মো: জাহাঙ্গীর আলম
স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে জন্মানোর সুবাদে অভ্যন্তরীণ অনেক চড়াই-উৎরাই দেখতে হয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান। সে গণ-অভ্যুত্থানের পর সত্যিকার আশার সঞ্চার হয়েছে। একটি স্পষ্ট রূপরেখা তৈরি হয়েছে যে, ভবিষ্যতে কেমন বাংলাদেশ দেখতে চাই।
গত ৫৪ বছরে আমরা বড় তিনটি দলের শাসন দেখেছি, কোনোটিই জনআকাক্সক্ষা পূরণে সক্ষম হয়নি অথবা বলতে পারি– করার চেষ্টাও করেনি। তাই এবার দরকার কোনো তৃতীয় ধারা, যারা সত্যিকার অর্থেই দেশ ও জাতিকে আলোর পথে নিয়ে যাবে। এই আকাঙ্ক্ষা থেকেই আগামীর শাসকদের জন্য তুলে ধরতে চাই, আমাদের কল্পিত বাংলাদেশের সেই রূপরেখা। প্রথমত, প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকে একটি সত্যিকার অর্থে স্বাধীন, সার্বভৌম ও শক্তিশালী দেশ হিসেবে দেখতে চাই। তাই যারাই সরকার গঠন করবে তাদের কাছে প্রথম চাওয়া হবে, একটি সম্পূর্ণ আত্ম-মর্যাদাসম্পন্ন ও স্বীয় দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট পররাষ্ট্রনীতি অবলম্বন করা, কখনোই অন্য দেশের মুখাপেক্ষী হয়ে বা তাদের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য নয়। আর শক্তিশালী মানে অবশ্যই প্রতিরক্ষা বাহিনীর আধুনিকীকরণ ও সম্প্রসারণ বুঝাচ্ছি। নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে, প্রথমেই বলতে হয়, পরিত্যক্ত লালমনিরহাট বিমানবন্দরকে আধুনিকীকরণের মাধ্যমে সেখানে প্রস্তাবিত অ্যারোস্পেস বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পাশাপাশি একটি আধুনিক যুদ্ধবিমান-সংবলিত স্কোয়াড্রনসহ পূর্ণাঙ্গ এয়ার বেজ তৈরি করতে হবে, যা উত্তরাঞ্চলের আকাশসীমা নিরাপদ করার পাশাপাশি শিলিগুড়ি করিডোরকে কেন্দ্র করে প্রতিবেশী দেশের আক্রমণাত্মক কার্যকলাপ থেকে আত্মরক্ষায় সহায়ক হবে। ফেনীতে আমাদের চিকেন নেক-খ্যাত সরু করিডোরটি (মাত্র ২৮ কিলোমিটার চওড়া) যার মাধ্যমে পুরো চট্টগ্রাম বিভাগসহ বঙ্গোপসাগর দেশের মেইন ল্যান্ডের সাথে সংযুক্ত এবং সেটিকে বিচ্ছিন্ন করা গেলে বাংলাদেশ একটি ‘ল্যান্ডলকড’ দেশে পরিণত হবে। আর এরকম কোনো দেশের বাণিজ্য ও অর্থনীতি স্বাধীনভাবে পরিচালনা করা যায় না বিধায় আমাদেরকে পূর্ণরূপে ভারতের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে হবে। তখন তো দেশের সার্বভৌমত্ব বলে আর কিছু অবশিষ্ট থাকবে না। যে ফেনী নদী হতে পারত আমাদের প্রতিরক্ষার সম্মুখসারি (উবভবহংব ঋৎড়হঃ খরহব) সেই নদীর উপরই ব্রিজ (রামগড়-সাব্রুম ব্রিজ) তৈরি করে আমরা শত্রুকে অতি সহজেই আমন্ত্রণ জানিয়েছি; সত্যি যেন দেখার কেউ নেই। সুতরাং বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য সেখানে একটি পূর্ণাঙ্গ ম্যাকানাইজড ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশন গড়ে তুলতে হবে এবং সেটিকে সাপোর্ট দেয়ার জন্য কুমিল্লাতে পূর্ণাঙ্গ এয়ারবেজ তৈরি করতে হবে। এক লাখ ২৪ হাজার বর্গ-কিলোমিটারের বিশাল সমুদ্রসীমা (যার ইইজেড ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত) সার্বক্ষণিক তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য শক্তিশালী নেভাল ফোর্স তৈরি করতে হবে, যাতে থাকবে একটি সাব-মেরিন ফ্লিটসহ অন্যান্য সার্ভিলেন্স ও অপারেশনের সাজসরঞ্জাম।
