উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দলীয় নিয়োগ

পীড়নমূলক সংস্কৃতি ফেরার শঙ্কা

নতুন সরকারের একটি প্রবণতা উৎকটভাবে ফুটে উঠেছে, সব খাতে নিজেদের লোক বসাতে হবে। যদিও শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ঘটানো ছিল সমীচীন; তা হয়নি। মনে রাখা দরকার, বিশ্ববিদ্যালয় মূলত জ্ঞান চর্চার জায়গা। এখানে অতিমাত্রায় রাজনীতি প্রাধান্য পেলে দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পিছিয়ে যাবে। সঙ্গত কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হলে সরকারের সঙ্কীর্ণ দলীয় চিন্তার বাইরে এসে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

বাংলাদেশের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভিসি-প্রোভিসি নিয়োগ নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর স্বল্পসময়ের মধ্যে সব বিশ্ববিদ্যালয়-প্রশাসনে ব্যাপক রদবদল হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালনের সুনাম অর্জনকারী শিক্ষকরা সরে গেছেন। সেখানে নিয়োগ পেয়েছেন দলীয় পরিচয়ধারী শিক্ষকরা। এই রদবদলে আগের কলুষিত শিক্ষক রাজনীতির আগমন ঘটতে যাচ্ছে কি না, এখন সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে। ক্যাম্পাসগুলোতে একধরনের উদ্বেগ বিরাজ করছে যে, একই কায়দায় পুরনো ছাত্ররাজনীতিও ফিরে আসছে কি না। ইতোমধ্যে সরকারি দলের ছাত্রসংগঠনের কিছু তৎপরতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ শঙ্কা বাড়িয়েছে।

জুলাই-বিপ্লব ব্যাপক আশা জাগিয়েছি এ কারণে যে, দেশে আর পীড়নমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি ফিরবে না। বিশেষ করে শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার অনুকূল একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকবে। শিক্ষকরা সবচেয়ে গুরুত্ব দেবেন অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম নিয়ে। পড়াশোনা গবেষণায় তাদের মনোযোগ কেন্দ্রীভূত থাকবে। এ অবস্থায় সরাসরি দলীয় শিক্ষকরা গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নিয়োগ পেয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি হিসেবে নিয়োগ পাওয়া অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম ২০১৮ সালে জাতীয় সংসদে নির্বাচনের জন্য বিএনপির দলীয় মনোনয়নপত্র কিনেছিলেন। ছাব্বিশের নির্বাচনে বিএনপির প্রচার কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন।

প্রোভিসি হিসেবে নিয়োগ পাওয়া আধ্যাপক আব্দুস সালাম সাদা দলের যুগ্ম আহ্বায়ক। অপর প্রোভিসি ড. আলফেছানী, জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা। নতুন সরকারের সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ পাওয়া বড় পদগুলোর সবাই সরাসরি সরকারি দলের রাজনীতির সাথে জড়িত। এমনকি কোষাধ্যক্ষ প্রক্টরসহ নিচের দিকের প্রশাসনিক পদেও একই ধরনের নিয়োগ দেয়া হয়েছে। কোথাও শিক্ষাগত উচ্চ যোগ্যতা প্রাধান্য দেয়া হয়নি। এর ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোতে সরকারি দলের একচেটিয়া প্রভাব তৈরি হয়েছে, যার সুযোগ নিশ্চয় নেবে সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠন।

বিগত ফ্যাসিবাদী জমানায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় একচেটিয়া দলীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়-প্রশাসন এবং সরকারি দলের ছাত্রসংগঠন মিলে ক্যাম্পাসে এক অরাজক পরিস্থিতি কায়েম করেছিল। জঘন্য গেস্টরুম, গণরুম ও বড় ভাই সংস্কৃতি চালু হয়েছিল। ডেকে নিয়ে শিক্ষার্থীদের অপমান, হেনস্তা ও মারধর দৈনন্দিন কাজে পরিণত হয়েছিল। এর একটি জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে আছে বুয়েটের আবরার ফাহাদ। সাথে যুক্ত হয়েছিল চাঁদাবাজি, সিট ও পদবাণিজ্য। বাংলাদেশের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রলীগ সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। এতে মদদ জুগিয়েছে দলকানা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। যেখানে সাধারণ শিক্ষার্থীরা সবধরনের অধিকার হারিয়ে ফেলেছিলেন। পড়াশোনার পরিবেশ সবচেয়ে নিম্ন পর্যায়ে নেমেছিল। এ কারণে বাংলাদেশের কোনো উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আর বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় ছিল না।

নতুন সরকার আসার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে উঁচু পদগুলোতে দলীয় সম্পৃক্ত শিক্ষকদের নিয়োগ দেয়ায় পড়াশোনায় অগ্রগতি থমকে যাওয়ার পাশাপাশি ছাত্রদের মধ্যে এই ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে- পুরনো সংস্কৃতিও ফিরে আসার।

নতুন সরকারের একটি প্রবণতা উৎকটভাবে ফুটে উঠেছে, সব খাতে নিজেদের লোক বসাতে হবে। যদিও শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ঘটানো ছিল সমীচীন; তা হয়নি। মনে রাখা দরকার, বিশ্ববিদ্যালয় মূলত জ্ঞান চর্চার জায়গা। এখানে অতিমাত্রায় রাজনীতি প্রাধান্য পেলে দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পিছিয়ে যাবে। সঙ্গত কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হলে সরকারের সঙ্কীর্ণ দলীয় চিন্তার বাইরে এসে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।