সেচে ভূ-উপরিতলের পানি ব্যবহারে ভূ-গর্ভের মজুদ রক্ষা পাবে, খরচ কমাবে

ভূ-গর্ভের পানির ব্যবহার কমানো এবং খাদ্যশস্য উৎপাদন বাড়াতে ভূ-উপরিতলের পানির ব্যবহার নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। সম্ভাব্য বিপর্যয় এড়াতে কাজটি যত দ্রুত সম্পন্ন করা হবে, ততই মঙ্গল।

কৃষকের সেচের খরচ কমাতে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে নতুন সেচ প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। ২৮৩ কোটি টাকা ব্যয়ে বরিশাল সেচ প্রকল্পের রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসনের এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে কৃষকের হেক্টর-প্রতি সেচ খরচ সাড়ে ১১ হাজার টাকা থেকে কমে আড়াই হাজার টাকায় আসবে। এতে ফসলের উৎপাদন ব্যয়ও কমবে। সেই সাথে বছরে প্রায় ২৪ হাজার ৫১৩ মেট্রিক টন অতিরিক্ত খাদ্যশস্য উৎপাদন সম্ভব হবে।

নয়া দিগন্তের এক প্রতিবেদনে জানা যাচ্ছে, প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় পেশ করা হচ্ছে। প্রকল্পের লক্ষ্য হলো— ভূ-উপরিস্থ পানির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে ভূ-গর্ভের পানির ব্যবহার কমানো। এটি দেশের জন্য সবচেয়ে জরুরি।

নদীমাতৃক ও কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে, ভূ-উপরিতলের সেচ প্রকল্পগুলো কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, পরিবেশ সংরক্ষণ ও টেকসই কৃষি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বরিশাল সেচ প্রকল্পের মাধ্যমে নদী-নালা ও খাল-বিলের পানি অর্থাৎ— ভূ-উপরিতলের পানি ব্যবহার করে কৃষি জমিতে সেচ দেয়া হয়। ভূ-গর্ভের পানির স্তর পুনর্ভরণে এটি অত্যন্ত সহায়ক।

দেশের পানি ব্যবস্থাপনা নানা কারণে হুমকির মুখে। বিশেষ করে যৌথ নদীর উজানে ব্যাপক হারে পানি প্রত্যাহার এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে পানির উৎস শুকিয়ে আসা অন্যতম কারণ। তা ছাড়া মানুষের হস্তক্ষেপও বড় কারণ। এরই মধ্যে দেশের অসংখ্য নদ-নদী মরে গেছে অথবা মৃতপ্রায়। খাল-বিল, জলাভূমি নিঃশেষ হওয়ার পথে। অনেক জায়গায় নদীর মুখে বাঁধ দিয়ে পানির প্রবাহ আটকে দেয়া হয়েছে। এসব নদীর ভাটিতে বিস্তীর্ণ অঞ্চলে কৃষিকাজে নদীর পানি ব্যবহার বন্ধ হয়ে গেছে।

খাল-বিল শুকিয়ে যাওয়ায় সেচের পানি যেমন মিলছে না, তেমনি জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। কৃষকরা গভীর নলকূপের পানি ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন; কিন্তু এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে অনেক এলাকায়। বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূ-গর্ভের পানির স্তর এতটাই নিচে চলে গেছে যে, অগভীর নলকূপ থেকে খাবার পানিও মিলছে না। অনেক এলাকায় আর্সেনিক দূষণ মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে। মানুষ নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে।

দেশে প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণে আইন থাকলেও তার প্রয়োগ নেই। প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা দরকার।

কৃষিকাজে সেচের কোনো বিকল্প নেই। সারা পদশে সেচকাজে ভূ-উপরিতলের পানি ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে নদ-নদী ও খাল-বিলে পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। সম্ভাব্য ক্ষেত্রে খননকাজ করতে হবে। সম্প্র্রতি সরকার খালকাটা কর্মসূচি নতুন করে শুরু করেছে। এই কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং সুষ্ঠুভাবে এগিয়ে নেয়া দরকার। যথাযথ পর্যবেক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করাও গুরুত্বপূর্ণ।

বরিশালে ভূ-উপরিতলের পানিতে সেচ দেয়ার প্রকল্প নেয়ার পাশাপাশি এ ধরনের কার্যক্রম সারা দেশে নিতে হবে। কারণ ভূ-গর্ভের পানি নিঃশেষ হয়ে গেলে যে ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে, তা সামলে নেয়া অসম্ভব হবে। ভূমিধসের মতো বিপর্যয় মোকাবেলার সাধ্য মানুষের নেই।

ভূ-গর্ভের পানির ব্যবহার কমানো এবং খাদ্যশস্য উৎপাদন বাড়াতে ভূ-উপরিতলের পানির ব্যবহার নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। সম্ভাব্য বিপর্যয় এড়াতে কাজটি যত দ্রুত সম্পন্ন করা হবে, ততই মঙ্গল।