ক্রিকেটে একঘরে ভারত

বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা মেনে নিতে পারছে না ভারত। এই ‘রিয়েলিটি’ তাদের অস্বস্তিতে ফেলেছে। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশের রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। শেখ হাসিনার পতন হয়েছে। ভারতের আধিপত্যবাদেরও পতন ঘটেছে। শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে গেছেন। মোদি তার এখন আশ্রয়দাতা। এর পর থেকে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপড়েন শুরু। কূটনৈতিক দূরত্ব বাড়ছে। বিশ্বাস কমছে। গত দেড় বছরে এ দূরত্ব আরো স্পষ্ট হয়েছে। বাণিজ্য কমছে। ক্ষতি হচ্ছে ভারতের, বাংলাদেশের নয়। ভিসা জটিলতা তৈরি করছে দিল্লি। সাংস্কৃতিক বিনিময় কমে গেছে। ক্রিকেট ছিল শেষ সেতু। সেই সেতুতেও এখন ফাটল।

ক্রিকেট দক্ষিণ এশিয়ায় কেবল একটি খেলা নয়। এটি জাতীয় পরিচয়। কূটনীতির নরম ভাষা। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনায় সেই ক্রিকেট আবার প্রশ্নের মুখে। ভারতের ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) একটি সিদ্ধান্ত গোটা অঞ্চলকে নাড়িয়ে দিয়েছে। কলকাতা নাইট রাইডার্সের স্কোয়াড থেকে বাংলাদেশের পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেয়ার নির্দেশ এসেছে বিসিসিআই থেকে। ফ্র্যাঞ্চাইজি সেই নির্দেশ মান্য করেছে। ফলে এ বছর আইপিএলে মোস্তাফিজের খেলা বন্ধ।

এটি কেবল একজন খেলোয়াড়ের বাদ পড়া নয়; একটি বার্তা। এটি একটি রাজনৈতিক ও নৈতিক সঙ্কেত। মোস্তাফিজ আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেটার। তিনি কোনো শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেননি। কোনো চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগ নেই। তবু তাকে বাদ দেয়া হলো। কারণ হিসেবে উঠে আসছে ‘নিরাপত্তা’ ও ‘পরিস্থিতি’। এ অস্পষ্ট যুক্তি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসি) তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। কারণ এখানে কেবল ক্রিকেট নয়; দেশের সম্মান জড়িত। আইসিসিকে চিঠি দিয়েছে বিসিবি। ভারতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। ভেন্যু পরিবর্তনের অনুরোধ করেছে। যদিও বিশ্বকাপে না যাওয়ার মানে বড় কূটনৈতিক ঘটনা। এতে ঝুঁকিও রয়েছে। তবু বিসিবি সেই ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত। কারণ নিরাপত্তা প্রশ্নে কোনো আপস নেই। সম্মান প্রশ্নে কোনো ছাড় নেই। এ দিকে সরকারও অবস্থান নিয়েছে।

বাংলাদেশে আইপিএল সম্প্রচার বন্ধের নির্দেশ এসেছে। যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল প্রথম প্রকাশ্যে এ দাবি তোলেন। সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী আইপিএল সম্প্রচার বন্ধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

আইপিএল একটি বেসরকারি লিগ; কিন্তু এর নিয়ন্ত্রণে আছে বিসিসিআই। সংস্থাটি আবার ভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান। যখন বিসিসিআই কোনো খেলোয়াড়কে রাজনৈতিক বা সামাজিক চাপে বাদ দেয়, তখন সেটি আর ক্রিকেটের মধ্যে থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে রাষ্ট্রীয় বার্তা। মোস্তাফিজের বাদ পড়া সেই বার্তা দিচ্ছে। বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়াও তাই রাষ্ট্রীয়। সম্প্রচার বন্ধ নিঃসন্দেহে একটি বড় সিদ্ধান্ত। বার্তাটি পরিষ্কার– অবমাননা মেনে নেয়া হবে না।

ক্রিকেট যদি প্রতিশোধের ভাষায় কথা বলতে শুরু করে, তবে মাঠে খেলার জায়গা সঙ্কুচিত হবে। ভারতের অবস্থান প্রতিশোধের। সাম্প্রদায়িক মানসিকতায় ডুবে আছে মোদি সরকার। এখন বিসিসিআই যদি সত্যি ক্রিকেটকে খেলায় রাখতে চায়, তবে সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিতে হবে। স্বচ্ছতা আনতে হবে। আইসিসিকেও দায়িত্ব নিতে হবে। বিশ্বকাপ আয়োজন মানে শুধু ম্যাচ নয়। এটি সব দলের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত কঠিন। তবে অযৌক্তিক নয়। এটি আবেগ নয়; আত্মসম্মানের প্রশ্ন। ক্রিকেট মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে। থাকাই উচিত। কিন্তু মাঠের বাইরে অসম্মান হলে প্রতিবাদ আসবেই। মোস্তাফিজ একা নন। তার পেছনে একটি দেশ দাঁড়িয়ে আছে। তাকে আইপিএল থেকে বাদ দেয়ার ঘটনা এখন আর শুধু ক্রিকেটের বিষয় নয়। এটি সম্মানের আর নিরাপত্তার প্রশ্ন। রাজনীতির অনুপ্রবেশের প্রশ্ন। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড যে অবস্থান নিয়েছে, তা দেশের সাবেক ক্রিকেটারদের বড় অংশের সমর্থন পেয়েছে।

