দীর্ঘদিন থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতি তৈরী পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। আবার এই পণ্যের বাজারও নির্দিষ্ট দু’টি অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তৈরী পোশাকের বাজার বহুমুখীকরণ এবং পোশাকের বাইরে ভিন্ন পণ্য তৈরি ও রফতানি জোরদারের কথা বারবার বলা হলেও তা নিয়ে খুব একটা কার্যক্রম লক্ষ করা যায়নি। ফলে যখনই ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে তৈরী পোশাক রফতানি কমার শঙ্কা দেখা দেয়, তখনই আমাদের মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগ কাজ করে। তৈরী পোশাক শিল্পে নিয়োজিত কয়েক লাখ শ্রমিক বেকার হওয়ার আশঙ্কা হয়।
গত মঙ্গলবার নয়া দিগন্তে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তৈরী পোশাক খাত নতুন এক অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে যাচ্ছে। ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে মূল্যস্ফীতি, ভোক্তাচাহিদা হ্রাস, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাবে আগামী মৌসুমগুলোতে পোশাকের ক্রয়াদেশ কমে যেতে পারে। ইতোমধ্যে কয়েকটি বড় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড বাংলাদেশ থেকে ক্রয়াদেশ কমানোর ইঙ্গিত দিয়েছে।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো-ইপিবির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ মোট পোশাক রফতানি করেছে প্রায় ৪৭ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নে রফতানি ছিল প্রায় ২২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় মাত্র ২ দশমিক ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ ২০২২-২৩ অর্থবছরে এই প্রবৃদ্ধি ছিল ১২ শতাংশের বেশি। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি হয়েছে প্রায় ৮ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার, যেখানে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ১ দশমিক ১ শতাংশ। কয়েক বছর আগেও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের বার্ষিক রফতানি প্রবৃদ্ধি ৮ থেকে ১০ শতাংশ হারে বাড়ছিল।
আমাদের রফতানি খাত এককভাবে তৈরী পোশাকের ওপর নির্ভর। বাংলাদেশের জন্য এটি ঝুঁকিপূর্ণ। আমাদের উচিত রফতানি বহুমুখীকরণ করা। রফতানি তালিকায় নতুন পণ্য যুক্ত করতে হবে। তালিকায় থাকা পণ্যগুলোর রফতানির পরিমাণও বাড়াতে হবে। এজন্য দরকার হবে উৎপাদন বাড়ানোর। এর সাথে সারা বিশ্বে বাজারও খুঁজতে হবে। আমরা যেমন শুধু ইউরোপ আমেরিকার ওপর নির্ভর হয়ে আছি তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এ জন্য দরকার কূটনৈতিক উদ্যোগ। বিশ্বের প্রায় সব দেশে আমাদের দূতাবাস আছে। এগুলো আমাদের কাজে লাগাতে হবে। পোশাক শিল্পের পেছনে মূলত আমাদের বেসরকারি উদ্যোগ।
ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার পেছনে ভোক্তার রুচির পরিবর্তন একটি উল্লেখযোগ্য কারণ। ভোক্তার চাহিদার আলোকে পোশাক পণ্যে আমাদের বৈচিত্র্য আনতে হবে।
পোশাক খাতে কাজ করা শ্রমিক ও তাদের জীবনমানের উন্নয়ন নিয়ে খুব একটা কিছু হয়নি। আধুনিক বিশ্বের চাহিদার আলোকে তাদের জন্য উন্নত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের জন্য বিকল্প কাজের সংস্থানেও নজর দিতে হবে। পোশাক রফতানি সঙ্কুচিত হলে যাতে তারা নিরাপদে অন্য পেশায় স্থানান্তরিত হতে পারে।
ইউরোপ ও আমেরিকায় যে পরিমাণ পোশাক রফতানি হয় তা সম্ভব হয়েছে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের প্রচেষ্টার কারণে। সেই হিসেবে সরকার এ শিল্পকে টেকসই রূপান্তর করতে পারেনি। এখন দরকার সরকারের এ নিয়ে আটঘাট নিয়ে নামা।



