সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্তি

বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় বাধা

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা শুধু বিচারকদের দাবি নয়; এটি সমগ্র জনগণের প্রাণের চাওয়া। এখন সেটি পুরনো বৃত্তে ফিরে যাওয়ায় গণতন্ত্র মানবাধিকার হুমকির মধ্যে থেকে গেল। আমরা মনে করি, সরকার বিষয়টি নিয়ে গুরুত্বের সাথে ভাববে।

রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ- আইন বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিতের কথা বলে বাংলাদেশের সংবিধান। এই ভারসাম্যের মূল ভিত্তি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা; কিন্তু বিচার বিভাগকে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন করার নানা প্রতিশ্রুতি ও উদ্যোগের পরও কাক্সিক্ষত লক্ষ্য এখনো পূর্ণতা পায়নি। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্তি ফের সেই অপূর্ণতার দিকে আঙুল তুলেছে।

সংসদের প্রথম অধিবেশনে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রণীত ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ বাতিল করে বিএনপি সরকার। এর ৪০ দিনের মাথায় সরকার সচিবালয় থেকে সব কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করে নিয়ে কার্যত পুরো কাঠামোটি অচল করে দিয়েছে।

বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল অধস্তন আদালতের তত্ত্বাবধান, নিয়ন্ত্রণ ও প্রশাসনকে নির্বাহী বিভাগের (বিশেষ করে আইন মন্ত্রণালয়) প্রভাব থেকে মুক্ত রাখা। কিন্তু চলমান পরিস্থিতিতে উদ্যোগটি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বিচার বিভাগ প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। বিচার বিভাগ যদি প্রশাসনিকভাবে নির্বাহী বিভাগের ওপর নির্ভরশীল থাকে; তাতে সংবিধানে ঘোষিত স্বাধীনতা শুধু কাগজে সীমাবদ্ধ থাকবে।

সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্তির মধ্য দিয়ে বিচার বিভাগের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ কার্যত আগের কাঠামোয় ফিরে যাচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, যে প্রতিষ্ঠান বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রতীক হতে পারত, তা কেন টিকিয়ে রাখা হলো না?

বিচারক নিয়োগ, বদলি বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে যদি নির্বাহী বিভাগের চাপের আশঙ্কা থাকে, তা হলে নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে। বাংলাদেশে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের ইতিহাস দীর্ঘ। বহু আন্দোলন, আদালতের নির্দেশনা এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা করা হয়েছিল; কিন্তু কাঠামোগত স্বাধীনতা নিশ্চিত না হলে পৃথকীকরণ অপূর্ণ থেকে যায়। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ছিল সেই কাঠামোগত স্বাধীনতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এখন বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রদানে সরকার গুরুতর প্রশ্নের মুখে পড়ল।

স্মরণযোগ্য যে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রাষ্ট্রের অন্য অঙ্গের বিরুদ্ধে এখনো অবস্থান নেয়া নয়। বরং ভারসাম্যপূর্ণ রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার পূর্বশর্ত। স্বাধীন বিচার বিভাগ থাকলে সরকারের জবাবদিহি বাড়ে। নাগরিক অধিকার সুরক্ষিত হয়। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার কমে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্তি চব্বিশের বর্ষা বিপ্লবের চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা শুধু বিচারকদের দাবি নয়; এটি সমগ্র জনগণের প্রাণের চাওয়া। এখন সেটি পুরনো বৃত্তে ফিরে যাওয়ায় গণতন্ত্র মানবাধিকার হুমকির মধ্যে থেকে গেল। আমরা মনে করি, সরকার বিষয়টি নিয়ে গুরুত্বের সাথে ভাববে।