বিসিবির পরিচালক ও সাবেক অধিনায়ক খালেদ মাসুদ পাইলটের বক্তব্য পরিষ্কার। তিনি মনে করেন, খেলোয়াড়কে যদি নিরাপত্তা দেয়া না যায়, তাহলে বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকে যায়। এমন অবস্থায় কোনো ঝুঁকি নেয়া উচিত নয়। পাইলট বলেছেন, খেলাধুলায় রাজনীতি আসা ঠিক নয়। ক্রিকেটের জায়গায় ক্রিকেট থাকা উচিত। খেলাধুলা মানুষের মধ্যে বিভাজন নয়, ঐক্য তৈরি করে। খালেদ মাসুদ পাইলট বলেছেন, যেখানে বাংলাদেশের একজন খেলোয়াড় সম্মান পান না, সেখানে সেই খেলা দেখানোরও প্রয়োজন নেই। আইপিএলের সম্প্রচার বন্ধ করার সিদ্ধান্ত তিনি সমর্থন করেন। কারণ এটি কেবল খেলা নয়; আত্মসম্মানের বিষয়।

জাতীয় দলের আরেক সাবেক অধিনায়ক আকরাম খান বলেছেন, ভারতে গেলে ক্রিকেটাররা মানসিকভাবে স্বস্তিতে থাকতেন না। খেলোয়াড় যদি মানসিক চাপে থাকে, তাহলে ভালো খেলা সম্ভব নয়। শারীরিক নিরাপত্তার পাশাপাশি মানসিক নিরাপত্তাও জরুরি। এই দিকটি বিবেচনায় নিয়ে বিসিবির সিদ্ধান্তকে তিনি সঠিক বলেছেন।

এ সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়া ভারতের ভেতরেও দেখা গেছে। লোকসভার সদস্য ও সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শশী থারুর বিষয়টি ভারতের জন্য ‘বিব্রতকর’ বলেছেন। একই সাথে তিনি স্বীকার করেছেন, এ পরিস্থিতির জন্য ভারত নিজেই দায়ী। শশী থারুর ভবিষ্যতের দিকেও তাকিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, প্রতিবেশী দেশগুলোকে খেলাধুলায় একের পর এক বিচ্ছিন্ন করা ভারতের জন্য ভালো ফল বয়ে আনবে না। এর আগে পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের আইপিএল থেকে বাদ পড়ার উদাহরণ মনে করিয়ে দিয়েছেন তিনি।

থারুরের বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো তার প্রশ্ন। তিনি জানতে চেয়েছেন– মোস্তাফিজ যদি লিটন দাস বা সৌম্য সরকার হতেন, তাহলে কি একই সিদ্ধান্ত হতো?

আসলে এখানে কাকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে? একজন খেলোয়াড়কে? একটি দেশকে? নাকি তার ধর্মীয় পরিচয়কে? তিনি আরো বলেছেন, খেলাধুলাকে এভাবে নির্বিচারে রাজনৈতিক রঙে রাঙালে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিটা খেলাধুলারই হবে। খেলা তখন আর সেতু থাকবে না। খেলা হয়ে উঠবে দেয়াল।

মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেয়ার ঘটনা দিন যত যাচ্ছে, তত নতুন মাত্রা পাচ্ছে। এটি আর ক্রিকেটে সীমাবদ্ধ নেই। রাজনীতি, ধর্মীয় পরিচয় ও উগ্রতার ভাষা এতে ঢুকে পড়েছে। ভারতের কিছু রাজনীতিবিদ ও সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া সেই বাস্তবতা সামনে আনছে। পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য এ বিতর্ক আরো উসকে দিয়েছে। তিনি বলেছেন, দরকার হলে ভারত আর ‘ইন্ডিয়া’র মধ্যে খেলা হবে। এই বক্তব্য শুধু হাস্যকর নয়, উদ্ভট। কতটা অন্ধ উগ্রবাদী হলে এমন বক্তব্য রাখতে পারেন একজন রাজনীতিবিদ। ক্রিকেটকে তিনি যেন একধরনের অন্তর্দ্বন্দ্বের মঞ্চ বানাতে চাইছেন। প্রতিবেশী দেশ নয়, এখন নিজের দেশের ভেতরে কল্পিত প্রতিপক্ষ দাঁড় করানো হচ্ছে। এতে বোঝা যায়, যুক্তির জায়গা কতটা সঙ্কুচিত হয়েছে।

