ইসলামী ব্যাংক ঘুরে দাঁড়িয়েছে

আশা করা যায়, ইসলামী ব্যাংককে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হবে না; বরং অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প ফিরবে মানুষের মুখে মুখে।

সিরাজুল ইসলাম

দেশের ব্যাংক খাত গত এক দশকে যেসব উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেছে, তার সবচেয়ে নাটকীয় অধ্যায়ে ছিল ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। একসময় দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী, সুশৃঙ্খল ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পরিচালিত ব্যাংকটির ওপর নেমে আসে ভয়াবহ সঙ্কট। একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠী ব্যাংকটি দখল করে নেয়। নিয়োগ-বিনিয়োগ, টাকা উত্তোলন সব ক্ষেত্রে অস্বচ্ছ সিদ্ধান্ত নেয় এবং হাজার হাজার কোটি টাকার লুটপাট চালায়। অনেক গ্রাহক মনে করেছিলেন, ইসলামী ব্যাংক আর টিকবে না; কিন্তু ইতিহাস বলে– মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো প্রতিষ্ঠান সহজে ধ্বংস হয় না।

ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পর ব্যাংক খাতে পরিবর্তনের যে সুযোগ সৃষ্টি হয় তার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হয় ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকটি পুনরুদ্ধার করতে কার্যকর, নিরপেক্ষ এবং সাহসী সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সেই সিদ্ধান্ত ব্যাংকের ভাগ্য বদলে দেয়। একসময় রুগ্ণ হয়ে পড়া ব্যাংকটি আবার আগের রূপে ফিরছে। ইসলামী ব্যাংকের ঘুরে দাঁড়ানো দেশের অর্থনীতি এবং ইসলামী ব্যাংকিং ক্ষেত্রকে টিকিয়ে রাখতে অপরিহার্য ছিল।

নতুন পথচলার শুরু : ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট দিনটি ইসলামী ব্যাংকের জন্য টার্নিং পয়েন্ট। সে দিন বাংলাদেশ ব্যাংক দীর্ঘ দিনের অযোগ্য, বিতর্কিত ও রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয়। পরদিন, ২২ আগস্ট, পাঁচজন অভিজ্ঞ ব্যাংকার ও স্বনামধন্য ব্যক্তিত্বকে স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। নতুন পর্ষদের প্রথম কাজ ছিল গ্রাহকদের হারানো আস্থা দ্রুত ফিরিয়ে আনা। তারা বুঝেছিলেন, দেশে ইসলামী ব্যাংকের প্রতি মানুষের ভরসা শুধু অর্থনৈতিক নয়, আবেগের বিষয়ও। সেই আবেগ ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল পুরনো পর্ষদের অনিয়ম। তাই নতুনরা সিদ্ধান্ত নেন, পরিকল্পিত ও ধাপে ধাপে ব্যাংক পুনর্গঠন করা হবে। নতুন পর্ষদ যে সিদ্ধান্ত নেয়, তা বাস্তবায়নে দেরি করেনি। ফলে পুনর্গঠন প্রক্রিয়া দ্রুত ও লাগসই হয়েছে।

তিন ধাপের পুনর্গঠন পরিকল্পনা : নতুন পর্ষদ একটি কার্যকর পুনর্গঠনের রোডম্যাপ ঘোষণা করে, যা তিন ভাগে সাজানো হয়। প্রথম ধাপ ছিল তারল্যসঙ্কট নিরসন। এ ধাপ বাস্তবায়ন করা হয় ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত। দ্বিতীয় ধাপকে ঘুরে দাঁড়ানোর বছর হিসেবে ঠিক করা হয়েছে। এ ধাপ ২০২৫-২৬ পর্যন্ত বিস্তৃত।

অর্থাৎ ২০২৫-২৬ সাল এ সময়ে ইসলামী ব্যাংককে ঘুরে দাঁড়াতে হবে এবং নতুন পর্ষদ সেভাবে কাজ করবে। তৃতীয় ধাপ হলো, এগিয়ে যাওয়ার বছর ২০২৭ থেকে ২০২৯ সাল পর্যন্ত। সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং ছিল প্রথম ধাপের বাস্তবায়ন। কারণ তখন ব্যাংকের আরটিজিএস, এনপিএসবি, ক্লিয়ারিং– সব জায়গায় বহুবিধ সমস্যা ছিল। পরিকল্পিতভাবে কঠোর পরিশ্রমে সে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা হয়েছে।

ঋণাত্মক অ্যাকাউন্ট এখন ইতিবাচক : ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ইসলামী ব্যাংক সবচেয়ে বড় সমস্যা তারল্যসঙ্কট কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়। যে প্রিন্সিপাল অ্যাকাউন্ট দীর্ঘ দিন ধরে ঋণাত্মক ছিল, তা ইতিবাচক হয়ে ওঠে। ফলে ব্যাংকের ক্লিয়ারিং, আরটিজিএস এবং এনপিএসবি লেনদেন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হয়। গত ডিসেম্বরের পর থেকে গ্রাহকরা যখন ইচ্ছা টাকা তুলতে পারছেন। এর ফলে গ্রাহকের আস্থা ফিরে আসছে। আস্থাই ব্যাংকের সবচেয়ে বড় পুঁজি।

