জুলাই সনদ : অঙ্গীকার ও অস্বীকার

বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে অঙ্গীকার ভাঙার উদাহরণ কম নেই। বহু আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থানের পেছনে জমে থাকা ক্ষোভ ও অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির ইতিহাস আছে। পাঁচ আগস্ট ঢাকার সড়কে মানুষের উপস্থিতি ইতিহাসেরই একটি অংশ। মানুষের আশা যখন ভেঙে যায়, তখন রাজনীতির ওপর আস্থা কমে যায়। আর আস্থা হারানো রাজনীতি স্থায়ী হয় না। কোনো অঙ্গীকার যদি গণভোটে অনুমোদন পায়, তাহলে সেই অঙ্গীকার রাখা রাজনৈতিক দলের অনিবার্য দায়িত্ব

অঙ্গীকার এবং অস্বীকার– এরা কি দুই ভাই? না, বৈমাত্রেয় ভাইও না। এরা বন্ধুও না। এদের মধ্যে বৈপরীত্য আছে। তবে মাঝে মাঝে পাশাপাশি চলে। কাজের কথা উঠলেই অদ্ভুতভাবে হাজির হয়। অঙ্গীকার খুব সাহসী। আর অস্বীকার হলো ভীতু, ইতস্তত কথা বলে। এক গ্রামে একটা দিন ছিল অঙ্গীকারের। ওই দিন গ্রামের মুরব্বি সবাইকে ডেকে বললেন, সবাই মিলে একটা খাল কাটতে হবে। গ্রামের অনেকেই হাত তুলে অঙ্গীকার করল। কেউ বলল, ‘আমি কোদাল নিয়ে আসব।’ কেউ বলল, ‘আমি খাবারের ব্যবস্থা করব।’ কিন্তু কাজের দিন দেখা গেল মাত্র কয়েকজনকে। বাকিরা কেউ ব্যস্ত, কেউ অসুস্থ। কেউ অজুহাত দিলো। কেউ বা অঙ্গীকারের কথা বেমালুম অস্বীকার করে বসল।

আসলে অঙ্গীকার করা সহজ। আবার সেই অঙ্গীকার অস্বীকার করা আরো সহজ। রাজনীতিতে এই গল্পই চলে আসছে। বর্তমানেও চলছে। বাংলাদেশকে নতুন করে গড়ে তোলার অঙ্গীকারের দিন ছিল গত বছর অক্টোবর মাসের ১৭ তারিখ। ওই দিন জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় এক ঐতিহাসিক সময় এসেছিল। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের উদ্যোগে দেশের ২৫টি রাজনৈতিক দল একটি দলিলে স্বাক্ষর করেছিল। ওই দলিলের নাম ‘জুলাই সনদ’। এটি ছিল দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও সঙ্ঘাতের পর সমঝোতার প্রতীক। সেখানে সংবিধান সংস্কার, ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা, দুই কামরার সংসদ ব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশনসহ বিভিন্ন সাংবিধানিক কাঠামোর সংস্কারের কথা বলা হয়েছিল।

এই অঙ্গীকারকে আরো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া হয় ১৩ নভেম্বর। ওই দিন জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ গেজেট আকারে প্রকাশ হয়। এরপর ২৫ নভেম্বর গণভোট অধ্যাদেশ জারি হয়। ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের দিন একই সাথে গণভোট হয়। এতে ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী হয়। এর মাধ্যমে জনগণের অনুমোদন পায় জুলাই সনদ। এতে বাংলাদেশকে ঘিরে জমতে থাকে আশা; কিন্তু বাস্তব রাজনীতি জটিল। এখানে অঙ্গীকারের পাশাপাশি চলে অস্বীকারও।

সংসদ নির্বাচন হলো। নতুন সরকার গঠন হলো; কিন্তু জুলাই সনদ ঢেকে গেল কুয়াশায়। সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার থেকে সরে যাওয়ার প্রবণতা দেখা গেল ক্ষমতাসীনদের মধ্যে। শুরু হলো বিতর্ক। সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিলেন না সরকারি দলের এমপিরা। তারা এই শপথের সাংবিধানিক ভিত্তি খুঁজে পেলেন না! বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদ বললেন, যেহেতু তারা নির্বাচিত হয়েছেন সংসদ সদস্য হিসেবে, তাই সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদের কোনো বিধান নেই। যদি সংসদ আগে সংবিধান সংশোধন করে এ ধরনের বিধান যুক্ত করে, তাহলেই সম্ভব পরিষদ গঠন।

জুলাই সনদকে জটিল এক মারপ্যাঁচের মধ্যে ফেলে দিলেন এই নেতা। কিন্তু তিনি যেই নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদ সদস্য হয়েছেন, সেই নির্বাচনের বৈধতা সংবিধানে আছে কি না, সেই রসায়নের জের কী হতে পারে, সেটি ভেবে দেখলেন না। তর্কের খাতিরে না হয় ধরে নিলাম, সত্যিই জুলাই সনদ নিয়ে সাংবিধানিক কিছু বাধ্যবাধকতা আছে। তাহলে সেই প্রশ্নটা কি আগে তোলা যেত না? যখন জুলাই সনদ তৈরি হচ্ছিল, যখন গণভোটের সিদ্ধান্ত হচ্ছিল, তখন কেন এ কথা বলা হয়নি!

