রামাজান যুদ্ধে আকাশের আতঙ্ক যখন মাটিতে লুটিয়ে পড়ে

রমাজান যুদ্ধ কেবল ভূখণ্ডের লড়াই নয়, বরং আধুনিক আকাশপথের এক চরম শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের যুদ্ধ হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে। ইহুদিবাদী ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আধুনিক বিশ্বে নিজেদেরকে অমিত শক্তিধারী ‘ড্রোনাচার্য’ বলে দাবি করে। তাদের সে দাবি এবার মাটিতে মিশে গেছে।

ইরানের সংবাদ মাধ্যম তাসনিম নিউজ অ্যাজেন্সির বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের ওপর চাপিয়ে দেয়া ইহুদিবাদী ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো ইরানের আকাশে শত্রুপক্ষের অত্যাধুনিক চালকবিহীন বিমান বা ড্রোনের একের পর এক পতন। এই যুদ্ধ রমাজান যুদ্ধ নামেই ইরানের কাছে পরিচিত। সব মিলিয়ে রমাজান যুদ্ধ কেবল ভূখণ্ডের লড়াই নয়, বরং আধুনিক আকাশপথের এক চরম শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের যুদ্ধ হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে। ইহুদিবাদী ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আধুনিক বিশ্বে নিজেদেরকে অমিত শক্তিধারী ‘ড্রোনাচার্য’ বলে দাবি করে। তাদের সে দাবি এবার মাটিতে মিশে গেছে।

এই লড়াইয়ের বিভিন্ন মাত্রা নিয়ে সামরিক বিশ্লেষক থেকে শুরু করে বড় বড় থিংক-ট্যাঙ্কগুলো আগামী কয়েক বছরব্যাপী চুলচেরা বিশ্লেষণ করবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এই যুদ্ধের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো ইরানের আকাশে শত্রুপক্ষের অত্যাধুনিক চালকবিহীন বিমানে বা ড্রোনের একের পর এক পতন। যুদ্ধের শুরু থেকে সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়া পর্যন্ত ৪০ দিনের মাথায় ইরানের সশস্ত্র বাহিনী যে পরিমাণ ড্রোন ভূপাতিত করেছে, তা আধুনিক যুদ্ধের মানচিত্রে এক বড় পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। ইরানের আকাশসীমায় এই সময় মূলত এক বিশেষ গোত্রের ড্রোনের দাপট ছিল, যা সামরিক পরিভাষায় 'মেল' (MALE) বা 'মিডিয়াম অল্টিটিউড লং এন্ডুরেন্স' হিসেবে পরিচিত। এই সিরিজের ড্রোনগুলো সাধারণত মাটি থেকে ৩ থেকে ৯ কিলোমিটার উঁচুতে উড়তে পারে। একবার উড়লে একটানা ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা আসমানে টিকে থাকতে সক্ষম। তবে মজার বিষয় হলো, যখনই এই ড্রোনগুলো আক্রমণ বা নজরদারির জন্য নিচে নেমে এসেছে, তখনই ইরানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর জালে ধরা পড়েছে।

শত্রুপক্ষের এই বিশাল ড্রোন বহরের মধ্যে আমেরিকার বিখ্যাত 'এমকিউ-৯ রিপার' (MQ-9 Reaper) এবং ইহুদিবাদী ইসরাইলের তৈরি 'হার্মিস ৯০০' ও 'হেরন' ড্রোনের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচিত। এছাড়াও লুকাস ড্রোনের মতো কিছু গোপন ড্রোনও ব্যবহার করা হয়েছিল, যা মূলত ইরানের তৈরি শাহেদ-১৩৬ ড্রোনটির আমেরিকান নকল বলে মনে করা হয়। ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রমাজান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ১৫০টিরও বেশি আক্রমণকারী ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। এই হিসাব মোতাবেক যুদ্ধের ৪০ দিনে দৈনিক প্রায় চারটি করে দুশমন ড্রোন ভূপাতিত করেছে ইরান। এটি একটি বিশাল সংখ্যা, বিশেষ করে যখন শত্রুপক্ষ ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে অকেজো করার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল।

এই ড্রোনগুলো ধ্বংস করা কেন এত জরুরি ছিল? কারণ এগুলো কেবল নজরদারি নয়, বরং সরাসরি নির্ভুল হামলার সক্ষমতা রাখে। আমেরিকান এমকিউ-৯ ড্রোন অত্যাধুনিক অপটিক্যাল সিস্টেম এবং হেলফায়ার মিসাইল দিয়ে সজ্জিত । অন্যদিকে ইসরাইলের তৈরি হার্মিস ৯০০ বা হেরন ড্রোনগুলো উন্নত ক্যামেরা এবং মিখোলিত সিরিজের ছোট বোমার সাহায্যে যেকোনো গোপন মিসাইল লাঞ্চার বা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে খুঁজে বের করে মুহূর্তে হামলা চালাতে পারে। ইরানের আকাশে এই ড্রোনগুলোর পতন মানে হলো শত্রুর চোখ উপড়ে ফেলা।

আমেরিকার ড্রোন বাহিনীর মূল ভিত্তি বা মেরুদণ্ড বলা হয় এমকিউ-৯ রিপারকে। কিন্তু রমাজান যুদ্ধ যেন এই ড্রোনের জন্য এক বিশাল কবরস্থানে পরিণত হয়েছে। জেনারেল অ্যাটমিক্সের তৈরি এই ড্রোনের দৈর্ঘ্য ১১ মিটার এবং ডানা ২০ মিটার চওড়া। ৯০০ হর্সপাওয়ারের টার্বোপ্রপ ইঞ্জিন চালিত এই ড্রোনটি ঘণ্টায় প্রায় ৩১৩ কিলোমিটার বেগে উড়তে পারে। ড্রোনটি ১ টনের বেশি গোলাবারুদ বহন করার সক্ষমতা রাখে । এর প্রধান অস্ত্র হলো এজিএম-১১৪ হেলফায়ার মিসাইল।

তাসনিম নিউজ জানাচ্ছে, ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ গোষ্ঠী ২০১৭ সাল থেকে এই ড্রোন শিকার শুরু করলেও রমাজান যুদ্ধে আমেরিকার এই আভিজাত্যের চরম পতন ঘটেছে। আমেরিকা ড্রোনের মাতব্বর বা ‘ড্রোনাচার্য’ হওয়ার বড়াই করেছে তাতে ছাই পড়েছে। মাত্র ৩৮ দিনের লড়াইয়ে প্রায় ২৫টি রিপার ড্রোন ধ্বংস হয়েছে। এখানেও দিনে গড়ে প্রায় ২টি করে ড্রোনের ‘মহাপ্রয়াণ’ ঘটেছে।

এদিকে, ইরান এবং আনসারুল্লাহ মিলে এখন পর্যন্ত আমেরিকার প্রায় ৫০টি এমকিউ-৯ ড্রোন ‘হত্যা’ করেছে। প্রতিটি ড্রোনের দাম ৩৫ মিলিয়ন ডলার হিসাবে ধরলে আমেরিকার প্রায় ১.৭৫ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র কেবল এই এক খাতেই ছাই হয়ে গেছে মিলিয়ে গেছে। পশ্চিমা সামরিক বিশেষজ্ঞরা এখন এই মডেলের ড্রোনের কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন। এই যুদ্ধ যেন ড্রোনের একটি নির্দিষ্ট প্রজন্মের সমাপ্তি ঘোষণা করল।

কেবল রিপার নয়, আমেরিকার নৌবাহিনীর আরকিউ-২১ ব্ল্যাকজ্যাক ড্রোনও ইরানের প্রতিরক্ষা ইউনিটের হাতে ধরা পড়েছে। বোয়িং কোম্পানির তৈরি বিখ্যাত স্ক্যান ঈগল ড্রোনের এই বড় সংস্করণটি মূলত উপকূলীয় অঞ্চলে নজরদারির কাজ করে। ইরানের দক্ষিণ সীমান্তে এই ড্রোনটিকে শনাক্ত করে ধ্বংস করা হয়।

পাশাপাশি ইসরাইলের তৈরি ড্রোনগুলোর অবস্থাও তথৈবচ। রমাজান যুদ্ধে এবং তার আগের ১২ দিনের যুদ্ধে ইসরাইলের হার্মিস ৯০০, হেরন, এইতান এবং অরবিটার মডেলের ড্রোনগুলো নিয়মিতভাবে ইরানের কামানের গোলায় ভূপাতিত হয়েছে। ভিডিও প্রমাণ অনুযায়ী, অন্তত ৯টি হার্মিস ৯০০ ড্রোন ধ্বংস হয়েছে, যার মধ্যে শেষটি ‘নিহত’ হয়েছে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে। ১১৫ হর্সপাওয়ারের ইঞ্জিন সমৃদ্ধ এই ড্রোনটি ৩৬ ঘণ্টা আকাশে ওড়ার ক্ষমতা রাখলেও ইরানের আকাশসীমায় ঢোকার দুঃসাহস দেখাতে গিয়ে, ‘পড়ত পড় মালির ঘাড়ের’ মতো চড়া মূল্য দিতে হয়েছে।

ইসরাইলের হেরন এবং এর আরও উন্নত মডেল 'হেরন টিপি' বা 'এইতান' ড্রোনগুলোও এই যুদ্ধে বড় লক্ষ্যবস্তু ছিল। এইতান ড্রোনের ওজন ৫,৪০০ কেজির মতো এবং এটি ১৪ কিলোমিটার উচ্চতায় উঠে মাটির নিচের গোপন স্থাপনা খুঁজে বের করতে পারে। ইরানের লরেস্তান প্রদেশে এই অত্যাধুনিক ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে, যা প্রমাণ করে ইরানের রাডার ফাঁকি দেওয়া এই ড্রোনগুলোর পক্ষে সম্ভব হয়নি। তবে সবচেয়ে চমকপ্রদ ঘটনা হলো ইরানের ভেতরে অন্তত দুটি 'উইং লুং ২' ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে। চীনের তৈরি এই ড্রোনগুলো কিন্তু আমেরিকা বা ইসরাইল ব্যবহার করে না। এই ড্রোনের মালিক মূলত সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত। সুতরাং আঙুল উঠছে এই দুই আঞ্চলিক শক্তির দিকেই। উইং লুং ২ ড্রোনে সাধারণত আক্রমণাত্মক ক্ষেপণাস্ত্র থাকে এবং এটি ঘণ্টায় ৩৭০ কিলোমিটার বেগে চলতে পারে। পশ্চিমের ড্রোনের পাশাপাশি এই ড্রোন শিকার করে ইরান বুঝিয়ে দিয়েছে, তাদের আকাশসীমায় যেকোনো অনধিকার প্রবেশকারীকেই চরম মূল্য দিতে হবে। আকাশপথের এই নীরব যুদ্ধে ড্রোনের পরাজয় মূলত আধুনিক সমরশৈলীর এক নতুন দিকনির্দেশনা দিচ্ছে, যেখানে দামি ড্রোনও এখন আর সুরক্ষিত নয়।