মো: আনোয়ার হোসেন আবুড়ী
আমাদের রাজনীতির ইতিহাসে যে ক’জন ব্যক্তিত্ব নিজের কর্ম ও প্রজ্ঞায় স্মরণীয় হয়ে আছেন, তাদের মধ্যে খান এ সবুর অন্যতম। আজ ২৫ জানুয়ারি মহৎপ্রাণ এই রাজনীতিকের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৮২ সালে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে এই দিনে তিনি ইন্তেকাল করেন।
১৯১১ সালের পয়লা ফেব্রুয়ারি খুলনার ফকিরহাট থানার আটটাকা গ্রামে জন্মগ্রহণকারী খান এ সবুর কেবল একজন জনপ্রতিনিধি ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন আধুনিক খুলনার রূপকার এবং উত্তাল দেশভাগ ও স্বাধীনতা আন্দোলনের এক অকুতোভয় সেনানী। তার বর্ণাঢ্য জীবনের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যায় এক ত্যাগী, দূরদর্শী এবং জনদরদি নেতার প্রতিচ্ছবি। খান এ সবুরের মেধার পরিচয় পাওয়া যায় তার ছাত্রজীবনে। ১৯৩২ সালে খুলনা জিলা স্কুল থেকে গণিত ও ইংরেজিসহ চারটি বিষয়ে লেটার মার্ক নিয়ে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হওয়া তৎকালীন সময়ে ছিল এক বিরল কৃতিত্ব। কলকাতার ঐতিহ্যবাহী প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ এবং পরে লর্ড রিপন ল কলেজে আইন অধ্যয়ন তার চিন্তাচেতনাকে শাণিত করেছিল। সেই সময়কার ভারতীয় মুসলমানদের অধিকার আদায়ের লড়াই তাকে আকর্ষণ করে। তাই তিনি জড়িয়ে পড়েন মুসলিম লীগের রাজনীতিতে।
১৯৩৮ সালে ২৭ বছর বয়সে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে খুলনায় মুসলমানদের স্বাধিকার আন্দোলনের মিছিলে নেতৃত্ব দিয়ে নিজের রাজনৈতিক সাহসিকতার জানান দেন তিনি। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় খুলনা নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তা নিরসনে খান এ সবুরের ভূমিকা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তিনি ১৯৪৬ সালে বঙ্গীয় আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৪ আগস্ট পাকিস্তান ও ভারত আলাদা হলেও সীমানা নির্ধারণের জটিলতায় খুলনায় তখন ভারতীয় পতাকা উড়ছিল। ওই চরম উত্তেজনাকর মুহূর্তে ঝুঁকি নিয়ে বাউন্ডারি কমিশনের কাছে আপিল করে তিনি খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটকে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্তিতে ভূমিকা রাখেন।
খান এ সবুরের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম অধ্যায় ছিল ১৯৬২ সালে কেন্দ্রীয় যোগাযোগমন্ত্রী হিসেবে তার কার্যকাল। অবকাঠামোগত উন্নয়নে তিনি যে আমূল পরিবর্তন এনেছিলেন, তার সুফল আজও দক্ষিণাঞ্চলবাসী ভোগ করছেন।
মোংলা বন্দর প্রকল্প : সমুদ্রপথে বাণিজ্যের দ্বার উন্মোচন, শিল্পায়ন : খালিশপুর শিল্পাঞ্চল ও দেশের একমাত্র শিপইয়ার্ড প্রতিষ্ঠা, শিক্ষা ও নগর উন্নয়ন : খুলনা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ (বর্তমান কুয়েট), কেডিএ নিউ মার্কেট এবং খুলনার আধুনিক নগরায়ন। তার দূরদর্শী পরিকল্পনায় খুলনা একটি শিল্পনগরী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। খান এ সবুর কেবল নিজ আদর্শের প্রতি অবিচল ছিলেন না; বরং রাজনৈতিক শিষ্টাচারের ক্ষেত্রেও ছিলেন অনুকরণীয়। আদর্শিক ভিন্নতা থাকলেও জনস্বার্থে ও সহমর্মিতায় তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
১৯৭৯ সালের জাতীয় নির্বাচনে বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়েও তিনি খুলনার তিনটি আসন (খুলনা, সাতক্ষীরা ও তেরখাদা) থেকে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। এটি কেবল তার জনপ্রিয়তার প্রমাণ নয়; বরং জনগণের তার প্রতি অগাধ আস্থার প্রতিফলন। তবে তার জীবনের সবচেয়ে বড় মহত্ত্ব প্রকাশ পায় মৃত্যুর আগে। তিনি নিজের কোটি কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি পরিবারের জন্য না রেখে ‘খান এ সবুর ট্রাস্টের’ মাধ্যমে জনগণের কল্যাণে দান করে গেছেন। একজন রাজনীতিবিদের এর চেয়ে বড় স্বার্থত্যাগ আর কী হতে পারে? তিনি প্রমাণ করেছেন, ক্ষমতা ভোগ নয়; বরং মানুষের সেবাই রাজনীতির প্রকৃত উদ্দেশ্য। আজকের ক্ষয়িষ্ণু রাজনৈতিক মূল্যবোধের কালে খান এ সবুরের মতো ত্যাগী ও উন্নয়নকামী নেতার আদর্শ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
লেখক : স্থায়ী কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ



