অবশেষে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ভোটগ্রহণ বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ঘটনা ছাড়া সুশৃঙ্খল ও উৎসবমুখর আমেজে শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে । কেটে গেছে সব অনিশ্চয়তা, উদ্বেগ ও শঙ্কার মেঘ। এবারের সংসদ নির্বাচন ও গণভোট এমন এক আলোচিত বিষয় যেটি নিয়ে শেষ সময় পর্যন্ত অনেকে অনিশ্চয়তায় ভুগছিলেন। এখন জনগণের ভোটে বিজয়ী হয়ে যে দলই সরকার গঠন করুক, আমরা তাদের আগাম অভিনন্দন জানাই।
নির্বাচন নিয়ে আমাদের জাতীয় জীবনে তিক্ত অভিজ্ঞতাই বেশি। প্রকৃত বাস্তবতায় স্বাধীনতার চুয়ান্ন বছরে তিনটি নির্বাচন ছাড়া বাকিগুলো সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। তাই এ কথা বলা যায়, ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো, সেটি শেখ হাসিনার আমলে অনুষ্ঠিত পরপর তিনটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের পর জাতীয় জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
শেখ হাসিনা ক্ষমতা ধরে রাখতে নির্বাচনকে তামাশায় পরিণত করেন। এ জন্য এবারের নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ধারায় নতুন যুগের সূচনা হিসেবে গণ্য হচ্ছে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর এ নির্বাচন আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ ছাড়া অনুষ্ঠিত হলো। তবে ভোটগ্রহণ শেষে নির্বাচন-পরবর্তী ফলাফলের আভাসে দেখা যাচ্ছে, সারা দেশে বিএনপি ও জামায়াত জোটের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে।
আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী জমানায় নাগরিকসমাজ ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। যে কারণে এবার নির্বাচন ঘিরে মানুষের আগ্রহ ছিল ব্যাপক। বিগত দিনে দেশের মানুষের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে যে অভিজ্ঞতা তা থেকে ভোটাররা ভোটবিমুখ ছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে এবার সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা বাড়িয়ে দিয়েছে।
গণতন্ত্র কখনো হঠাৎ করে জন্ম নেয় না; এটি ধীরে ধীরে মানুষের অভ্যাসে পরিণত হয়। এর সূচনা সুষ্ঠু ভোটের মাধ্যমে। নাগরিকদের চাওয়া, তাদের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দেয়া হোক। ভোটের মাধ্যমে তারা সেই সিদ্ধান্ত জানান। কিন্তু ভোটাধিকার কেড়ে নিলে রাষ্ট্র পরিচালনায় নাগরিকের অংশগ্রহণ আর থাকে না। কিন্তু সেটিই করেছিলেন শেখ হাসিনা। দীর্ঘ দেড় দশকের এক রুদ্ধশ্বাস সময় পার করে বাংলাদেশ আবার নির্বাচনী ব্যবস্থায় ফিরেছে। তাই এবারের নির্বাচন আমাদের বিবেচনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এবারের সাধারণ নির্বাচন ও গণভোট এই দুয়ের মিশেল; এটি কেবল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কাউকে ক্ষমতায় আনা নয়; বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস থেকে লুপ্ত হয়ে যাওয়া গণতন্ত্রের ‘ন্যূনতম’ প্রবেশপথ পুনরুদ্ধার ও জিইয়ে রাখার সংগ্রামের ধারাবাহিকতা।
অভ্যুত্থানের পর সংস্কার কমিশন তৈরি এবং এর ভিত্তিতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে যে রাজনৈতিক সমাজের সমঝোতার প্রচেষ্টা এবং রাজনৈতিক পরিপক্বতার বীজ বপনের চেষ্টা হয়েছে, এ নির্বাচন তার একটি ধাপ। তবে শুধু নির্বাচন দিয়ে গণতন্ত্র টেকসই হয় না; এর জন্য চাই শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। যার জন্য আমাদের নির্বাচন-উত্তর রাষ্ট্র সংস্কারে মনোনিবেশ করতে হবে।
নির্বাচনই গণতন্ত্রের প্রবেশদ্বার। এটি বন্ধ হলে রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি সহিংসতার পথ প্রশস্ত হয়। সঙ্গত কারণে হাজারো সীমাবদ্ধতার পরও নির্বাচনীব্যবস্থা শক্তিশালী করার বিকল্প নেই। এবারের নির্বাচনে আমাদের গণতান্ত্রিক সেই অভিযাত্রা শুরু হলো। নির্বাচন-উত্তর আমরা নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছি। নির্দিষ্ট সময় পরে যেন নির্বাচনের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতার পালাবদল ঘটে সেটি জারি রাখতে হবে। পাশাপাশি সংস্কারের যে জন-অভিপ্রায় নাগরিক মনে সৃষ্টি হয়েছে তা বাস্তবায়নে নির্বাচিত সরকারকে সক্রিয় হতে হবে।



