বাব আল-মান্দেবে ইয়েমেনের ছায়া : বিশ্ব বাণিজ্যের শ্বাসরোধের আশঙ্কা, সামনে যুদ্ধের অপ্রত্যাশিত চমক

সাম্প্রতিক মূল্যায়নে দেখা যাচ্ছে, ইয়েমেন যদি সরাসরি আরো সক্রিয়ভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও শক্তির সমীকরণও বদলে যেতে পারে।

সৈয়দ মূসা রেজা
বাব আল-মান্দেব
বাব আল-মান্দেব |ছবি : তাসনিম নিউজ অ্যাজেন্সি

ইরানের সাথে ইহুদিবাদী ইসরাইলের চলমান যুদ্ধের মধ্যে নতুন এক মাত্রা যোগ হচ্ছে—একদিকে ইয়েমেনের কৌশলগত অবস্থান ঘিরে বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি প্রবাহের ওপর সম্ভাব্য বড় ধরনের চাপের আশঙ্কা, অন্যদিকে যুদ্ধক্ষেত্রে আসছে ‘অপ্রত্যাশিত চমক’—এমনই সতর্কবার্তা দিচ্ছেন তেহরানের সামরিক বিশ্লেষকেরা।

সাম্প্রতিক মূল্যায়নে দেখা যাচ্ছে, ইয়েমেন যদি সরাসরি আরো সক্রিয়ভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও শক্তির সমীকরণও বদলে যেতে পারে।

তাসনিম নিউজ অ্যাজেন্সির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইয়েমেনের সবচেয়ে বড় শক্তি তার ভৌগোলিক অবস্থান। লোহিত সাগরের মুখে অবস্থিত বাব আল-মান্দেব প্রণালী এবং তার সাথে যুক্ত সুয়েজ খাল—এই দু’টি পথই বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিরা। এ পথ দিয়েই ইউরোপ-এশিয়ার মধ্যে বিপুল পণ্য ও জ্বালানি পরিবহন হয়। এই রুট কার্যত ইয়েমেনি বাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্রের আওতার মধ্যেই রয়েছে। ফলে পরিস্থিতি এমন জায়গায় দাঁড়াতে পারে, যেখানে সামরিক সঙ্ঘাত সরাসরি বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে আঘাত করবে।

ইরানের বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি ইয়েমেন এই রুটকে লক্ষ্য করে চাপ সৃষ্টি করে বা কার্যত বন্ধ করে দিতে পারে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর চাপ অনেক গুণ বেড়ে যাবে। কারণ বিকল্প পথ যেমন আফ্রিকার চারপাশ ঘুরে যাওয়া—তা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। এতে শুধু জ্বালানির দামই বাড়বে না, বরং বৈশ্বিক বাজারে সরবরাহ সঙ্কটও তৈরি হতে পারে।

এখানেই শেষ নয়। সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরতা কমাতে পূর্বাঞ্চল থেকে লোহিত সাগর উপকূল পর্যন্ত পাইপলাইন তৈরি করেছে, যার মাধ্যমে তারা তেলের একটি অংশ রফতানি করে। কিন্তু এই অবকাঠামোও ইয়েমেনের ভৌগোলিক নাগালের বাইরে নয়। যদি এই পাইপলাইন লক্ষ্যবস্তু হয় এবং কার্যত অচল হয়ে পড়ে, তাহলে সৌদি আরবের তেল রফতানি প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে আসতে পারে। এমনটিহলেতা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা দেবে।

এ প্রেক্ষাপটে ইয়েমেনের অংশগ্রহণ আর শুধু একটি সামরিক পদক্ষেপ নয়; বরং এটি একটি কৌশলগত লিভার। এর মাধ্যমে গোটা যুদ্ধের গতিপথ বদলে দিতে পারে। অর্থাৎ, যুদ্ধ শুধু মিসাইল বা ড্রোনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না—এটি এখন বাণিজ্য পথ, জ্বালানি সরবরাহ এবং অর্থনৈতিক চাপের লড়াইয়েও রূপ নিচ্ছে।

এদিকে, ইয়েমেনি সামরিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আবদুল গনি আল-জুবাইদি সতর্ক করে বলেছেন, আগামী দিনগুলো যুদ্ধক্ষেত্রে বড় ধরনের চমক নিয়ে আসতে পারে। তার মতে, ময়দানে এখন প্রতিরোধ শক্তির হাতেই উদ্যোগ রয়েছে এবং তারা এমন কিছু পদক্ষেপ নিতে পারে, যা পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ নতুন দিকে নিয়ে যাবে। তিনি ইঙ্গিত দেন, সামনে এমন ঘটনারবিকাশ ঘটতে পারে যার স্বরূপ এখনো পুরোপুরি প্রকাশ পায়নি।

সব মিলিয়ে পরিস্থিতি নতুন একপর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে। এ পর্যায়ে ইয়েমেনের ভূমিকাকে আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বাব আল-মান্দেব ও সুয়েজের মতো গুরুত্বপূর্ণ রুট যদি সঙ্ঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে, তাহলে এই যুদ্ধ শুধু একটি আঞ্চলিক সংঘর্ষ থাকবে না—বরং তা সরাসরি বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নে পরিণত হবে। আর সেইসাথে যুদ্ধক্ষেত্রে আসন্ন ‘চমক’—এটিও ইঙ্গিত দিচ্ছে, সামনে সময়টা আরো অনিশ্চিত এবং বিস্ফোরক হতে যাচ্ছে।

সূত্র : তাসনিম নিউজ অ্যাজেন্সি