মোস্তাফিজকে বাদ দেয়া নিয়ে ভারতে যে উন্মাদনা তৈরি হয়েছে, তা ক্রিকেটপ্রেম নয়, রাজনৈতিক উগ্রতার বহিঃপ্রকাশ। তবে ভারতের সাধারণ নাগরিকদের একটি অংশ সামাজিক মাধ্যমে ভিন্ন প্রশ্ন তুলছেন। একজন সাধারণ ভারতীয় নাগরিক লিখেছেন, শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেয়া হলে তিনি খুনি কি না, সে প্রশ্ন ওঠে না। কিন্তু মোস্তাফিজকে নেয়ায় শাহরুখ খান গাদ্দার হয়ে যান– এটি কেমন ন্যায়বিচার? এ মন্তব্য রাষ্ট্রীয় বক্তব্য নয়। কিন্তু এগুলো ভারতের সমাজের ভেতরের দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ করে। কলকাতা নাইট রাইডার্সের মালিক শাহরুখ খানকে গাদ্দার বলা হচ্ছে। কারণ তিনি একজন বাংলাদেশী মুসলিম ক্রিকেটারকে দলে রেখেছিলেন। এখানে ক্রিকেট নেই। ব্যবসায় নেই। এখানে কেবল পরিচয়ের রাজনীতি।

এ পরিস্থিতিতে ভারতের ভেতরে অনেকে অস্বস্তি বোধ করছেন। তারা বুঝছেন, ক্রিকেটকে এভাবে রাজনৈতিক অস্ত্র বানানো বিপজ্জনক। এতে ভারত একা হয়ে পড়ছে। ভারতের উগ্র প্রতিক্রিয়াগুলো সেই সম্মানহানিকে আরো স্পষ্ট করছে। প্রশ্ন উঠেছে– হিন্দুত্ববাদী বিজেপি ভারতের ক্রিকেটকে আসলে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?

বিগ ব্রাদার সিনড্রোমে ভুগছে ভারত

বলা হয়, ক্রিকেট ভারতের একটি বড় সফট পাওয়ার। ক্রিকেট ছিল দেশটির প্রভাব বিস্তারের অন্যতম কার্যকর হাতিয়ার। দীর্ঘ দিন ধরে ক্রিকেট দিয়েই ভারত প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করেছে। কখনো উত্তেজনা কমিয়েছে। কখনো আলোচনার দরজা খুলেছে; কিন্তু মোদি ক্ষমতায় আসার পর এখন সেই ক্রিকেট ভাঙনের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

পাকিস্তানের সাথে ভারতের ক্রিকেটীয় সম্পর্ক বহু আগেই শেষ। দ্বিপক্ষীয় সিরিজ নেই। আইসিসির মঞ্চে কেবল বাধ্যতামূলক মুখোমুখি দেখা। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হলো বাংলাদেশ। মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেয়ার ঘটনা একটি টার্নিং পয়েন্ট। এটি দিল্লির হঠাৎ কোনো সিদ্ধান্ত নয়। এটি ভারতের দীর্ঘ দিনের উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক ও আদর্শিক অবস্থানের ফল। ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির একটি অংশ এ সিদ্ধান্তকে ‘জয়’ হিসেবে উদযাপন করেছে। কিছু বিজেপি নেতা প্রকাশ্যে বলেছেন, ‘এটি ভারতের হিন্দুদের জয়’। এ ভাষা ভয়ঙ্কর। এখানে ক্রিকেট নেই। খেলোয়াড় নেই। আছে পরিচয়ের রাজনীতি। একজন ক্রিকেটারকে বাদ দেয়াকে যখন ধর্মীয় বিজয় বলা হয়, তখন বোঝা যায়– খেলাটা আর খেলায় নেই।

ভারত মনে করেছিল, ক্রিকেটে যা খুশি করতে পারবে। দাদাগিরি চলবে। সবাই মেনে নেবে; কিন্তু বাস্তবতা বদলাচ্ছে। বাংলাদেশ এবার চুপ থাকেনি। প্রতিবাদ করেছে। কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি শুধু প্রতিক্রিয়া নয়। এ বার্তা ভারতের জন্য অস্বস্তিকর। কারণ ভারত প্রতিবেশীর ওপর বড় ভাইয়ের মতো আধিপত্য বিস্তার করতে চায়। বিগ ব্রাদার সিনড্রোমে ভুগছে ভারত।

বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা মেনে নিতে পারছে না ভারত। এই ‘রিয়েলিটি’ তাদের অস্বস্তিতে ফেলেছে। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশের রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। শেখ হাসিনার পতন হয়েছে। ভারতের আধিপত্যবাদেরও পতন ঘটেছে। শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে গেছেন। মোদি তার এখন আশ্রয়দাতা। এর পর থেকে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপড়েন শুরু। কূটনৈতিক দূরত্ব বাড়ছে। বিশ্বাস কমছে। গত দেড় বছরে এই দূরত্ব আরো স্পষ্ট হয়েছে। বাণিজ্য কমছে। ক্ষতি হচ্ছে ভারতের, বাংলাদেশের নয়। ভিসা জটিলতা তৈরি করছে দিল্লি। সাংস্কৃতিক বিনিময় কমে গেছে। ক্রিকেট ছিল শেষ সেতু। সেই সেতুতেও এখন ফাটল।

লেখক : সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন