ব্যালটে তরুণ ভোটার, ব্যানারে তরুণ প্রার্থী

ধরা যাক, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমানের কথা। তিনিও একজন তরুণ। তিনি ধানের শীষে ভোট দেবেন, এটিই স্বাভাবিক। তার দেখাদেখি বাংলাদেশের অন্য তরুণরাও কি ধানের শীষে ভোট দেবে? অথবা তরুণদের একটি অংশ যদি দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেবে বলে ঠিক করে, তাহলে কি ধরে নেয়া হবে– জাইমা রহমানও দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেবেন!

এবারের নির্বাচনে তরুণ ভোটাররা কোন দিকে যাবে? তারা কি এবার ‘কিংমেকার’? এসব প্রশ্ন এখন কমন। এ নিয়ে নানামাত্রিক বিশ্লেষণ প্রকাশ হচ্ছে সংবাদমাধ্যমে। বলা হচ্ছে– তরুণ প্রজন্ম এবার তরুণ প্রার্থীদের ভোট দেবে। এ নির্বাচন হবে তারুণ্যের নির্বাচন। অর্থাৎ– তরুণরা এক হয়ে যে দিকে রায় দেবে, তারাই সরকার গঠন করবে! তরুণরা আসলে এক হবে কোন কায়দায়? ব্যাপারটি কি এমন, একজন তরুণ এসে ঘোষণা দেবে– আমরা এবার ‘অমুক’ মার্কায় ভোট দেবো, সাথে সাথে সব তরুণ ‘হই হই’ করে সেই প্রতীকে সিল মেরে আসবে?

ধরা যাক, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমানের কথা। তিনিও একজন তরুণ। তিনি ধানের শীষে ভোট দেবেন, এটিই স্বাভাবিক। তার দেখাদেখি বাংলাদেশের অন্য তরুণরাও কি ধানের শীষে ভোট দেবে? অথবা তরুণদের একটি অংশ যদি দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেবে বলে ঠিক করে, তাহলে কি ধরে নেয়া হবে– জাইমা রহমানও দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেবেন?

না, জাইমা রহমানের দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেয়ার কথা নয়। একইভাবে জামায়াত-সমর্থক বা এনসিপিপন্থী তরুণদের ভোট যাবে তাদের জোট থেকে ঠিক করা প্রার্থীর পক্ষে। আর যে তরুণরা কোনো দল করে না, অতি-সাধারণ, তাদের ভোট কোথায় যাবে? এর জবাব খুব কঠিন নয়। নির্দলীয় তরুণদের একটি অংশ পারিবারিক রেওয়াজ অনুযায়ী ভোট দেবে। অর্থাৎ– বাবা ধানের শীষে ভোট দেন, সন্তানও তাই করবে। বাবা দাঁড়িপাল্লা বা জামায়াত সমর্থিত প্রতীকে ভোট দিয়ে থাকলে সেই পরিবারের সন্তানও এবার সেখানে ভোট দেবে।

কিন্তু যেসব পরিবারের রেওয়াজ ছিল নৌকায় ভোট দেয়া, তাদের গতি কী হবে? এদের নিয়ে চলছে টানাটানি। এর মধ্যে তাদের অনেকের মন পরিবর্তন হয়েছে। কারণ চোখের সামনে শেখ হাসিনার নৃশংসতা দেখেছে তারা। তবে কিছু ‘কট্টর’ সবসময় থাকে। এরা এখনো শেখ হাসিনা ফিরবেন বলে আশায় বসে আছে। এসব ‘কট্টর’ আদৌ কি ভোট দিতে যাবে? যদি যায়, কোন মার্কায় ভোট দেবে?

একক কোনো প্রতীকে এ শ্রেণীর ভোট পড়বে বলে মনে হয় না। তা ছাড়া আরো একটি প্রবণতা লক্ষণীয়, ‘কট্টর’ আওয়ামী পরিবারের অনেক তরুণও এখন ইতিবাচক চিন্তা করছে। জুলাই আন্দোলনে ঝুঁকি নিয়ে অনেক তরুণকে ছাত্রলীগ থেকে পদত্যাগ করতে দেখা গেছে। তাদের এ পদত্যাগ অন্যদের সাহস জুগিয়েছে। জুলাইয়ের সাহসের ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে নতুন বাংলাদেশ। নতুনকে স্বাগত জানানো তারুণ্যের প্রবণতা। সব তরুণের মধ্যে এই একটি বিষয় কমন। পুরনো ভেঙে এগিয়ে যেতে চায় সামনে।