এবার অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোর উপর আলোকপাত করতে চাই এবং সে ক্ষেত্রে প্রথমত, দেশে সত্যিকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বিচার বিভাগ থাকবে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও ন্যায়পরায়ণ, যারা ইনসাফের সাথে বিচারকার্য পরিচালনা করবেন। তবে বিচারকদেরও জবাবদিহির মধ্যে আনতে হবে। গণতান্ত্রিক দেশে যেখানে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতিকেও জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হয়, তাই বিচার বিভাগও এর আওতাবহির্ভূত হতে পারে না।
সংসদ সদস্যদের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করতে হবে, যা হতে পারে স্নাতক বা এর সমমান। সংসদ অধিবেশনের নামে জনগণের কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে আর কোনো নর্তকী বা শিল্পী অভিনেতার আড্ডাখানা হোক, তা আর কেউই দেখতে চায় না। সংসদ সদস্যদের উন্নয়নের নামে নিজ নিজ এলাকায় রাস্তা ও ব্রিজ-কালভার্ট বানানো ও কাবিখার চাল বিতরণ করা ইত্যাদি হতে বিরত থেকে সত্যিকার ও জনকল্যাণমূলক আইন প্রণয়ন করার কাজে ব্যস্ত রাখতে হবে। তাদেরও ট্যাক্স দিতে উৎসাহিত করতে হবে, সাথে বন্ধ করতে হবে ট্যাক্স-ফ্রি গাড়ি আমদানি ও ঢাকা শহরে প্লট-ফ্ল্যাট পাওয়ার বন্দোবস্ত।
অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে হবে। পুরনো ব্যাংক আইনগুলো বাতিল করে নতুন ও যুগোপযোগী আইন প্রণয়নের মাধ্যমে দুর্নীতিগ্রস্ত হওয়ার প্রবণতা থেকে ব্যাংকগুলোকে দূরে রাখতে হবে। সেই সাথে বাংলাদেশ ব্যাংককে একটি সত্যিকার স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যেখানে সরকারের কোনো খবরদারি বা প্রভাব থাকবে না। দ্রব্যমূল্য সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে সার্বক্ষণিক বাজার তদারকির মাধ্যমে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম সর্বসাধারণের নাগালের মধ্যে ও স্থিতিশীল রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। বেকারত্ব দূরীকরণে নতুন নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। সে লক্ষ্যে ব্যবসায়-বান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে, করের মাত্রা কমিয়ে এর আওতা বাড়াতে হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের উপর সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে আর এ জন্য প্রত্যাহারকৃত সামরিক ক্যাম্পগুলো পুনঃস্থাপন করতে হবে। সেখানে বিভিন্ন রকম এনজিওর কার্যক্রমের ওপর কড়া তদারকি করতে হবে। বন্ধুভাবাপন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে সম্মানজনক প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা করতে হবে। দুদককে সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী করে দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে হবে। প্রয়োজনে দুর্নীতির মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পন্ন করার জন্য আইসিটির আদলে আলাদা আদালত গঠন করতে হবে। অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। আগে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার ব্যবস্থা করতে হবে।
