতি! তার কথার মধ্যে সত্য রয়েছে; কিন্তু সেই সত্যের দায় কার? এ দায় রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার। আসলে রাষ্ট্রীয় অনাচার ও দুর্নীতি বন্ধে অবশ্যই যে কাউকে কর্তাসত্তায় আবির্ভূত হতে হয়। আমাদের বাস্তবতা হলো, এ দেশে আলেম বা মসজিদ-মাদরাসা মানুষকে ধর্মের পথ দেখাতে পারে; কিন্তু রাষ্ট্রীয় কাঠামোর দুর্নীতি বন্ধ করা তাদের আওতার বাইরে। মসজিদ, মাদরাসা আর আলেমদের কাছে দুর্নীতি কমানোর ক্ষমতা নেই। এ ক্ষমতা থাকে যারা রাষ্ট্র চালান, তাদের হাতে। যে রাজনৈতিক নেতা এ কথা বলেছেন, তাদের রাষ্ট্র চালানোর অভিজ্ঞতা আছে। কিন্তু তারা দুর্নীতি রোধে ব্যর্থ। এখানে ওই নেতা নিজেকে ‘ধর্মব্যবসা’র সমালোচক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন; কিন্তু এর মাধ্যমে তিনি ধর্মকে ভোটের কাজে লাগাতে চাইছেন। এটিও এক ধরনের ধর্মের ব্যবহার।

দেশের মানুষ ধার্মিক, তাই রাজনীতিবিদরা ধর্মের কথা বলতেই পারেন। ধর্মভীরু সমাজে ধর্ম নিয়ে কথা হবে, সেটিই স্বাভাবিক। কিন্তু কথা বলার ধরন, উদ্দেশ্য আর সময়টাই আসল। ধর্ম যদি আসে সব সময়, সব পরিস্থিতিতে, তাহলে সেটি ধর্মের চর্চা। আর যদি কেবল ভোটের মৌসুমে আসে, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার অস্ত্র হিসেবেÑ সেটি আর ধর্মচর্চা মানে ইবাদত থাকে না; হয়ে পড়ে ধর্মব্যবসা। ধর্ম কেবল নামাজ, দোয়া বা ব্যক্তিগত আচরণে সীমাবদ্ধ না, ধর্ম রাষ্ট্রেও থাকে। আইনের ভাষায় থাকে, নীতিনির্ধারণের দর্শনেও থাকে। রাষ্ট্র যদি ন্যায়বিচার দেয়, দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, দুর্বলকে সুরক্ষা দেয় সেটিও ধর্মীয় নৈতিকতার প্রকাশ। আর রাষ্ট্র যদি অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়, ক্ষমতাকে ‘পবিত্র’ বানায় তাহলে তা অধর্ম।

ধর্ম রাষ্ট্রে থাকবে; কিন্তু কীভাবে? ন্যায়বিচার, জবাবদিহি আর নৈতিকতার ভিত্তি হিসেবে? নাকি কেবল ভোটের মৌসুমে, ব্যানার-ফেস্টুন আর নির্বাচনী ভাষণে? রাষ্ট্র যদি দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, ক্ষমতার অপব্যবহার রুখে দেয়, দুর্বলকে সুরক্ষা দেয় তাহলে তাই ধর্মীয় নৈতিকতার বাস্তব রূপ। রাষ্ট্র যদি অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয় তাহলে তা অধর্ম।

কোনটা ধর্ম আর কোনটা নয়, সেটি বোঝা মানুষের পক্ষে কঠিন নয়। নতুন বাংলাদেশে মানুষের চিন্তায় পরিবর্তন এসেছে। তারা কেবল কথায় নয়, কাজে বিশ্বাস করতে শিখেছেন। কারা বেশি বেশি ধর্ম নিয়ে খোঁটা দিচ্ছেন, নিজেদের ধার্মিক বলে জাহির করছেন সেটিও এখন খোলা চোখে ধরা পড়ছে।

লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত,
[email protected]