অনেক তরুণ প্রবীণদের মাধ্যমে প্রভাবিত হচ্ছে। অনেকে এখনো মনে করছে, শেখ হাসিনার নৌকা ফিরে এলে বাংলাদেশের জন্য ভালো হবে; কিন্তু তরুণদের মূল স্রোতের প্রবাহ যাচ্ছে ইতিবাচক বাংলাদেশের দিকে। সেই স্রোতের প্রবাহ ইঙ্গিত দেয় নতুন কিছুর। এটি বাংলাদেশের জন্য আশাজাগানিয়া।

তারুণ্যের স্রোতের প্রবাহ কি সবসমই ইতিবাচক হয়? সামগ্রিকভাবে বলা যায়, না। তবে তরুণ বয়সে মানুষ অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে বেশি সংবেদনশীল থাকে। ন্যায়, সততা ও মানবিক মূল্যবোধ তখন বেশি কাজ করে। তরুণদের পরিবর্তনের আকাক্সক্ষা থাকে। তারা স্থবিরতা পছন্দ করে না। সমাজ, রাষ্ট্র বা নিজের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার তাগিদে তারা ভালোকে বেছে নেয়। ভালো কিছু গড়ার স্বপ্ন ও আশা তাদের সৎ পথে নিয়ে যায়। তা ছাড়া তরুণদের নাগালে থাকে প্রযুক্তি, আধুনিক শিক্ষা, তথ্যপ্রবাহ। এগুলো তাদের সচেতন করে। সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ হতে শেখায়। আদর্শ, আশা, শক্তি ও পরিবর্তনের স্বপ্ন– এই চারটি বিষয় তরুণদের ভালোর দিকে টেনে নেয়। জুলাই বিপ্লব হয়েছে তরুণদের নেতৃত্বে। তরুণদের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছিল বাংলাদেশ। এতে শেখ হাসিনা দেশ থেকে পালাতে বাধ্য হন।

তরুণদের শক্তি এখানে আলাদা। তারা জাগরণ তৈরি করে, জাগরণে সবার আগে সাড়া দেয়। তরুণ মানে বয়সে তরুণ হতে হবে– এমন নয়। প্রবীণরা যদি নতুনের কথা বলতে পারেন, তাহলে তারুণ্যের জোয়ার তাদের পেছনে গিয়ে দাঁড়ায়। তরুণ মানে তরুণকে ভোট দেবে, বিষয়টি এমনও নয়। তরুণরা কোনো একক ব্লক নয়। কোনো ছাঁচে ফেলা ভোটব্যাংকও নয়। তারা বিভক্ত ও বহুমুখী। তবে তরুণদের সাধারণ প্রবণতা– তারা প্রশ্ন করতে জানে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদগুলোতে তারা প্রশ্ন করেছিল। প্রশ্নের জবাব যাদের থেকে ভালো পাওয়া গেছে, তাদের পক্ষে একচেটিয়া ঝুঁকে যেতে দেখা গেছে শিক্ষার্থীদের। ক্যাম্পাসগুলোতে শিক্ষার্থীদের এ জোয়ার জাতীয় রাজনীতিতেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। কারণ ডাকসু-সহ বেশ কয়েকটি ছাত্রসংসদে নির্বাচিত হওয়ার পর প্রতিনিধিরা বাস্তবসম্মত কিছু কাজ করছেন। সাত-আট বছরের কাজ সামাল দিয়ে দিয়েছেন সাত-আট মাসে। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অবশ্য নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অসহযোগিতা করছে প্রশাসন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনে থাকা অনেকে এখন নিজেদের একটি রাজনৈতিক দলের অনুগত হিসেবে প্রমাণ করতে মরিয়া। তাদের ধারণা, কোনোরকম একটি নির্বাচন হয়ে গেলে পরিস্থিতি পাল্টে যাবে। তখন পুরনো কায়দায় ‘লুটে’ নেয়ার সুযোগ হবে তাদের। সমস্যাটি ঠিক এখানে। তরুণদের একটি বড় অংশ ‘লুটে’ নিতে দিতে চায় না। তাদের কাছে দুর্নীতি মানে নিজেদের ক্ষতি।

