প্রশ্ন যখন রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা নিয়ে, জরুরি তদন্ত করুন

দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা-বাসস। এই প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। সংস্থার প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পক্ষপাত এবং দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়। নিয়োগ পাওয়ার পর থেকেই তার কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্ক দেখা দেয়। সাংবাদিকরা প্রতিবাদ বিক্ষোভ করেছেন। এমনকি ঘেরাও কর্মসূচিও পালন করেন। এক পর্যায়ে খোদ দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক এ বিষয়ে তদন্তের উদ্যোগ নেয়। অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে এমডি মাহবুব মোর্শেদের বক্তব্য জানার জন্য তাকে দুদকে হাজির হওয়ার নোটিশ দেয়া হয়।

প্রায় ১৮ মাসের কর্মকালে বর্তমান এমডি পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ছাড়াই বেশির ভাগ গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও আর্থিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী, পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ছাড়া এমডি নিজের কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারেন না। বর্তমান এমডির সময়ে বাসসে যেসব নিয়োগ, পদোন্নতি ও বরখাস্তের সিদ্ধান্ত হয়েছে; সেখানেও এমডির স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ ওঠে। বলা হয়েছে— কাজগুলো সংস্থার সার্ভিস রুলস অনুযায়ী করা হয়নি।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটির নিরপেক্ষতা ভঙ্গের। বাসসের সম্পাদনা নীতিতে পক্ষপাতের এবং ভিন্নমত চাপা দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ইস্যুতে সংবাদ বাছাই ও শিরোনাম লেখায় একমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বা সমালোচনামূলক বক্তব্য চেপে রাখা, উপেক্ষা করা বা দায়সারাভাবে প্রকাশের দৃষ্টান্ত দেখা গেছে। বলা হয়েছে, প্রতিবেদন সম্পাদনায় নিরপেক্ষতার নীতির পরিবর্তে নির্দেশনা দিয়ে সম্পাদনা করানো হচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ড রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থার জবাবদিহি ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

শুধু তা-ই নয়, এমডি সামাজিক মাধ্যমের পোস্টে তার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরেন, যা পক্ষপাতদুষ্ট। জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের প্রাক্কালে একটি জোটকে হেয় করে একের পর এক সামাজিক মাধ্যমে বক্তব্য দিচ্ছেন তিনি। তার অনেক বক্তব্য দেশের অনেক বিশিষ্ট রাজনীতিক ও সামাজিক ব্যক্তির মানহানির পর্যায়ে পড়ে। অভিযোগ আছে, মাহবুব মোর্শেদ সামাজিক প্রচারমাধ্যমে সরাসরি জামায়াতের বিরুদ্ধে বিষোদগার করছেন। বাসসের সংবাদ প্রচার প্রকাশনায়ও এর প্রতিফলন ঘটছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রত্যক্ষ সুবিধাভোগী হিসেবে রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যমের শীর্ষ পদে বসে তিনি এসব কর্মকাণ্ড করতে পারেন না। কারণ, তার এসব কাজ শুধু বাসসের নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন ও সুনামহানি করছে না; অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশনকেও প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। দেশবাসী অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে সব পক্ষের প্রতি নিরপেক্ষ ও বৈষম্যহীন আচরণ দেখতে চায়। জাতীয় নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা যখন চলছে, তখন লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির দায় সরকারের। রাষ্ট্রীয় প্রচার সংস্থার কর্মকাণ্ডেও তার প্রতিফলন জরুরি। কিন্তু সংস্থার শীর্ষ ব্যক্তি যখন পক্ষপাত করেন তখন কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। এর দায় বাসসের এমডিকে নিতে হবে।

আমরা চাই, তথ্য মন্ত্রণালয় জরুরি এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে। অভিযোগ খতিয়ে দেখবে, দুদকের তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা দেবে এবং প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। তা না হলে বাসসের চলমান সঙ্কট গভীরতর হবে এবং এর দায় রাষ্ট্রকেই বহন করতে হবে।