ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ডামাডোল, আড়ালে পড়ে যাচ্ছে গণভোট

গণভোট নিয়ে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা প্রশ্নের মুখে। গণভোট নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে ইসির কোনো বক্তব্য নেই।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি একযোগে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ বাস্তবায়ন বিষয়ে গণভোট। তফসিল ঘোষণার পর রাজনৈতিক দলগুলো প্রার্থী মনোনয়ন ও ভোটের সমীকরণ নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু দীর্ঘ সংলাপের পর জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রণীত জুলাই জাতীয় সনদ কার্যকরে যে গণভোট, তা নিয়ে তেমন তৎপরতা নেই। বাস্তবতা হলো- সংসদ নির্বাচনের ডামাডোলে দিন দিন আড়ালে পড়ে যাচ্ছে গণভোট প্রসঙ্গ।

গণভোটের গুরুত্ব তুলে ধরে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট বিষয়ে জনসচেতনতামূলক প্রচারের মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ‘গণভোট এমন একটি নির্বাচন, যেখানে জনগণ ঠিক করে দেবেন আগামী দিনে দেশ কিভাবে চলবে। দেশ পরিচালনার পথ নির্ধারণ করবে এই ভোটের ফল।’

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের যে জন-অভিপ্রায়, সেই আলোকে লিখিত হয়েছে জুলাই জাতীয় সনদ। সব রাজনৈতিক দলের মতামতের ভিত্তিতে সরকার প্রণীত জুলাই সনদ হতে পারে আমাদের ভেঙে পড়া রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতে জুতসই দাওয়াই। রাষ্ট্রযন্ত্রের এই ব্যাপক সংস্কারে প্রয়োজন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়া। দেশের সংবিধানের মৌলিক বিষয়গুলো পরিবর্তন করতে বা বড় নীতিগত পরিবর্তনের আগে গণভোটে জনগণের সম্মতি নিতে হয়। গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুতে জনগণের মতামতকে প্রাধান্য দিতে আয়োজন করা হয় গণভোট, যা সরকারের সিদ্ধান্তের বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতা দেয়। বড় ধরনের রাজনৈতিক বা সামাজিক ইস্যুতে জনগণের মধ্যে ঐকমত্য তৈরিতেও সাহায্য করে গণভোট। তাই সাধারণ নির্বাচনের বিপরীতে, গণভোট নির্দিষ্ট একটি ইস্যুতে জনগণের সরাসরি ভোটদানের সুযোগ করে দেয়, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া আরো শক্তিশালী করে।

জুলাই জাতীয় সনদের ১৫টি অনুচ্ছেদের মধ্যে আটটি কার্যকর হলেও বাকি সাতটি কার্যকর হবে কেবল জনগণের অনুমোদন মিললে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে নির্বাচিত সংসদকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংশোধন করতে হবে।

গণভোটে ভোটারের সামনে থাকবে একটিমাত্র প্রশ্ন- ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’। সংস্কারের পক্ষে রায় দিতে হলে ‘হ্যাঁ’ ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনের দিন গণভোট হলেও সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষে এ বিষয়ে জোরালো প্রচার এখনো দৃশ্যমান নয়। বিশেষ করে বড় দল বিএনপি কার্যত গণভোটের বিষয়ে নিশ্চুপ। গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া ছাত্র-জনতার নতুন দল এনসিপি, জামায়াতসহ কয়েকটি দল নিজ প্রতীকে ভোট চাওয়ার পাশাপাশি ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে কথা বললেও তা সীমিত পরিসরে রয়ে গেছে।

গণভোট নিয়ে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা প্রশ্নের মুখে। গণভোট নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে ইসির কোনো বক্তব্য নেই।

একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট আয়োজন নিয়ে শুরুতেই চ্যালেঞ্জের কথা বলা হলেও প্রস্তুতির অগ্রগতি নিয়ে স্পষ্ট বার্তা আসেনি। গত ২২ ডিসেম্বর ভোটার সচেতনতা তৈরিতে ১০টি ‘ভোটের গাড়ি-সুপার ক্যারাভান’ যাত্রা শুরু করে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, ইসি ও গণযোগাযোগ অধিদফতরের যৌথ উদ্যোগে গান, ডেমো ভোট ও রঙিন ব্যালট ব্যবহারের কথা বলা হলেও এখনো তা বড় পরিসরে দেখা যায়নি। অথচ কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলেও দলটির সমর্থকদের বড় অংশ ভোটকেন্দ্রে গিয়ে যদি ‘না’ ভোট দেয়, তাহলে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে। এ অবস্থায় জুলাইপন্থী দলগুলোর পাশাপাশি সরকার ও নির্বাচন কমিশনের সমন্বিত এবং জোরালো জনসচেতনতা ছাড়া গণভোটে ‘হ্যাঁ’ নিশ্চিত করা কঠিন হবে।