তরুণরা নানা দল, নানা-মতে বিভক্ত হলেও তাদের ভাবনায় কমন কিছু বিষয় থাকে। তাদের মধ্যে সাধারণত নৈতিক আদর্শ ও ন্যায়বোধ থাকে। তারা আপসকামী হয় না। ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবে। ক্যারিয়ার নিয়ে উদ্বেগে থাকে। একটি ভালো ক্যারিয়ার নিশ্চিত করার স্বার্থে সামনে কোনো বাধা থাকুক, তা চায় না। এরা মেধার স্বীকৃতি চায়। শিক্ষা বা চাকরিতে বৈষম্য থাকলে অনিরাপদ মনে করে। তবে সব তরুণ দুর্নীতিবিরোধী থাকে, বিষয়টি এমন নয়। দীর্ঘ দিন বেকার থেকে এবং সিস্টেমের চাপে তরুণরাও দুর্নীতি শিখে যায়। অনেকসময় হতাশা থেকে আপস করে অনেক তরুণ।

এবারের নির্বাচনে তরুণ ভোটারের সংখ্যা মোট ভোটারের তিন ভাগের এক ভাগ। মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৬ লাখের বেশি। ১৮-৩৬ বছর বয়সী ভোটারের সংখ্যা সাড়ে চার কোটির বেশি। এবার ভোটারদের মতো প্রার্থীদের মধ্যেও তরুণের উপস্থিতি চোখেপড়ার মতো। মোট প্রার্থীর প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ ২৫-৪৫ বছরের মধ্যে। তরুণরা এখন কেবল ভোটার নয়, ক্ষমতার দাবিদার হয়ে উঠেছে। তবে একজন তরুণ ভোটার একজন তরুণ প্রার্থীকে ভোট দেবে, এমন কোনো হিসাব নেই। প্রার্থীর বয়স নয়; বরং তার চিন্তা, অবস্থান ও বিশ্বাসযোগ্যতা এখানে বিষয় হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেক তরুণ প্রার্থীকে দেখা যাচ্ছে পুরনো রাজনীতি ফেরি করে বেড়াচ্ছেন। অন্য দিকে অনেক প্রবীণ প্রার্থী নতুনের ফেরিওয়ালা। এ ক্ষেত্রে সত্যিকারের তারুণ্য কোন দিকে ঝুঁকবে? যার চিন্তাচেতনা নতুন, তাকে সমর্থন করাটাই স্বাভাবিক।

একজন তরুণ প্রার্থীর আলাদা কিছু শক্তি থাকে, যেগুলো প্রবীণ প্রার্থীর থাকে না। তরুণ প্রার্থীরা প্রযুক্তি-সচেতন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়। দৃষ্টিভঙ্গি সমসাময়িক। তরুণরা সংসদে যেতে পারলে নীতিনির্ধারণে এসব বিষয় গুরুত্ব পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সে বিবেচনায় তরুণ ভোটাররা তাদের দিকে ঝুঁকতে পারে।

তরুণ প্রার্থীদের বেলায় কিছু ঝুঁকিও থেকে যায়। তাদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার অভাব আছে। হঠাৎ ক্ষমতা পেয়ে যাওয়ায় বেসামাল হওয়ার শঙ্কা থাকে। তারুণ্যের আবেগ বিপ্লব ঘটাতে পারে; কিন্তু রাষ্ট্র চালাতে দরকার ধৈর্য, দূরদৃষ্টি আর প্রাতিষ্ঠানিক বোঝাপড়া। তরুণদের বড় চ্যালেঞ্জ এখানে। তারা যেন পুরনো রাজনীতির কু-প্রথা ঝেড়ে ফেলে দিতে গিয়ে নতুন কোনো অদক্ষতার ফাঁদে না পড়ে। পরিবর্তনের নামে যদি কেবল মুখ বদলায়, কাঠামো একই থাকে– তাহলে সেই পরিবর্তন টেকসই হয় না।

তরুণদের রাজনীতি মানে সব সমস্যার সমাধান নয়। তবে এটি রাজনৈতিক সংস্কারের দরজা খুলে দেয়। কারণ তরুণরা প্রশ্ন করতে জানে এবং প্রশ্নের জবাব আদায় করতেও জানে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে তারা কেবল ভোট দিয়ে দায়িত্ব শেষ করে না; বরং নির্বাচিতদের নজর রাখে। প্রকাশ্যে সমালোচনা করে। এই নজরদারি ভবিষ্যৎ রাজনীতিকে পরিশুদ্ধির দিকে নিয়ে যেতে সহায়ক হতে পারে।

লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত
[email protected]