অবশ্য এরও একটা ব্যাখ্যা দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব:) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। তিনি স্পষ্টাস্পষ্টি বলে দিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে বিএনপি এই গণভোটে রাজি ছিল না। কিন্তু দেখা গেছে যে, বিএনপি রাজি না হলে দেশে নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হবে না অথবা নির্বাচনই হবে না। এই পরিস্থিতিতে অনেকটা বাধ্য হয়েই বিএনপি ‘জুলাই সনদে’ স্বাক্ষর করেছে। গণভোটের আইনগত ভিত্তি নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি। হাফিজ উদ্দিন মনে করেন, এই প্রক্রিয়াটি ঢাকার একটি বিশেষ ‘এলিট গোষ্ঠী’ জনগণের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে।

কিন্তু মেজর (অব:) হাফিজ উদ্দিন আহমেদের কাছে প্রশ্ন থেকে যায়, যদি সত্যিই বিষয়টা চাপিয়ে দেয়া হয়ে থাকে, তাহলে জনগণ একে ‘হ্যাঁ’ বলল কিভাবে? গণভোটের চেয়ে আলুর ন্যায্যমূল্য পাওয়া এবং পেঁয়াজের সংরক্ষণাগার স্থাপন কৃষকদের কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে নভেম্বরে ঢাকায় এক সভায় বলেছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এ নিয়ে বিতর্ক হয়েছিল। পরে অবশ্য গণভোটের পক্ষে কথা বলেন তিনি। সরাসরি ভোট চেয়েছিলেন ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে। এতে বিএনপির ওপর আস্থা রেখেছিল মানুষ। সেই আস্থায় প্রধানমন্ত্রী হতে পেরেছেন তারেক রহমান; কিন্তু আস্থার মূল্য কতটা দিতে পারছেন তারা? গণভোটকে সরাসরি অস্বীকার করা হচ্ছে না। আবার ধীরে ধীরে সে দিক থেকে সরে যাওয়ার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। যাকে বলা হয় ‘এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল’।

জামায়াত ও এনসিপি-সহ কয়েকটি দল অভিযোগ তুলেছে, সরকার জুলাই সনদ নিয়ে দ্বিচারিতা করছে। তাদের বক্তব্য, যে বিষয়গুলো সরকারের জন্য সুবিধাজনক সেগুলো তুলে ধরা হচ্ছে। আর অসুবিধার বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। এনসিপি নেতারা এই খেলাকে ‘ডুয়েল গেম’ বলছের। তারা মনে করেন, গণভোটে যে বিষয়গুলো অনুমোদিত হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকার ‘পিক অ্যান্ড চ্যুজ’ নীতি অনুসরণ করছে। অর্থাৎ সাপলুডু খেলার মতো কখনো এগিয়ে যাচ্ছে, কখনো পিছিয়ে যাচ্ছে।

ক্ষমতাসীন দলের এমন অবস্থান কি জনমনে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে না? একটি বড় রাজনৈতিক শক্তি যদি আনুষ্ঠানিকভাবে সনদে স্বাক্ষর করেও তার বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয়ের ইঙ্গিত দেয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, এই দ্বিধা ও দোদুল্যমানতার দায় কি শেষ পর্যন্ত কেবল রাজনীতির ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি এর প্রতিফলন জনমতেও দেখা দেবে!

জুলাই সনদের গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব ছিল রাষ্ট্রক্ষমতায় ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা। সেই লক্ষ্যেই সেখানে দুই কামরার সংসদের ধারণা সামনে আনা হয়। প্রস্তাব অনুযায়ী উঁচু কামরায় ১০০ সদস্য নির্বাচিত হবেন অনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে। এর পাশাপাশি সংসদের কার্যক্রমে বিরোধী দলের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে দুই কামরাতেই বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার বিধান যুক্ত করার কথা বলা হয়।

পৃথিবীর অনেক পরিণত সংসদীয় গণতন্ত্রে বহুদিন ধরেই দুই কামরার সংসদ আছে। যুক্তরাজ্যে সংসদ গঠন হয়েছে হাউজ অব কমন্স ও হাউজ অব লর্ডস– এই দুই কামরা নিয়ে। যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ায় দুই কামরা হলো হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভস ও সিনেট। কানাডায় আছে–হাউজ অব কমন্স ও সিনেট। ভারতে আছে লোকসভা ও রাজ্যসভা। এমনকি পাকিস্তানেও দুই কামরা আছে– ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি ও সিনেট। মূলত দুই কামরার সংসদে আইন প্রণয়নে অতিরিক্ত পর্যালোচনার সুযোগ থাকে। সেই সাথে ক্ষমতার এককেন্দ্রিকতা কমে।