একটি দেশ ও জাতিকে প্রাথমিকভাবে মূল্যায়নের জন্য সে দেশের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও প্রচলিত ব্যাংক নোটের দিকে দৃষ্টিপাত করতে হয়, আর তাই এ দুটো ক্ষেত্রে সুন্দর ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার আমূল পরিবর্তনের মাধ্যমে ঢাকাসহ সারা দেশ থেকে যানজট সমূলে উৎপাটন করতে হবে। এ জন্য আধুনিক বৈজ্ঞানিক পন্থা অবলম্বন ও ট্রাফিক আইন সংশোধন করে তা কঠোরভাবে প্রয়োগের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অপ্রিয় হলেও সত্য, বাংলাদেশের ব্যাংক নোটগুলো অত্যন্ত নিম্নমানের ও আকার-আকৃতির। কাগজের নোট বিলুপ্ত করে পলিমার বেইজড নোট প্রচলন করতে হবে, যা দীর্যদিন নাড়াচাড়া হলে এমনকি পানিতে ভিজলেও কোনো পরিবর্তন হবে না। টাকার গায়ে বিতর্কিত কোনো ছবি না রেখে এমনভাবে ডিজাইন করা, যা সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে ধারণ ও প্রকাশ করে।
পরিশেষে বলতে চাই, শিক্ষাব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে ঢেলে সাজাতে হবে, যার সুফল পেতে হয়তো ২০-২৫ বছর লেগে যাবে। তবুও দেশ তখন একটি আধুনিক ও সত্যিকার শিক্ষায় শিক্ষিত একটি জাতি পেতে সক্ষম হবে। একটি আধুনিক ও অভিন্ন মানের শিক্ষা কারিকুলাম তৈরি করতে হবে, যা সাধারণ স্কুল থেকে শুরু করে ইংরেজি মাধ্যম, হাফেজি, কওমি ও ইবতেদায়ি মাদরাসাসহ সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ানো হবে। প্রয়োজনে এ শিক্ষানীতি সংবিধানে সন্নিবেশিত করতে হবে, যেন পরবর্তীতে অন্য সরকার এসে তা পরিবর্র্তন করতে না পারে। ছোটবেলায় কোমলমতি শিক্ষার্থীদের যখন বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকমের ইতিহাস শিখানো হয় তখন তারা বড় হয়ে যার যারটা ধারণ করে এবং আর কখনো একমত হতে পারে না। ফলে একটি বিভক্ত জাতি তৈরি হয়, যারা আর কখনোই এমনকি জাতীয় ও দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়েও একমত হতে পারে না। আর এ সুযোগটিই গ্রহণ করে আন্তর্জাতিক, এমনকি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক শক্তিগুলো।
কোনো একটি জাতিকে ধ্বংস করতে হলে তার মাত্র চারটি জিনিস ধ্বংস করলেই যথেষ্ট। যেগুলো হলো, সে দেশের সামরিক শক্তি, ধর্মীয় মূল্যবোধ, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। দুর্ভাগ্যজনক হলেও এটি সত্য, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর সবগুলোই অতি সুচারুরূপে সম্পন্ন করা হয়ে গেছে। সুতরাং সময় এসেছে এখন যেকোনো মূল্যে এগুলোর পুনরুদ্ধার করার।
এ ছাড়া রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট, রোড, রেল, বিমান, বন্দর, গঞ্জ-গ্রাম ইত্যাদির উন্নয়ন সাধন, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পানির সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন, পর্যাপ্ত ও যথোপযুক্ত সার, বীজ সরবরাহসহ কৃষিজাত পণ্যের সংরক্ষণ ও সঠিক দাম নির্ধারণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি রুটিন কাজ হিসেবে যথাযথভাবে প্রতিপালন করতে হবে। তা হলেই বাংলাদেশ হয়ে উঠবে সত্যিকার সমৃদ্ধ, সুজলা ও সুফলা, জাতি হয়ে উঠবে আত্মসম্মানী ও গর্বিত।
লেখক : কলামিস্ট, গবেষক



