যেকোনো দেশের অর্থনীতির ‘প্রধান ধমনী’ ব্যাংক খাত। এ খাতের দুর্বলতা মানে পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় বিপর্যয়। শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী জমানায় দেশের ব্যাংক খাত কিছু অলিগার্কের হাতে তুলে দেয়া হয়। তখন সরকারের পছন্দের কিছু ব্যবসায়ী বেসরকারি সব ব্যাংক নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ঋণের নামে গ্রাহকের আমানত তছরুপ করেন। যা ছিল মূলত জনগণের টাকার অবাধ লুটপাট। সে সময় সবচেয়ে ভয়াবহ লুটপাটের শিকার হয় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত দেশের সবচেয়ে বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক। এই ব্যাংকটি শেখ হাসিনা তার ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী এস আলম নামের এক দুর্বৃত্তের হাতে তুলে দেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, যিনি ইসলামী ব্যাংক থেকে একাই ৮০ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।
ব্যাংকটি এস আলমের নিয়ন্ত্রণে নেয়ার সময়ও ঘটানো হয় ভৌতিক কাণ্ড। ২০১৭ সালে গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায় ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেয় এস আলম গ্রুপ। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নিয়ন্ত্রণ হারায় গ্রুপটি। এর পর থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়োজিত স্বতন্ত্র পরিচালকরা এটি পরিচালনা করছেন।
চব্বিশের আগস্ট-পরবর্তী ব্যাংকটি ফের গ্রাহকের আস্থা ফিরে পায়। ফলে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে। ব্যাংক খাতে যে শৃঙ্খলা ফিরে এসেছিল তাতে চির ধরে নতুন সরকারের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ দেয়ার মাধ্যমে। নজিরবিহীনভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকে নিয়োগ দেয়া হয় একজন ব্যবসায়ীকে, যিনি গত ডিসেম্বরে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগে ঋণখেলাপির তকমা মুছেছেন। এর ধারাবাহিকতায় ঈদের আগে শেষ কর্মদিবস ২৪ মে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান এম জুবায়দুর রহমানকে পদত্যাগের নামে প্রতিষ্ঠানটি থেকে সরে যেতে বাধ্য করা হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশ ব্যাংক তাকে স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল। এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো: খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ করা হয়েছে। স্মরণযোগ্য যে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিক্ষুব্ধ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিক্ষোভে বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকে নিয়োগ পাওয়া চেয়ারম্যান খুরশীদ আলম কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। তার এই নিয়োগ বাতিলের দাবিতে সচেতন গ্রাহক ফোরামের ব্যানারে আন্দোলন করছেন ব্যাংকটির বিপুলসংখ্যক গ্রাহক।
ইসলামী ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ সালে ইসলামী ব্যাংকের মুনাফা ছিল প্রায় ৪৪৭ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে তা নেমেছে ১৩৭ কোটি টাকায়। তখন খেলাপি ঋণের হার ছিল ৪ দশমিক ২৫ শতাংশ, যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫০ শতাংশে। ব্যাংকটির ৯৪ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ এখন খেলাপি।
আমরা মনে করি, ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে টেনে তুলে আবার একটি শক্ত ভিত দিতে প্রাণপণ চেষ্টা করছে। এর প্রমাণ ব্যাংকটির কার্যক্রমে গতি আসা এবং ঘুরে দাঁড়ানো। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক কী কারণে এখন এ আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন আনতে চায় তা সত্যিই অস্পষ্ট। কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংককে এই অস্পষ্টতা দূর করতে হবে। তা না হলে ব্যাংক খাতে আবার অস্থিরতা দেখা দিলে তার দায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর বর্তাবে। এর জন্য সরকারও কালিমালিপ্ত হবে।