এই প্রেক্ষাপটে জুলাই সনদের প্রস্তাবকে অনেকেই দেখছেন ক্ষমতার ভারসাম্য ও প্রতিনিধিত্বের পরিসর বাড়ানোর প্রয়াস হিসেবে। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, এই প্রস্তাব কি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাবে, নাকি রাজনৈতিক টানাপড়েনের ভেতরেই আটকে থাকবে।

সরকারপক্ষ অবশ্য বলছে, তারা জুলাই সনদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে বিরোধী দল থেকেই ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করতে চায়। কিন্তু বিরোধী শিবির বলছে, কেবল একটি পদ দিয়ে দেয়া জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রমাণ হতে পারে না। সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশনসহ অন্যান্য সাংবিধানিক সংস্কারের বিষয়ে স্পষ্ট অগ্রগতি হতে হবে। তারা বলছে, জুলাই সনদের ব্যাপারে অগ্রগতি ছাড়া ডেপুটি স্পিকারের পদ নিলে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দায় থেকে সরকার মুক্তি পেয়ে যেতে পারে।

এই বিতর্কই অঙ্গীকার ও অস্বীকারের। মাঝে মাঝে তারা যখন পাশাপাশি চলে, তখন মাঝখানে একটা ধূসর অঞ্চল রেখে দেয়। এই অঞ্চলে সরাসরি কেউ কথা ভাঙে না। আবার কথা রাখেও না। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়েও ধূসর এলাকায় ঢুকে আছে ক্ষমতাসীনরা। তবে সরকার গঠনের পর তাদের কিছু উদ্যোগ ও চেষ্টা অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। কিছু অঙ্গীকার নিয়ে কাজ শুরুও করেছে। নির্বাচনের আগে প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে সহায়তা দেয়ার জন্য ফ্যামিলি কার্ড চালুর প্রতিশ্রুতি দেয় বিএনপি। পরিকল্পনা ছিল চার কোটি পরিবারকে এই কর্মসূচির আওতায় আনা এবং প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা বা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ করা। সরকার ইতোমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে এই কর্মসূচি চালুর ঘোষণা দিয়েছে। প্রাথমিকভাবে কয়েকটি উপজেলায় পাইলট প্রকল্প হিসেবে এটি শুরু হবে। এটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে এর বাস্তবায়ন নিয়েও অনেক প্রশ্ন। পাইলট প্রকল্পকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা আছে। আমাদের অর্থনীতি এই চাপ কতটা নিতে পারবে, সেই প্রশ্নও আছে।

ফ্যামিলি কার্ড ছাড়াও আরো প্রতিশ্রুতি ছিল বিএনপির। ১৮ মাসে এক কোটি কর্মসংস্থান, শিক্ষিত বেকারদের জন্য ভাতা, কৃষকের জন্য কৃষি কার্ড, বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য পেনশন ব্যবস্থা, বিনামূল্যে নারীশিক্ষা, জনবহুল স্থানে ফ্রি ওয়াই-ফাই, স্বাস্থ্য খাতে শক্তিশালী প্রাইমারি কেয়ার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা ইত্যাদি। এগুলো এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে অঙ্গীকার ভাঙার উদাহরণ কম নেই। বহু আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থানের পেছনে জমে থাকা ক্ষোভ ও অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির ইতিহাস আছে। পাঁচ আগস্ট ঢাকার সড়কে মানুষের উপস্থিতি ইতিহাসেরই একটি অংশ। মানুষের আশা যখন ভেঙে যায়, তখন রাজনীতির ওপর আস্থা কমে যায়। আর আস্থা হারানো রাজনীতি স্থায়ী হয় না। কোনো অঙ্গীকার যদি গণভোটে অনুমোদন পায়, তাহলে সেই অঙ্গীকার রাখা রাজনৈতিক দলের অনিবার্য দায়িত্ব।

গণভোটের ধারণা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন নয়। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে জনগণের মতামত নিতে এই পদ্ধতির আশ্রয় নেয়া হয়েছে। রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমানও তার সরকারের বৈধতা নিশ্চিত করতে গণভোটের পথ বেছে নিয়েছিলেন। ক্ষমতায় থাকার সময় তিনি নিজেকে ব্যস্ত রাখেন নানা জনবান্ধব কর্মসূচি বাস্তবায়নে।

এই অভিজ্ঞতা থেকে একটি মৌলিক রাজনৈতিক নীতিও সামনে আসে। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করা ক্ষমতাসীনদের কেবল রাজনৈতিক দায় নয়, নৈতিক দায়িত্বও। সেই দায়িত্ব পালন না করলে জনগণের বিশ্বাসে বড় ধরনের ফাটল ধরার ঝুঁকি থাকে।

লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত
[email protected]