কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা আসমা সাদিয়া অফিসকক্ষে ৪ মার্চ নিহত হয়েছেন। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা নির্মম হত্যার শিকার হওয়ায় এ ঘটনায় দেশজুড়ে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে জ্ঞানচর্চা, মানবিক মূল্যবোধ ও সভ্যতার আলো বিকশিত হওয়ার কথা, সেই শিক্ষাঙ্গনের একজন শিক্ষক উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে যদি হত্যার শিকার হন, তবে তা শুধু একটি ব্যক্তিগত বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি আমাদের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তাব্যবস্থার গুরুতর দুর্বলতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এ হত্যার ঘটনায় গুরুতর প্রশ্ন হলো— রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভেতরে কতটুকু নিরাপদ একজন শিক্ষক?
আসমা সাদিয়ার ঘাতক সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অস্থায়ী অফিস সহায়ক ফজলুর রহমান। ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকে এমন নির্দয় ঘটনা ঘটিয়েছেন বলে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন তিনি। কিন্তু নিহত শিক্ষিকার স্বামী মুহা. ইমতিয়াজ সুলতান হত্যা মামলার এজাহারে ভিন্ন কথা বলেছেন। আসমা সাদিয়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় চারজনের নাম উল্লেøখ করে মামলা করেছেন তিনি। এতে ঘটনার সময় তার অফিসকক্ষ থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার কর্মচারী ফজলুর রহমানকে এক নম্বর আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া আসমার সহকর্মী দুই শিক্ষক ও এক সহকারী রেজিস্ট্রারকেও আসামি করা হয়।
মামলার আর্জিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে আসমা সাদিয়া বিভাগের সভাপতি হন। আগের সভাপতি শ্যাম সুন্দর তার সময়ের বিভাগের আয়-ব্যয়ের হিসাব আসমাকে বুঝিয়ে দেননি। সহকারী রেজিস্ট্রার বিশ্বজিৎ কুমার আসমা সাদিয়াকে বলেন, তারা যেভাবে বলবেন এবং কাগজ সামনে ধরবেন, সেখানে তাকে শুধু স্বাক্ষর করতে হবে। সে সময় আসমা বিভাগের টাকা স্বচ্ছতার ভিত্তিতে খরচ ও অপব্যবহার করা যাবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। তখন থেকে আসমার সাথে বিশ্বজিৎ ও শ্যাম সুন্দরের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব শুরু হয়। ফজলুসহ তিনজন মিলে বিভাগের অর্থ আত্মসাৎ ও অপব্যবহার করতেন। আসমাকে বিভিন্ন সময়ে ফজলু অসহযোগিতা ও হেনস্তা করতে থাকে। এরপর শিক্ষক হাবিবুর রহমানের সামনে আসমাকে ফজলু অপমানজনক শব্দ ও অশালীন আচরণ করেন; কিন্তু হাবিবুর কোনো প্রতিবাদ করেননি। একপর্যায়ে কয়েক মাস আগে ডিনের নির্দেশে বিভাগীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও বিভাগীয় সভাপতিকে অসহযোগিতা করায় ফজলুকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে বদলি করা হয়। বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন শিক্ষক হাবিবুর। অন্যদিকে বিভাগের অর্থ তছরুপের ঘটনায় বিশ্বজিৎকে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি বদলি করা হয়। এরপর থেকে আসমাকে সবাই মিলে হত্যার পরিকল্পনা করতে থাকেন।
আসমা সাদিয়া হত্যার ঘটনাটি যতই ব্যক্তিগত বিরোধ বা বিচ্ছিন্ন হিসেবে ব্যাখ্যা দেয়া হোক, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে এমন নৃশংস ঘটনা ঘটাই বড় প্রশ্ন। কর্মস্থলে একজন শিক্ষকের নিরাপত্তাহীনতার দায় কি রাষ্ট্রের নয়? এই হত্যা ফের বলে দিলো, দেশের শিক্ষাঙ্গনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি এখনো পর্যাপ্ত গুরুত্ব পাচ্ছে না। এ ধরনের ঘটনা সমাজে ভয় ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ সৃষ্টি করে।
আমরা মনে করি, শিক্ষিকা সাদিয়া হত্যার দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। তাই মামলার এজাহারে উল্লিখিত বিষয়গুলো পুলিশকে খতিয়ে দেখতে হবে। প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন নৃশংস অপরাধ করার সাহস না পায়। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সমন্বিতভাবে কাজ করে শিক্ষাঙ্গনের নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে। শুধু ঘটনার পর প্রতিক্রিয়া দেখানো যথেষ্ট নয়; প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।