সিআরআর-এসএলআর ঘাটতি কাটিয়ে উদ্বৃত্তে যাত্রা : সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো, ২০২৩ সালের আগস্টে সিআরআর ঘাটতি ছিল দুই হাজার ৩০৮ কোটি টাকা; কিন্তু ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মধ্যে ব্যাংক শুধু ঘাটতি কাটিয়ে ওঠেনি, বরং উদ্বৃত্ত অবস্থানে পৌঁছেছে। একইভাবে ২০২৩ সালের আগস্টে এসএলআর ঘাটতি ছিল এক হাজার ৬৫ কোটি টাকা। এখন সেখানে উদ্বৃত্ত সঞ্চয়ন; এমন উদাহরণ দেশের ব্যাংক খাতে বিরল।

প্রবাসীদের আস্থা ফিরে এসেছে : আওয়ামী আমলে বিনিয়োগ অনিয়মে ইসলামী ব্যাংকের প্রতি প্রবাসীদের আস্থা মারাত্মকভাবে কমে গিয়েছিল। এতে রেমিট্যান্স-প্রবাহও মারাত্মকভাবে কমে যায়। কিন্তু ২০২৫ সালের এপ্রিলে কাতার সফরে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাথে মতবিনিময়কালে প্রবাসীরা প্রকাশ্যে ইসলামী ব্যাংকের প্রতি নতুন করে আস্থা ব্যক্ত করেন। এর ফলে রেমিট্যান্স আবার দ্রুত বাড়ছে।

বিদেশী নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়োগ : নতুন পর্ষদ সমস্যার ওপর পর্দা দেয়নি, বরং সমস্যার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে আন্তর্জাতিক মানের বিদেশী অডিট ফার্ম নিয়োগ করে। এদের কাজ ছিল বিনিয়োগ, বৈদেশিক বাণিজ্য, মানবসম্পদ, ট্রেজারি এবং অফশোর ব্যাংকিংসহ কয়েকটি বিভাগে অতীতের অনিয়ম তদন্ত করা। বোঝা যায়, সার্বিকভাবে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে নতুন পর্ষদ অঙ্গীকারাবদ্ধ।

আমানতে রেকর্ড বৃদ্ধি : ২০২৪ সালের শেষ দিন ৩১ ডিসেম্বর, ইসলামী ব্যাংকের আমানত ছিল এক লাখ ৬১ হাজার এক কোটি টাকা। সেখানে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর তা বেড়ে দাঁড়ায় এক লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ- এক বছরে বেড়েছে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। এটি শুধু সংখ্যাগত বৃদ্ধি নয়; এটি গ্রাহকের আস্থার বহিঃপ্রকাশ। এখন ব্যাংকের মোট অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ২.৫ কোটি। এর মধ্যে মুদারাবা বিশেষ সঞ্চয়ী হিসাব ১৮ লাখ আট হাজার ৭৫৯টি এবং আল ওয়াদিয়াহ চলতি হিসাব ছয় লাখ ৮৬ হাজার ৮৭৫টি। এর মাধ্যমে ব্যাংকের গ্রাহকভিত্তি নতুনভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে পরিষ্কার হয়।

সবখানে সুসংবাদ : ব্যাংকের অফশোর ব্যাংকিং ইউনিট আবার সচল হয়েছে। খেলাপি বিনিয়োগ আদায় বাড়ছে। বৈদেশিক বাণিজ্যে চক্র ভেঙে এসেছে স্থিতিশীলতা। ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবায় নতুন নতুন আপগ্রেড যুক্ত হচ্ছে। সবমিলিয়ে ব্যাংকটি এখন কেবল ঘুরে দাঁড়াচ্ছে না; বরং আবার শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকের আসনে উঠে আসছে।

কেন ইসলামী ব্যাংক পুনরুদ্ধার সম্ভব হলো? এর কারণ আদালত, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও নতুন সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা। এর পাশাপাশি নতুন পর্ষদ ছিল অভিজ্ঞ, সৎ ও স্বচ্ছ। গ্রাহকরাও এই ব্যাংককে নিজের ব্যাংক মনে করেন। এ ছাড়া ব্যাংকের ভিত্তি অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল।

অতীতে রাজনৈতিক প্রভাবশালী গোষ্ঠীর দখল-অনিয়ম-লুটপাট ইসলামী ব্যাংককে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়। কিন্তু সেই অন্ধকার সময়ের অবসানের পর ব্যাংকটি প্রমাণ করেছে– স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও সুশাসন থাকলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানও নতুন করে জন্ম নিতে পারে। ইসলামী ব্যাংক আজ যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, সেটি শুধু ব্যাংকের নয়, বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে নবজন্মের উপাখ্যান। দেশের জন্য গর্বের বিষয়।

আশা করা যায়, ইসলামী ব্যাংককে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হবে না; বরং অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প ফিরবে মানুষের মুখে মুখে।

লেখক : সাংবাদিক